Header Premium (728×90)

অর্থনীতি

বাজারে ঢুকলেই দাম বাড়ার ধাক্কা, আর সেই ধাক্কা সামলাতেই হিমশিম নিম্ন ও মধ্যবিত্তরা

স্টাফ রিপোর্টার
রংপুর:

খরচ আর খরচ-এই এক শব্দেই যেন আটকে গেছে মানুষের জীবন। বাজারে ঢুকলেই দাম বাড়ার ধাক্কা, আর সেই ধাক্কা সামলাতেই হিমশিম নিম্ন ও মধ্যবিত্তরা। পণ্যের দাম বাড়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে হাসপাতালের বিল, স্কুল-কলেজের ফি, এমনকি যাতায়াত, বাসাভাড়াও। কিন্তু সেই তুলনায় মানুষের আয় বাড়ছে না। এর সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট জ্বালানি সংকট হয়েছে নতুন বোঝা।

জ্বালানি সংকটে বেড়েছে পরিবহন ব্যয়। যার কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আরও বেড়েছে। চাপ সবচেয়ে বেশি পড়ছে চাকার ওপর নির্ভরশীল মানুষের জীবনে। দেশে রাইড শেয়ারিং খাতে জড়িত অন্তত ১০ লাখ মানুষ। পাঠাও ও উবার মিলিয়ে নিবন্ধিত চালকের সংখ্যা কয়েক লাখ। এই বিশাল কর্মসংস্থানের বড় অংশই এখন জ্বালানি সংকটে অনিশ্চয়তায়। লাইনে দাঁড়িয়ে তেল নিতেই তাদের অর্ধেকের বেশি সময় নষ্ট হয়ে যায়। ফলে উপার্জনও আগের চেয়ে সীমিত হয়েছে।

এ ছাড়া শপিং মল, মার্কেট সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে বন্ধ করে দেওয়ায় ব্যবসায়ীরাও চাপে পড়েছেন। ফলে সীমিত আয়ের মানুষ, বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি দিনদিন খরচের চাপে চ্যাপটা হচ্ছে।

রাজধানী থেকে শুরু করে জেলা শহর-সব জায়গাতেই একই চিত্র। বাজারে গিয়ে অনেকেই প্রয়োজনীয় জিনিস কেনা কমিয়ে দিচ্ছেন, কেউ কেউ খালি হাতে ফিরছেন। পরিবারের সদস্যদের চাহিদা পূরণ দূরের কথা, নিত্যদিনের খাবার জোগাড় করাই হয়ে উঠছে কঠিন। শুধু খাবার নয়, চিকিৎসা আর শিক্ষার খরচও বেড়ে যাওয়ায় চাপ আরও বেড়েছে।

চিকিৎসা খাতে পরিস্থিতি সবচেয়ে উদ্বেগজনক। দেশে প্রতি বছর প্রায় ৫০ লাখ মানুষ চিকিৎসা করাতে গিয়ে দরিদ্র হয়ে পড়ছে। অনেকেই বাধ্য হয়ে ঋণ নিচ্ছে বা সুদের টাকায় চিকিৎসা চালাচ্ছে। পরে সেই টাকা শোধ করতে গিয়ে জমিজমা বিক্রি করার মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে। টাকা খরচ করেও অনেক ক্ষেত্রে কাক্সিক্ষত চিকিৎসাসেবা মিলছে না। এতে মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়ছে। গত এক মাসে হামে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছে ৩৭ শিশুর। আর উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে ১৭৪ শিশুর। এতেই স্বাস্থ্যব্যবস্থার ভঙ্গুর চিত্র চোখে পড়ে। শিক্ষা খাতেও একই অবস্থা।

সন্তানদের পড়াশোনার খরচ জোগাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন অভিভাবকরা। স্কুলের বেতন, কোচিং, প্রাইভেট টিউটর, বই-সব মিলিয়ে খরচ বেড়েছে ৬০-৯০ শতাংশ পর্যন্ত। বিশেষ করে মাধ্যমিক পর্যায়ে এই চাপ আরও বেশি। ফলে অনেক দরিদ্র পরিবারই বাধ্য হয়ে সন্তানদের পড়াশোনা বন্ধ করে দিচ্ছে। বেসরকারি এক গবেষণা বলছে, বর্তমানে প্রায় অর্ধেক শিক্ষার্থী কোনো না কোনো পর্যায়ে ঝরে পড়ছে, যার বড় কারণ দারিদ্র্য।

ইউনেস্কোর তথ্য অনুযায়ী, শিক্ষার পেছনে গড় খরচ বেড়েছে প্রায় ৮০ শতাংশ। এমনকি দেশের প্রায় ৭ শতাংশ পরিবার সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে ঋণ নিতে বাধ্য হচ্ছে। এদিকে বাসা ভাড়া, যাতায়াত খরচ ও নিত্যদিনের অন্যান্য ব্যয়ও বেড়েছে। বিশেষ করে বেসরকারি চাকরিজীবীরা সবচেয়ে বেশি বিপাকে আছেন। তাদের বেতন খুব একটা বাড়ছে না, অথচ প্রতি মাসেই খরচের চাপ বাড়ছে। ফলে সংসার চালাতে গিয়ে অনেকেই সঞ্চয় ভাঙছেন, কেউ আবার ধারদেনার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন।

সরকারি হিসাবে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে এর কোনো মিল নেই। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, মার্চ মাসে মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৭১ শতাংশে নেমেছে, যা ফেব্রুয়ারিতে ছিল ৯ দশমিক ১৩ শতাংশ। খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ২৪ শতাংশ এবং খাদ্য বহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ। ঈদ কেন্দ্র করে পোশাক সহ বিভিন্ন পণ্যের চাহিদা বাড়ায় খাদ্য বহির্ভূত খাতে চাপ বেশি ছিল।

অন্যদিকে একই সময়ে জাতীয় মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ০৯ শতাংশ, যা মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম। অর্থাৎ মানুষের প্রকৃত আয় কমে যাচ্ছে। আয় বাড়লেও সেই টাকায় আগের মতো পণ্য বা সেবা পাওয়া যাচ্ছে না। এতে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি আরও বেড়েছে।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তফা কে মুজেরী জানান, দেশে এখন উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে, যা প্রায় ৯ শতাংশের কাছাকাছি। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য থেকে শুরু করে সবকিছুর দাম বাড়ায় নিম্ন-মধ্যবিত্ত থেকে মধ্যবিক-সব শ্রেণির মানুষ চাপে পড়েছে। বিশেষ করে নির্দিষ্ট আয়ের চাকরিজীবীরা সবচেয়ে বেশি বিপাকে আছে।

তিনি আরও বলেন, দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমেছে, কর্মসংস্থানের সুযোগও আগের তুলনায় কম। জীবনযাত্রার মানের অবনতি হয়েছে স্পষ্টভাবে। চিকিৎসা ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুর্বলতাও প্রকাশ পাচ্ছে। আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থা শক্তিশালী হলে অনেক সমস্যা এড়ানো যেত। শিক্ষার ব্যয় বাড়ায় অনেক শিক্ষার্থী মাঝপথ থেকে লেখাপড়া ছেড়ে দিচ্ছে। আমরা আমাদের ভবিষ্যৎদের হারাচ্ছি। সব মিলিয়ে আমরা এখন কঠিন সময় পার করছি।

saju

Share
Published by
saju

Recent Posts

পৌরসভা মেয়র ও ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান প্রার্থী হতে হলে দলীয় পদ ছাড়তে হবে

ফখরুল আলম সাজু ফেনী-১ আসনের সংসদ সদস্য মুন্সি রফিকুল আলম মজনু এর ১টি বক্তব্যকে ঘিরে…

3 hours ago

রাঙ্গামাটিতে পুলিশের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার

জান্নাতুল ফাহিমা তানহা, নিজস্ব প্রতিনিধি: রাঙ্গামাটি জেলা শহরের তবলছড়ি পোস্ট অফিস কলোনি এলাকা থেকে সাজেদুল…

4 hours ago

চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ নারী কল্যাণ সমিতির নবাগত সভানেত্রী পরিচিতি সভা

জান্নাতুল ফাহিমা তানহা, নিজস্ব প্রতিনিধি: চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ নারী কল্যাণ সমিতি "পুনাক" এর নবাগত সভানেত্রী…

4 hours ago

আওয়ামিলীগের সাবেক মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ আর নেই

ফখরুল আলম সাজু আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী ও বর্ষীয়ান নেতা তোফায়েল আহমেদ মারা গিয়েছেন (ইন্না…

4 hours ago

ঢাকা উত্তর এর ডিবির বিশেষ অভিযানে ইয়াবা সহ ৪ মাদক ব্যবসায়ী গ্রেফতার

ফখরুল আলম সাজু ঢাকা জেলার বিভিন্ন এলাকায় পৃথক পৃথক বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে ২৬৫ পিস…

4 hours ago

জোরারগঞ্জ পুলিশের বিশেষ অভিযানে ইয়াবা সহ মাদক কারবারি গ্রেফতার

ফখরুল আলম সাজু চট্টগ্রাম জেলা জোরারগঞ্জ থানা পুলিশের বিশেষ অভিযানে ৬৭,৬৮০ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট, ৬০০…

4 hours ago

This website uses cookies.