
মানবদেহের প্রধান চালিকাশক্তি এবং চিন্তা, স্মৃতি ও চেতনার কেন্দ্র হিসেবে মস্তিষ্কের ভূমিকা আজ সর্বজনস্বীকৃত। তবে প্রাচীনকালে মানবদেহের অঙ্গপ্রতঙ্গ ও সেগুলোর কাজ সম্পর্কে মানুষের ধারণা এমন ছিল না। প্রাচীন মিশরীয় চিকিৎসা সাহিত্য এবং মমি তৈরির ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মস্তিষ্ক সম্পর্কে তাদের একটি প্রাথমিক কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ ছিল, যদিও তাদের সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় ধারণায় হৃৎপিণ্ডই ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ।
মিশরীয় চিকিৎসাবিদ্যার একটি অমূল্য দলিল হলো এডউইন স্মিথ সার্জিক্যাল প্যাপিরাস। আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব সপ্তদশ শতকের এই পাণ্ডুলিপিটি মূলত আরও প্রাচীন কোনো চিকিৎসা গ্রন্থের অনুলিপি। এই নথিতে ৪৮টি চিকিৎসা কেসের বিবরণ রয়েছে, যার সিংহভাগই ছিল মাথা, ঘাড় ও মেরুদণ্ডের আঘাত সংক্রান্ত। এটি প্রাচীন বিজ্ঞানের এক অনন্য নিদর্শন, কারণ এতে অন্ধ বিশ্বাসের বদলে লক্ষণ পর্যবেক্ষণ ও যুক্তিনির্ভর রোগ নির্ণয়ের একটি পদ্ধতিগত ধারা দেখা যায়। এডউইন স্মিথ প্যাপিরাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মাথায় আঘাতের সাথে শারীরিক প্রতিক্রিয়ার সম্পর্ক শনাক্তকরণ। আঘাতপ্রাপ্ত রোগীর ক্ষতচিহ্ন পরীক্ষা করা, রোগী কথা বলতে পারছে কি না তা দেখা এবং শরীরের কোনো অংশ অবশ বা দুর্বল হয়ে পড়েছে কি না তা পর্যবেক্ষণ করার নির্দেশ এখানে রয়েছে। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এসব বর্ণনার মধ্যে মস্তিষ্কের ক্ষতি, স্নায়বিক জটিলতা ও পক্ষাঘাতের প্রাথমিক লক্ষণ স্পষ্ট। এর পাশাপাশি এই নথিতে মস্তিষ্কের বাইরের আবরণ, মস্তিষ্কের তরল পদার্থ এবং খুলির বিভিন্ন অংশের বিবরণও স্থান পেয়েছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নথি হলো ইবারস প্যাপিরাস। এতে মাইগ্রেনের অনুরূপ মাথার তীব্র একপাশের ব্যথা, খিঁচুনি এবং অন্যান্য স্নায়বিক বা মানসিক সমস্যার লক্ষণ নথিবদ্ধ করা হয়েছে। এছাড়া প্রাচীনকালে মাথার খুলিতে অস্ত্রোপচার বা ছিদ্র করার পদ্ধতি, যা ট্রেপেনেশন নামে পরিচিত, তার ব্যবহারও প্রচলিত ছিল। আঘাতগ্রস্ত হাড়ের পুনর্গঠনের প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ থেকে বোঝা যায়, এই ধরনের অস্ত্রোপচারের পরও অনেক রোগী বেঁচে থাকতেন।
তবে অঙ্গের শারীরিক গঠন জানা আর তার সুনির্দিষ্ট জৈবিক কাজ বোঝার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। মিশরীয়রা মাথায় আঘাতের প্রতিক্রিয়া জানলেও মস্তিষ্ককে চিন্তা ও চেতনার কেন্দ্র মনে করত না। তাদের বিশ্বাসে হৃৎপিণ্ডই ছিল বুদ্ধি, আবেগ, স্মৃতি ও নৈতিক সত্তার প্রধান কেন্দ্র। মৃত্যুর পর পরকালের বিচারের ক্ষেত্রেও হৃৎপিণ্ডকে অতি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করা হতো। তাই মমি তৈরির সময় প্রাকৃতিক লবণ দিয়ে দেহ শুষ্ক করার পাশাপাশি হৃৎপিণ্ডটিকে অতি যত্নসহকারে শরীরের ভেতর রেখে দেওয়া হতো, আর মস্তিষ্ককে অকেজো মনে করে নাকের ছিদ্র দিয়ে বের করে ফেলা হতো। মমি তৈরির প্রক্রিয়াটি মূলত ধর্মীয় ও দেহ সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে করা হলেও, এটি মিশরীয়দের মানবদেহের অভ্যন্তরীণ গঠন সম্পর্কে সরাসরি অভিজ্ঞতার সুযোগ করে দিয়েছিল।
সুতরাং প্রাচীন মিশরীয় চিকিৎসকেরা নিউরন, মস্তিষ্কের বৈদ্যুতিক সংকেত বা স্মৃতিকোষের বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া জানতেন না। আধুনিক স্নায়ুবিজ্ঞানের সাথে তাদের জ্ঞানের প্রত্যক্ষ তুলনা সম্ভব নয়। তবুও তাদের পর্যবেক্ষণকে একেবারে বাতিল করা যায় না। মাথায় আঘাতের ফলে যে বাকশক্তি হ্রাস পায় বা অঙ্গপ্রত্যঙ্গ অবশ হয়ে যায়— এই বাস্তব জ্ঞানটি তখন তারা ধারণ করতেন। পরিশেষে বলা যায়, চিন্তা ও চেতনার উৎস হিসেবে মস্তিষ্ককে প্রতিষ্ঠা না করলেও, মিশরীয় চিকিৎসকেরা পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে মাথায় আঘাত ও শারীরিক পরিবর্তনের যোগসূত্র উন্মোচন করেছিলেন। তাদের এই প্রাথমিক তথ্য নথিবদ্ধকরণই ছিল মানবদেহের রহস্য বোঝার দীর্ঘ বৈজ্ঞানিক যাত্রার সূচনা বিন্দু।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মাহের আহমেদ, প্রধান সম্পাদক: মোঃ মোত্তালিব সরকার। প্রকাশক কর্তৃক ৫৫০বি, হজ্জ ক্যাম্প রোড, আশকোনা, দক্ষিণখান, ঢাকা-১২৩০, বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত। সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় (ঢাকা) : ৫৫০বি, হজ্জ ক্যাম্প রোড, আশকোনা, দক্ষিণখান, ঢাকা-১২৩০, বাংলাদেশ। আঞ্চলিক কার্যালয় (বগুড়া): টোলারগেট, শেরপুর–৫৮৪০, শেরপুর, বগুড়া। অফিস: ০১৭৭৬-১৩৬০৫০ (হোয়াটসঅ্যাপ), বিজ্ঞাপন: ০৯৬৯৭-৫৪৪৮২৭। ই-মেইল: dailyjokhonsomoy@gmail.com।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রনালয়ের বিধি মোতাবেক নিবন্ধনের জন্য আবেদিত ©সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © দৈনিক যখন সময় ২০২২