মানুষের জন্মের সময় অন্য প্রাণীদের মতো নিজের শরীরের ওপর ভরসা করার ক্ষমতা থাকে না। সে কথা বলতে পারে না, হাঁটতে পারে না, এমনকি নিজের ক্ষুধার অনুভূতিও বোঝে না। তাকে কোলে নিতে হয়, খাওয়াতে হয় এবং পাহারা দিয়ে রাখতে হয়। কিন্তু এই চরম অসহায়ত্ব নিয়েই মানুষ একদিন নদীর ওপর সেতু বানিয়েছে, মরুভূমিতে শহর গড়েছে এবং আকাশের সীমানা ছোঁয়ার স্বপ্ন দেখেছে। প্রকৃতিতে যার কোনো অস্তিত্ব ছিল না—যেমন রাষ্ট্র, আইন, অর্থ, বিশ্ববিদ্যালয়, ধর্ম, অধিকার কিংবা সীমান্ত—মানুষ নিজের তাগিদে সেসব তৈরি করেছে। মানুষের এই বিস্ময়কর শক্তির উৎস তার শারীরিক ক্ষমতা নয়, বরং একসঙ্গে বহু মানুষের মনে একটি অভিন্ন গল্প বোনার ক্ষমতা।
মানুষের এই ইতিহাস কেবল অগ্রগতির নয়, এটি একই সঙ্গে নির্মাণ ও ধ্বংসের, ভালোবাসা ও নিষ্ঠুরতার এক দ্বৈত রূপ। এই দ্বৈত স্বভাবের দিকে বিজ্ঞানের চোখে তাকিয়েছেন বিখ্যাত কানাডীয়-মার্কিন মনোবিজ্ঞানী, জ্ঞানবিজ্ঞানী, ভাষাবিজ্ঞানী ও লেখক স্টিভেন পিংকার। ১৯৫৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর কানাডার মন্ট্রিয়েলে জন্ম নেওয়া এই চিন্তাবিদ ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মনোবিজ্ঞানে পিএইচডি অর্জন করেন। মানুষের ভাষা, চিন্তা ও আচরণ নিয়ে তাঁর দীর্ঘ গবেষণা তাঁকে সমকালীন বিশ্বের অন্যতম পরিচিত জনবুদ্ধিজীবীতে পরিণত করেছে। পিংকার প্রশ্ন তুলেছেন, মানুষ কীভাবে চিন্তা করে, কেন সে অন্যের কষ্ট বোঝার পাশাপাশি তাকে শত্রু ভেবে হত্যা করতে পারে এবং এই অন্ধকারের মধ্যেও মানুষের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী হওয়ার কোনো যুক্তিসংগত কারণ আছে কি না।
এই জটিল প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে পিংকার ফিরে গেছেন মানুষের ভাষার কাছে। ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি মানুষের সবচেয়ে পুরোনো ও শক্তিশালী আশ্রয়। ভাষার সাহায্যে মানুষ পৃথিবীকে নাম দেয় এবং স্মৃতিতে ধরে রাখে। যেমন একটি শিশু যখন 'গতকাল' বা 'আগামীকাল' শব্দগুলো শেখে, তখন সে কেবল শব্দ শেখে না, বরং অতীত, ভবিষ্যৎ, সম্ভাবনা ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার অদৃশ্য ক্ষমতাকে নিজের মুঠোয় পুরে নেয়। অন্য প্রাণীরাও বিপদের সংকেত দেয় বা সঙ্গীকে ডাকে, কিন্তু মানুষই একমাত্র প্রাণী যে দেশ, আইন, ন্যায়বিচার বা ভবিষ্যতের মতো সম্পূর্ণ অদৃশ্য ও বিমূর্ত ধারণা নিয়ে কথা বলতে পারে। ভাষা মানুষের অভিজ্ঞতাকে প্রজন্মান্তরে ছড়িয়ে দেয়, যার ফলে একজন কৃষকের বীজ বোনার নতুন পদ্ধতি বা যেকোনো মানুষের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা সমগ্র সভ্যতার সম্পদে পরিণত হয়। প্রতিটি নতুন জ্ঞান এভাবে পুরোনো জ্ঞানের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে।
তবে স্মৃতির এই শক্তি যেমন মানুষকে বাঁচায়, তেমনি এটি প্রতিশোধ ও সহিংসতার অন্ধকারকেও বহন করে। মানব ইতিহাসের একটি বড় অংশ জুড়ে ব্যক্তিগত প্রতিশোধ, দাসত্ব, যুদ্ধ ও নির্যাতন ছিল স্বাভাবিক জীবনযাত্রার অংশ। অপরিচিত বা ভিন্ন ধর্মের মানুষ ছিল সন্দেহের পাত্র। এই প্রেক্ষাপটে পিংকার তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ 'দ্য বেটার অ্যাঞ্জেলস অব আওয়ার নেচার'-এ দেখিয়েছেন যে, দীর্ঘমেয়াদে মানুষের জীবনে সহিংসতার হার আসলে কমেছে। ব্যক্তিগত প্রতিশোধের জায়গায় আদালত এবং গোত্রীয় শত্রুতার বদলে রাষ্ট্রীয় আইন আসার ফলে মানুষ এখন অন্যকে কেবল প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং বাণিজ্যের সহযোগী হিসেবে দেখতে শিখেছে। অপরিচিত মানুষকে হত্যা করার চেয়ে তার সঙ্গে বাণিজ্য করা যে অনেক বেশি লাভজনক, এই সাধারণ অর্থনৈতিক সত্য মানুষের নৈতিক ইতিহাসেও পরিবর্তন এনেছে।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের নৈতিকতার পরিধিও বড় হয়েছে। একসময় যা কেবল নিজের পরিবার বা গোত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, তা আজ রাষ্ট্র ছাড়িয়ে বিশ্বজনীন রূপ নিয়েছে। সাহিত্য, কবিতা এবং সংবাদ প্রতিবেদন মানুষের এই সহমর্মিতাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে, যা দূরদেশের অপরিচিত মানুষের দুঃখকেও নিজের করে তুলতে সাহায্য করে। তবে পিংকার সতর্ক করেছেন যে, সভ্যতা কোনো স্থায়ী বা অর্জিত সম্পত্তি নয় যা একবার অর্জন করলেই চিরকাল থেকে যাবে। স্বাধীন প্রতিষ্ঠান ভেঙে পড়লে বা ঘৃণার ভাষা ছড়িয়ে পড়লে সমাজ আবার পেছনে হেঁটে যেতে পারে। তাই সভ্যতাকে টিকিয়ে রাখতে প্রতিদিন যুক্তি ও বিজ্ঞানের চর্চা প্রয়োজন। বিজ্ঞান মানুষকে শেখায় যে সে ভুল হতে পারে। এই বিনয়ই জ্ঞানের প্রকৃত শুরু।
তবে কেবল প্রযুক্তিগত বা বৈজ্ঞানিক জ্ঞানই যথেষ্ট নয়, কারণ উন্নত প্রযুক্তি নিয়েও মানুষ নিষ্ঠুর হতে পারে। বর্তমান যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জিনসম্পাদনা বা পারমাণবিক অস্ত্রের মতো শক্তিশালী প্রযুক্তি আমাদের হাতে রয়েছে, কিন্তু সেই অনুপাতে আমাদের প্রজ্ঞার বিকাশ ঘটেছে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়ে গেছে। জলবায়ু পরিবর্তন, যুদ্ধ, রাজনৈতিক মেরুকরণ ও অসমতার মতো বাস্তব বিপদ আমাদের সামনে রয়েছে। তবুও পিংকার আশাবাদকে একটি নৈতিক ও রাজনৈতিক দায়িত্ব হিসেবে দেখেন। তাঁর 'এনলাইটেনমেন্ট নাও' এবং 'দ্য ল্যাঙ্গুয়েজ ইনস্টিংক্ট' বইগুলোতেও এই যুক্তি, বিজ্ঞান ও মানবতাবাদের জয়গান গাওয়া হয়েছে। তিনি বিশ্বাস করেন, মানুষের ভবিষ্যৎ কোনো পূর্বনির্ধারিত গল্প নয়। অপরিচিত মানুষের সঙ্গে সহযোগিতা করার ক্ষমতাই মানুষের সবচেয়ে বড় আবিষ্কার। ভাষা, যুক্তি, সহমর্মিতা, স্বাধীনতা ও সহযোগিতা—এই শক্তিগুলোর ওপর ভর করেই মানুষকে তার ভবিষ্যৎ পথ তৈরি করতে হবে।
কুড়িগ্রামে সার বিতরণে নানা অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলার মধ্যেও ‘সারের সংকট নেই’ বলে দাবি করা কৃষি…
সরকারিভাবে বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেডের (বোয়েসেল) মাধ্যমে ব্রুনেইয়ের বিভিন্ন কোম্পানিতে ২৭৯ জন পুরুষ…
জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ার পর দেশের পরিবহন ও নিত্যপণ্যের বাজারে অস্থিরতা তৈরি…
লিভারপুলে নিজের চুক্তি নবায়ন নিয়ে করা আগের মন্তব্যগুলোর ব্যাখ্যা দিয়ে সুর নরম করেছেন আর্জেন্টাইন মিডফিল্ডার…
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি ক্রমান্বয়ে বাড়ার পূর্বাভাস দিয়েছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। সংস্থাটির প্রাক্কলন অনুযায়ী,…
এশিয়ান গেমসে সাইক্লিংয়ের রোড রেসিং ইভেন্টে হতাশাজনক সমাপ্তি দেখল বাংলাদেশ। অসুস্থতার কারণে সবুর হোসেন অংশ…
This website uses cookies.