
একজন মানুষের মৃত্যুর পর তার রেখে যাওয়া কবিতা, নাটক কিংবা ছবি থেকে তাকে পুনর্গঠন করার চেষ্টা করা হয়, কিন্তু এই প্রক্রিয়া প্রায়ই অসম্পূর্ণ থেকে যায়। মানুষটি যা লিখে গেছেন, তার চেয়েও বিস্ময়কর হতে পারে তার উপস্থিতি—যেমন কোনো ঘরে তার প্রবেশের সাথে সাথে বাতাসের যে সামান্য পরিবর্তন ঘটে, তা কোনো জীবনীগ্রন্থেই ধরা পড়ে না। স্প্যানিশ কবি ও নাট্যকার ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকার ক্ষেত্রে সম্ভবত এমনই ঘটেছিল।
লুই বুনুয়েল তার স্মৃতিচারণে লোরকার সাহিত্যকর্মের চেয়ে তার ব্যক্তিত্বকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন। মাদ্রিদের রেসিদেনসিয়া দে এস্তুদিয়ান্তেসে ছাত্রজীবনে তাদের যে সময় কেটেছিল, তার কথা স্মরণ করে বুনুয়েল লিখেছিলেন যে লোরকা ছিলেন এক জীবন্ত 'মাস্টারপিস'। পিয়ানো বাজিয়ে মুহূর্তের মধ্যে কিছু সৃষ্টি করা, অভিনয় করা কিংবা কেবল উচ্চস্বরে কিছু পড়ে শোনানোর মাধ্যমে চারপাশের পরিবেশ বদলে দেওয়ার ক্ষমতা ছিল তার। বুনুয়েলের ভাষায়, লোরকা ছিলেন এক শিখার মতো, যার মধ্যে ছিল তীব্র আবেগ ও আনন্দ।
সালভাদর দালি লোরকার মধ্যে দেখেছিলেন এক সম্পূর্ণ 'কাব্যিক ঘটনা', যা কেবল কাগজে লেখা কবিতা নয়, বরং তার জীবন্ত শরীরেরই রূপান্তর। অন্যদিকে, হর্হে গিয়েনের মতে, লোরকার পাশে থাকলে ঘরের তাপমাত্রা পর্যন্ত বদলে যেত। পেদ্রো সালিনাসের স্মৃতিতে লোরকা ছিলেন প্রাণশক্তির প্রতীক, যার উপস্থিতি তিনি আসার আগেই টের পাওয়া যেত এবং তিনি চলে যাওয়ার পরও তার হাসি ও কথাবার্তার প্রতিধ্বনি রয়ে যেত। এমনকি পাবলো নেরুদা ১৯৩৭ সালে লোরকাকে 'গিটারের মতো জনপ্রিয়' বলে অভিহিত করেছিলেন, যা তার শিল্পের মৌলিক বৈশিষ্ট্য—অভিজাত ও লোকজের অপূর্ব সমন্বয়কে ফুটিয়ে তোলে।
তবে এই দীপ্তিমান মানুষটির আড়ালে ছিল এক গভীর যন্ত্রণার ইতিহাস। ভিসেন্তে আলেইক্সান্দ্রে লোরকাকে 'ঝিনুকের মতো কোমল' হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন এবং তার বিখ্যাত 'সনেটস অব ডার্ক লাভ'-এর তীব্রতা তিনি কাছ থেকে দেখেছিলেন। লোরকার হাসিখুশি সামাজিক ব্যক্তিত্ব আর তার ভেতরের কষ্টের মানুষটি একে অপরের পরিপূরক ছিল।
আজকের দিনে লোরকাকে বইয়ের পাতায়, আলোকচিত্রে বা হত্যার ইতিহাসে স্থির করে দেখা হলেও, তার বন্ধুদের স্মৃতিতে তিনি বেঁচে আছেন এক সরব উপস্থিতির মাধ্যমে। একজন কবি কী লিখেছিলেন ইতিহাস তা সংরক্ষণ করতে পারে, কিন্তু তিনি যখন ঘরে প্রবেশ করতেন তখন বাতাসের যে পরিবর্তন হতো, তা সংরক্ষণ করা অসম্ভব। আর সেই অসম্ভবতার মধ্যেই লোরকার সবচেয়ে মানবিক প্রতিকৃতি লুকিয়ে আছে। তিনি কেবল আন্দালুসিয়ার কবি বা নাট্যকার ছিলেন না, বরং তিনি এমন একজন মানুষ ছিলেন, যার অদৃশ্য উত্তরাধিকার আজও কণ্ঠের সুর বা পিয়ানোর অসমাপ্ত ছন্দে আমাদের কাছে ধরা দেয়।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মাহের আহমেদ, প্রধান সম্পাদক: মোঃ মোত্তালিব সরকার। প্রকাশক কর্তৃক ৫৫০বি, হজ্জ ক্যাম্প রোড, আশকোনা, দক্ষিণখান, ঢাকা-১২৩০, বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত। সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় (ঢাকা) : ৫৫০বি, হজ্জ ক্যাম্প রোড, আশকোনা, দক্ষিণখান, ঢাকা-১২৩০, বাংলাদেশ। আঞ্চলিক কার্যালয় (বগুড়া): টোলারগেট, শেরপুর–৫৮৪০, শেরপুর, বগুড়া। অফিস: ০১৭৭৬-১৩৬০৫০ (হোয়াটসঅ্যাপ), বিজ্ঞাপন: ০৯৬৯৭-৫৪৪৮২৭। ই-মেইল: dailyjokhonsomoy@gmail.com।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রনালয়ের বিধি মোতাবেক নিবন্ধনের জন্য আবেদিত ©সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © দৈনিক যখন সময় ২০২২