
দাম্পত্য সম্পর্কের সূচনা সহজ হলেও তা বছরের পর বছর সুন্দর রাখা বেশ কঠিন। দীর্ঘস্থায়ী ও মধুময় সম্পর্কের জন্য প্রয়োজন ধৈর্য, ত্যাগ, আন্তরিকতা ও প্রজ্ঞা। স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যকার বোঝাপড়া দুর্বল হলে সম্পর্ক বিচ্ছেদের দিকেও গড়াতে পারে। তবে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রদর্শিত জীবনপদ্ধতি ও উপদেশ অনুসরণের মাধ্যমে দাম্পত্য জীবনকে অত্যন্ত সুখের ও ভালোবাসাময় করে তোলা সম্ভব।
দাম্পত্য জীবনে পারস্পরিক ভালোবাসা গভীর করতে ছোট ছোট অভ্যাসের গুরুত্ব অপরিসীম। যেমন, স্ত্রীর সামনে নিজের পরিপাটি ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা। বিখ্যাত সাহাবি ইবনে আব্বাস (রা.) এ প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ‘আমি আমার স্ত্রীর জন্য তেমনই পরিপাটি থাকতে পছন্দ করি, যেমন আমি তার কাছ থেকে সাজগোজ পছন্দ করি’ (মুসান্নাফ ইবনে আবি শাইবাহ, হাদিস: ১৯২৬৩)। এর পাশাপাশি পরিবারের জন্য সামর্থ্য অনুযায়ী ভালো খাবারের ব্যবস্থা করাও যত্নের একটি বড় অংশ। এ ক্ষেত্রে কার্পণ্য না করে মাঝেমধ্যে বিশেষ আয়োজন করা উচিত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সওয়াবের আশায় কোনো মুসলিম যখন তার পরিবারের জন্য ব্যয় করে, তা তার জন্য সদকা হিসেবে গণ্য হয়’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৩৫১)।
ঘরের কাজে স্ত্রীকে সহযোগিতা করা এবং তার ছোট ছোট কাজের আন্তরিক প্রশংসা করা সম্পর্কের সুতোকে আরও মজবুত করে। হজরত আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেছেন যে, নবীজি (সা.) প্রায়ই উম্মুল মুমিনিন খাদিজা (রা.)-এর প্রশংসা করতেন (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫২২৯)। এমনকি খাদিজা (রা.)-এর মৃত্যুর পরও তিনি নতুন স্ত্রীর সামনে তাঁর প্রশংসা করতে দ্বিধা করতেন না, যা প্রমাণ করে যে আন্তরিক প্রশংসা সম্পর্ককে আরও গভীর করে তোলে।
দাম্পত্য জীবনে মতবিরোধ হওয়া স্বাভাবিক, কিন্তু কখনো স্ত্রীর গায়ে হাত তোলা বা শারীরিক নির্যাতন করা যাবে না। নবীজি (সা.) এ ব্যাপারে কঠোর সতর্কবার্তা দিয়ে বলেছেন, ‘তোমরা কেউ যেন নিজের স্ত্রীকে দাসের মতো প্রহার না করো। দিনের শেষে তো তার সঙ্গেই মিলিত হবে’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫২০৪)। এ ছাড়া স্ত্রীকে খারাপ নামে ডাকা, অশালীন ভাষা ব্যবহার, শ্বশুর-শাশুড়িকে নিয়ে কটূক্তি এবং যৌতুকের দাবি বা ইঙ্গিত দেওয়া সম্পূর্ণ ইসলামে নিষিদ্ধ। স্ত্রীর কোনো ভুল হলে তা সবার সামনে প্রকাশ না করে আড়ালে ভালোবেসে সংশোধন করা উচিত। তাকে অন্য কারও সাথে তুলনা করা বা পুরোনো ভুল বারবার মনে করিয়ে দেওয়া একধরনের নিষ্ঠুরতা।
স্ত্রীর সঙ্গে হালকা ও রসিকতাপূর্ণ সময় কাটানোকে ইসলামে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেছেন, এক সফরে নবীজি (সা.) তাঁর সঙ্গে দৌড় প্রতিযোগিতা করেছিলেন। প্রথমবার আয়েশা (রা.) জিতে যান। কয়েক বছর পর আয়েশার শরীর কিছুটা ভারী হলে আবারও প্রতিযোগিতা হয় এবং এবার নবীজি জেতেন। তখন তিনি হেসে বলেছিলেন, ‘এটা সেই আগের হারের বদলা’ (সুনানে আবু দাওদ, হাদিস: ২৫৭৮)। এ ছাড়া রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মানুষ যা নিয়ে খেলাধুলা করে, তার সবই অনর্থক, তিনটি বিষয় ছাড়া—তিরন্দাজি, ঘোড়া প্রশিক্ষণ আর স্ত্রীর সঙ্গে খেলা’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১৬৩৭)। প্রতিদিন একসঙ্গে খাওয়া, গল্প করা, একটু হাঁটতে যাওয়া বা মাঝেমধ্যে ঘুরতে যাওয়াকে বিলাসিতা না ভেবে সুন্নাহর অংশ হিসেবে দেখা উচিত। নতুন দাম্পত্যে স্ত্রীকে একা না রেখে সান্নিধ্যে রাখা এবং তাকে মাঝেমধ্যে বাবার বাড়িতে যেতে দেওয়ার মাধ্যমে সম্পর্ক জীবন্ত থাকে।
দাম্পত্যের এই সুন্দর অভ্যাসগুলোর আসল পরীক্ষা হয় রাগের মুহূর্তে। নবীজি (সা.) প্রকৃত শক্তিমানের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেছেন, ‘শক্তিশালী সে নয়, যে কুস্তিতে অন্যকে পরাজিত করে; বরং শক্তিশালী সে-ই, যে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬১১৪)। রাগের মাথায় কোনো সিদ্ধান্ত না নিয়ে শান্ত হওয়াই সুস্থ সম্পর্কের চাবিকাঠি। পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ক্ষমাশীলতা ও আল্লাহভীতির মাধ্যমে একটি সুন্দর সংসার গড়ে ওঠে। ঢাকার তেজগাঁওয়ের জামিয়া আরাবিয়া আশরাফুল মাদারিসের উস্তাজুল হাদিস মুফতি ইবরাহীম আল খলীল মনে করিয়ে দেন, প্রতিদিনের ছোট ছোট আচরণ, ত্যাগ আর আন্তরিকতার মধ্য দিয়েই একটি সুখী দাম্পত্য জীবন গড়ে ওঠে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মাহের আহমেদ, প্রধান সম্পাদক: মোঃ মোত্তালিব সরকার। প্রকাশক কর্তৃক ৫৫০বি, হজ্জ ক্যাম্প রোড, আশকোনা, দক্ষিণখান, ঢাকা-১২৩০, বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত। সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় (ঢাকা) : ৫৫০বি, হজ্জ ক্যাম্প রোড, আশকোনা, দক্ষিণখান, ঢাকা-১২৩০, বাংলাদেশ। আঞ্চলিক কার্যালয় (বগুড়া): টোলারগেট, শেরপুর–৫৮৪০, শেরপুর, বগুড়া। অফিস: ০১৭৭৬-১৩৬০৫০ (হোয়াটসঅ্যাপ), বিজ্ঞাপন: ০৯৬৯৭-৫৪৪৮২৭। ই-মেইল: dailyjokhonsomoy@gmail.com।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রনালয়ের বিধি মোতাবেক নিবন্ধনের জন্য আবেদিত ©সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © দৈনিক যখন সময় ২০২২