
পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদসহ বিদেশে পলাতক আসামিদের দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করতে জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের আনা একটি প্রস্তাব কণ্ঠভোটে গৃহীত হয়েছে। সাধারণত সংসদে বিরোধী দলের আনা প্রস্তাব গৃহীত হওয়ার নজির কম থাকলেও, এই ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম দেখা গেছে। প্রায় দুই ঘণ্টা আলোচনার পর প্রস্তাবটি পাস হয়। তবে বেনজীরকে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে সরকারের আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিরোধী দলের সদস্যরা। তাঁরা বেনজীরসহ বিদেশে পলাতক আসামিদের ফিরিয়ে আনতে একটি ‘বিশেষ সেল’ গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন। অন্যদিকে, সরকার পক্ষ থেকে এই প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের শৈথিল্য দেখানো হবে না বলে আশ্বস্ত করে বিরোধী দলকে দোষারোপ না করে সহযোগিতা করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
সংসদে এই প্রস্তাবটি উত্থাপন করেন বিরোধী দলের সংসদ সদস্য মীর আহমাদ বিন কাসেম। গৃহীত প্রস্তাবে বলা হয়েছে, ঘৃণ্য অপরাধে অভিযুক্ত সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ কীভাবে দুবাইতে জামিন পেলেন, সে বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দ্রুত জাতীয় সংসদকে অবহিত করবেন। একই সঙ্গে এই অপরাধীকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করতে সরকার কী পদক্ষেপ নিচ্ছে, তা প্রস্তাবক মীর আহমাদ বিন কাসেমসহ সংসদের সব সদস্যকে যথাশিগগির জানাতে হবে।
পাশাপাশি এই প্রস্তাবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে ৩০ দিনের মধ্যে চারটি বিষয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন চাওয়া হয়েছে। বিষয়গুলো হলো—প্রত্যর্পণ অনুরোধসহ এ পর্যন্ত নেওয়া পদক্ষেপের পূর্ণ বিবরণ; নথিতে কোনো আইনি বা পদ্ধতিগত ত্রুটি ছিল কি না এবং থাকলে তার জন্য দায়ীদের চিহ্নিত করা; সরকারি চাকরিতে বহাল থাকাকালে বেনজীরের ছয়টি দেশের পাসপোর্ট নেওয়ার তদন্তের অগ্রগতি; এবং বেনজীরকে সেন্ট লুসিয়া থেকে দেশে ফিরিয়ে আনা ও দেশে-বিদেশে তাঁর অবৈধ সম্পদ জব্দের পদক্ষেপসমূহ।
আলোচনায় অংশ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বেনজীরসহ বিদেশে অবস্থানরত পলাতক আসামিদের দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকার কোনো ধরনের শৈথিল্য দেখাবে না। বেনজীরের অবস্থান নিশ্চিত করা, প্রত্যর্পণপ্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া, পাসপোর্ট জালিয়াতির অভিযোগ যাচাই এবং দেশে-বিদেশে অবৈধ সম্পদ শনাক্ত ও জব্দে সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষ সমন্বিতভাবে কাজ করছে। ২০০৯ সাল থেকে গুম, খুন ও নির্যাতনের পরিসংখ্যান তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বেনজীর আহমেদকে ‘সিরিয়াল কিলার’ আখ্যা দেন। তিনি বলেন, এই নির্যাতনের হাতিয়ার ও দুষ্কৃতকারীদের মধ্যে শেখ হাসিনার পর বেনজীরকে ‘নাম্বার ওয়ান’ বলা যায়।
বেনজীরকে ফিরিয়ে আনার আইনি প্রক্রিয়ার বিবরণ দিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানার ভিত্তিতে বেনজীরের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের রেড নোটিশ জারির উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০২৫ সালের ১১ এপ্রিল তাঁর বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারি হয়, যা এখনো কার্যকর রয়েছে। ২০২৬ সালের ১২ জুন এনসিবি আবুধাবি বাংলাদেশকে জানায় যে বেনজীর সংযুক্ত আরব আমিরাতে গ্রেপ্তার হয়েছেন। দেশটির আইন অনুযায়ী ৩০ দিনের মধ্যে প্রত্যর্পণ অনুরোধ পাঠানোর কথা থাকলেও বাংলাদেশ মাত্র চার দিনের মাথায়, অর্থাৎ ১৬ জুন কূটনৈতিক চ্যানেলে আনুষ্ঠানিক অনুরোধ পাঠায়।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও জানান, বাংলাদেশ ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) মধ্যে কোনো দ্বিপক্ষীয় প্রত্যর্পণ চুক্তি নেই। ফলে দেশটির অভ্যন্তরীণ আইন ও পারস্পরিক সহযোগিতার নীতির ভিত্তিতে এই প্রক্রিয়া চলছে। ইউএইর চাহিদা অনুযায়ী অতিরিক্ত নথিপত্র ৪ আগস্ট পাঠানো হয়েছে এবং আরও আইনি ব্যাখ্যা দেওয়ার জন্য ২২ সেপ্টেম্বরের মধ্যে সময়সীমা নির্ধারিত রয়েছে। এ কাজে ইউএইতে একটি ল ফার্মও নিয়োগ করা হয়েছে। বেনজীর সেন্ট লুসিয়ায় চলে গেছেন বলে যে খবর রটেছে, তার কোনো আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ এখনো পাওয়া যায়নি উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জুডিশিয়াল প্রসেসটা একটু লম্বা হয়। তাই সবাইকে ধৈর্য ধরে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেন, সন্ত্রাসী বেনজীর সেন্ট লুসিয়ায় চলে গেছেন বলে গণমাধ্যমে যে খবর এসেছে, তা সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের কাছে যাচাই করা হয়েছে। তাঁরা জানিয়েছেন, এ ধরনের কোনো তথ্য তাঁদের জানা নেই। এর অর্থ দাঁড়ায়, বেনজীর এখনো সংযুক্ত আরব আমিরাতেই রয়েছেন। ইউএইতে প্রতিটি মামলা আলাদাভাবে বিবেচনার সুযোগ থাকায় সরকার কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগের চেষ্টা করবে এবং এ জন্য সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান তিনি। নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী রাজীব আহসান মন্তব্য করেন, গুমের মতো ঘটনার সঙ্গে নতুন প্রজন্মের পরিচয় ঘটিয়েছেন বেনজীর আহমেদরাই।
এদিকে আলোচনায় অংশ নিয়ে বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের বলেন, বেনজীরের বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আগে আশ্বাস দিলেও কোনো দৃশ্যমান ফলাফল পাওয়া যায়নি। বেনজীরসহ অন্য পলাতক ফ্যাসিস্টদের ফিরিয়ে আনার কাজ তদারকি করতে একটি বিশেষ সেল গঠনের প্রস্তাব করেন তিনি। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, আওয়ামী সন্ত্রাসীরা দেশে ঢুকে ইউনিয়ন পর্যায়েও মিটিং-মিছিল ও সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে, কিন্তু পুলিশ তাদের আইনের আওতায় আনতে তৎপর নয়। তিনি বেনজীরসহ সব সন্ত্রাসীর দেশীয় সম্পত্তি সরকারি প্রক্রিয়ায় বিক্রি করে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর মধ্যে বিতরণ করার প্রস্তাব দেন।
বেনজীরকে দেশে ফেরাতে সরকারের সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন তুলে জামায়াতের সংসদ সদস্য মীর আহমাদ বিন কাসেম বলেন, ঘটনার পরপরই স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী দুবাইয়ে ছুটে গেলে কিংবা প্রধানমন্ত্রী ব্যক্তিগতভাবে দুবাই সরকারের কাছে চিঠি পাঠিয়ে বিশেষ প্রতিনিধি পাঠালে বোঝা যেত সরকার সত্যিই চেষ্টা করছে। এনসিপির সংসদ সদস্য আখতার হোসেন বলেন, বেনজীরের গ্রেপ্তারের খবর শুনে সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে যে ধন্যবাদ দেওয়া হয়েছিল, তা এখন উবে গেছে। তিনি শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের শীর্ষ অপরাধীদের দেশে ফিরিয়ে আনার পদক্ষেপ জানতে চান। আলোচনায় আরও অংশ নেন বিএনপির সংসদ সদস্য এ বি এম মোশাররফ হোসেন, শহিদুল ইসলাম বাবুল এবং জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য রোকেয়া বেগম, মারজিয়া বেগম ও তাসমিয়া প্রধান।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মাহের আহমেদ, প্রধান সম্পাদক: মোঃ মোত্তালিব সরকার। প্রকাশক কর্তৃক ৫৫০বি, হজ্জ ক্যাম্প রোড, আশকোনা, দক্ষিণখান, ঢাকা-১২৩০, বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত। সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় (ঢাকা) : ৫৫০বি, হজ্জ ক্যাম্প রোড, আশকোনা, দক্ষিণখান, ঢাকা-১২৩০, বাংলাদেশ। আঞ্চলিক কার্যালয় (বগুড়া): টোলারগেট, শেরপুর–৫৮৪০, শেরপুর, বগুড়া। অফিস: ০১৭৭৬-১৩৬০৫০ (হোয়াটসঅ্যাপ), বিজ্ঞাপন: ০৯৬৯৭-৫৪৪৮২৭। ই-মেইল: dailyjokhonsomoy@gmail.com।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রনালয়ের বিধি মোতাবেক নিবন্ধনের জন্য আবেদিত ©সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © দৈনিক যখন সময় ২০২২