Header Premium (728×90)

জাপানি কনসোর্টিয়ামের কঠিন ৪ শর্তে থার্ড টার্মিনাল চুক্তি আটকে

হযরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের চুক্তি জাপানি কনসোর্টিয়ামের দেওয়া চারটি কঠিন শর্তে আটকে গেছে। বিকল্প আন্তর্জাতিক অপারেটরের ব্যবস্থা না রাখায় চূড়ান্ত আলোচনায় দুর্বল অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ, যার ফলে কনসোর্টিয়াম একের পর এক শর্ত চাপিয়ে দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) গত দুই বছরে ২০টির বেশি বৈঠক করেও এই বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেনি। বর্তমানে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণে সরকারের উচ্চপর্যায়ের সবুজ সংকেতের অপেক্ষায় রয়েছে বিষয়টি।

জাপানি কনসোর্টিয়ামের দেওয়া অমীমাংসিত চারটি শর্তের মধ্যে রয়েছে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের দায়দায়িত্ব ও ঝুঁকি বণ্টন, রাজস্ব ভাগাভাগি, আইনি সুরক্ষা এবং প্রকল্পের ত্রুটি সংশোধনের দায়বদ্ধতার সময়সীমা। এসব বিষয়ে সমঝোতা না হওয়ায় বেবিচক আলোচনার অগ্রগতি ও অমীমাংসিত শর্তগুলো লিখিতভাবে বিমান মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছে।

গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের ক্ষেত্রে জাপানি কনসোর্টিয়াম প্রস্তাব করেছে যে, এর সার্বিক দায়দায়িত্ব ও ঝুঁকি বহন করবে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। তবে এর বিপরীতে বিমানের আয়ের অংশ কীভাবে নির্ধারিত হবে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যয় কীভাবে পরিশোধ করা হবে, সে বিষয়ে নিশ্চয়তা চাওয়া হয়েছে। ফলে কার্যক্রমের দায়ভার, আর্থিক সুবিধা ও ক্ষয়ক্ষতির দায় বণ্টনের বিষয়টি এখনো অমীমাংসিত।

দ্বিতীয় জটিলতা দেখা দিয়েছে রাজস্ব ভাগাভাগি নিয়ে। পূর্বে বাংলাদেশকে ২৭ শতাংশ রাজস্ব দেওয়ার কথা থাকলেও, জাপানি পক্ষ অপারেশনাল প্রস্তুতির প্রথম আট মাসে মাত্র সাড়ে ১৩ শতাংশ দেওয়ার প্রস্তাব করেছে। এই প্রস্তাব কার্যকর হলে ওই সময়ে বাংলাদেশের রাজস্বের অংশ নির্ধারিত হারের তুলনায় অর্ধেকে নেমে আসবে।

আইনি সুরক্ষা ও দেশের আইন প্রয়োগের প্রশ্নেও দুপক্ষের অবস্থান ভিন্ন। চুক্তির ক্ষেত্রে জাপানি কনসোর্টিয়াম বিশেষ আইনি সুবিধা ও দায়মুক্তি চেয়েছে। তারা বলছে, ভবিষ্যতে বিদেশি বিনিয়োগকারী বা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের জন্য সরকার সাধারণ কোনো আইন প্রণয়ন কিংবা বিদ্যমান আইন সংশোধন করলে সেটি তাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না। অন্যদিকে, বাংলাদেশ চায় দেশের প্রচলিত আইন এবং ভবিষ্যতে সাধারণভাবে প্রযোজ্য আইনি পরিবর্তনের বাইরে কোনো প্রতিষ্ঠানকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া যাবে না।

এছাড়া, প্রকল্পের ত্রুটি সংশোধনের দায়বদ্ধতার সময়সীমা বা ডিফেক্ট লায়াবিলিটি পিরিয়ড (ডিএলপি) নিয়েও সমঝোতা হয়নি। বাংলাদেশ এ সময়সীমা ৯ মাস নির্ধারণ করতে চাইলেও, জাপানি কনসোর্টিয়াম তা বাড়িয়ে ১২ মাস করার দাবিতে অনড় রয়েছে। বেবিচকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, অগ্রিম অর্থ পরিশোধ, আইনি সুরক্ষা, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের অর্থ পরিশোধ এবং যন্ত্রাংশ নষ্ট হলে দায়দায়িত্বের বিষয়েও নতুন শর্ত তোলা হচ্ছে। আগে যন্ত্রাংশের দায়দায়িত্বের মেয়াদ ৬ মাসের কথা থাকলেও এখন ১২ মাস পর্যন্ত দাবি করা হচ্ছে।

এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম যুগান্তরকে বলেন, থার্ড টার্মিনাল পরিচালনায় শুরু থেকেই বিকল্প ব্যবস্থা রাখা প্রয়োজন ছিল। তিনি এটিকে ‘রহস্যজনক এবং মিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, সঙ্গতকারণে দরকষাকষিতে দেশের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়েছে। তিনি আরও বলেন, প্রস্তাবিত চুক্তির আর্থিক শর্ত, পরিচালন ব্যয় ও দীর্ঘমেয়াদি দায়বদ্ধতা ভালোভাবে যাচাই করতে হবে। নির্ধারিত সময়ে টার্মিনাল চালু করা জরুরি হলেও, দেশের স্বার্থ ও অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা নিশ্চিত না করে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি করা ঠিক হবে না।

বেবিচকের সদস্য (পরিচালনা ও পরিকল্পনা) আবু সাঈদ মেহবুব খান বলেন, জাপানি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে থার্ড টার্মিনাল পরিচালনার জন্য আলোচনা শেষ হয়েছে এবং নতুন কিছু শর্ত এসেছে। এক্ষেত্রে সরকারের সিদ্ধান্ত দরকার। আমরা বিষয়টি অবহিত করে মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছি। সবুজ সংকেত পেলে চুক্তি দ্রুতই সম্পন্ন হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

এদিকে, উদ্বোধনের দিন কতটি ফ্লাইট পরিচালনা করা হবে, তা নিয়েও একমত হতে পারেনি দুপক্ষ। বেবিচক প্রথমদিন অন্তত ১০টি নিয়মিত ফ্লাইট পরিচালনা করতে চায়, অন্যদিকে জাপানি পক্ষের প্রস্তাব মাত্র চারটি (দুটি আগমন ও দুটি বহির্গমন)। এই বিষয়টি চূড়ান্ত করতে ৩ নভেম্বর স্টিয়ারিং কমিটির বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে, যেখানে ওঅ্যান্ডএম চুক্তি সইয়ের তারিখও চূড়ান্ত হতে পারে।

বেবিচক জাপানি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে ১৫ বছর মেয়াদি সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি) চুক্তি করবে। চুক্তি সইয়ের আগে আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং এবং অর্থ মন্ত্রণালয় ও অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদনসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আনুষ্ঠানিকতা বাকি রয়েছে। আলোচনার সঙ্গে যুক্ত এক কর্মকর্তা জানান, চুক্তি সইয়ের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে অন্তত নভেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসে তৃতীয় টার্মিনালের পরীক্ষামূলক উদ্বোধনের পরিকল্পনার সঙ্গে চুক্তি সইয়ের বিষয়টি সরাসরি সম্পর্কিত নয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, টার্মিনাল দ্রুত চালু করা জরুরি হলেও, তাড়াহুড়ায় দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি করা উচিত নয়। প্রস্তাবের অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা ও শর্তগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করতে হবে। দেশের স্বার্থকে অগ্রাধিকার না দিলে বাংলাদেশ বড় ঝুঁকিতে পড়বে। এখন সরকারের সিদ্ধান্তেই নির্ধারিত হবে, কীভাবে দেশের স্বার্থ সুরক্ষিত রেখে থার্ড টার্মিনাল পরিচালনার চুক্তি চূড়ান্ত করা হবে।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Jugantor

Recent Posts

৪৩০ রানের লক্ষ্য তাড়া করে লঙ্কানদের অবিশ্বাস্য জয়

ত্রিদেশীয় সিরিজে অসম্ভবকে সম্ভব করে দেখালো শ্রীলঙ্কা। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ৪৩০ রানের লক্ষ্য তাড়া করে ২…

5 minutes ago

বাংলাদেশের বেসরকারি খাতে সাড়ে ৭৭ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করবে জাপান

আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশের বেসরকারি খাতে এক ট্রিলিয়ন ইয়েন বা ৬ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলার…

21 minutes ago

সৌদি আরবে হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত যাত্রীদের লাগেজ ফিরে পেতে দূতাবাসের পরামর্শ

সৌদি আরবের রিয়াদে কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত সৌদি এয়ারলাইনসের যাত্রীদের অনলাইনে অভিযোগ দাখিলের…

1 hour ago

ভাঙ্গুড়ায় নারীর মৃত্যু: হত্যা নাকি আত্মহত্যা, বিচার দাবি

পাবনার ভাঙ্গুড়ায় রাজিনা খাতুন (৫৫) নামে এক নারীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে হত্যার…

1 hour ago

ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের অতীত সাফল্য নিয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য ব্রুনো ফার্নান্দেসের

ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের অধিনায়ক ব্রুনো ফার্নান্দেস মনে করেন, ক্লাবটি এখনো অতীতের সাফল্য নিয়ে পড়ে আছে। অথচ…

1 hour ago

৪৩০ রানের লক্ষ্য তাড়া করে শ্রীলঙ্কার রেকর্ড জয়, হারাল ইংল্যান্ডকে

রাওয়ালপিন্ডিতে হ্যারি ব্রুকের ঐতিহাসিক দ্বিশতকে ৪২৯ রানের পাহাড় গড়েছিল ইংল্যান্ড। তবে ৪৩০ রানের লক্ষ্য তাড়া…

2 hours ago

This website uses cookies.