পাকিস্তান শাসনামলে পূর্ব বাংলার জনগণের প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল গভীর ঔপনিবেশিক ও বৈষম্যমূলক। তৎকালীন সময়ে প্রচলিত একটি প্রবাদ ছিল, “ছেলেমেয়ে জন্মালে বামুন বাড়ি যায় নাম রাখার জন্য।”২৬৯ একজন পশ্চিমী ক্ষমতাধর আমলাও একই সুরে মন্তব্য করেছিলেন যে, বাংলার মুসলমানদের ‘গায়ে এখনো হিন্দুয়ানির গন্ধ লেগে আছে’।২৭০ পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালির ভাষা সম্পর্কেও পশ্চিমী অবাঙালি শাসকশ্রেণি অভিন্ন নেতিবাচক ধারণা পোষণ করতো। একজন পশ্চিমী আলেমের মতে, বাংলা ভাষা ছিল ‘গয়ের ইসলামী’ বা অনৈসলামী ভাষা—যাকে তারা ‘হিন্দুর বুলি’ হিসেবে অভিহিত করতো।২৭১
পূর্বভিত্তিক আওয়ামী মুসলিম লীগের একজন প্রথম সারির নেতা ও প্রাদেশিক ‘প্রধানমন্ত্রী’ আতাউর রহমান খানকে একজন পশ্চিম পাকিস্তানি রাজনীতিক অভিযোগ করেছিলেন, “জনাব, বেশ তো, নামাজ পড়েন, দেখলে মনে হয় মুসল্লি অথচ আপনি বাংলা বাংলা করে চিৎকার করেন।”২৭২ ইসলাম ভাবাপন্ন মুসলমানের জন্য বাংলা ভাষা যেন-বা হারাম! আতাউর রহমান খান লিখেছেন, পশ্চিমে ‘এই মনোভাব’ কোনো ‘ব্যক্তি বা শ্রেণিবিশেষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়’। তিনি অনেক ‘মাওলানা, রাজনীতিক, ব্যারিস্টার, উকিল, ব্যবসায়ী, ছাত্র, তরুণ’ সহ অনেকের সঙ্গে ‘আলোচনা করে’ দেখেছেন, এই ধারণা ‘সামান্য তারতম্যসহ সকলের মধ্যেই’ বিদ্যমান ছিল।
পূর্ব পাকিস্তানের মুসলমানদের ইতিহাস সম্পর্কেও পশ্চিমী শাসকরা বর্ণবাদী দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করতেন। জেনারেল আইয়ুব খান, যিনি যুক্ত পাকিস্তানের ২৩ বছরের মধ্যে ১০ বছরই পাকিস্তান শাসন করেছেন, নিজেই ১৯৬০-এর দশকে পূর্ব ও পশ্চিমের তুলনামূলক ‘ইতিহাস’ হাজির করে পশ্চিমের উৎকৃষ্টতা ও পূর্বের নিকৃষ্টতা প্রতিপন্ন করার বদুদ্দেশ্যপ্রণোদিত বর্ণবাদী বয়ান প্রচার করেছেন। তিনি লিখেছেন যে, “পশ্চিম পাকিস্তান ছিল পৃথিবীর প্রায় সকল জাতির মানুষের সবচেয়ে বড় ধরনের সংমিশ্রণের ভেতর দিয়ে গড়ে ওঠা এক জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত অঞ্চল। ভারতীয় উপমহাদেশের প্রবেশদ্বারে অবস্থিত হওয়ার কারণে, প্রতিটি বিজয়ী জাতি এই অঞ্চলে অবশ্যম্ভাবীভাবে তাদের কিছু কিছু চিহ্ন রেখে গেছে। বিভিন্ন জাতির অপরিহার্য সংমিশ্রণের ফলে এই অঞ্চলে স্বভাবতই, ভাষার বৈচিত্র্য সত্ত্বেও, নানা ধরনের চিন্তা, দৃষ্টিভঙ্গি ও সংস্কৃতির একীভবন ঘটেছে।”২৭৩
ওদিকে, পূর্ব বাংলার জনগণ সম্পর্কে আইয়ুব খান লিখেছেন, “পূর্ববাংলার জনগণ সম্ভবত ভারতের একেবারেই আদি জনগোষ্ঠীগুলোর উত্তরসূরি। একথা বলা একেবারেই অত্যুক্তি হবে না যে, পাকিস্তান সৃষ্টির পূর্ব পর্যন্ত তাদের ভেতর স্বাধীনতা বা সার্বভৌমত্বের কোনো ধারণাই বিদ্যমান ছিল না। তারা ক্রমাগতভাবে হয় বর্ণহিন্দু, নয়তো মুঘল, পাঠান কিংবা ব্রিটিশদের দিয়ে শাসিত হয়েছে। তাছাড়া, তারা বরাবরই হিন্দুদের সংস্কৃতি ও ভাষা দিয়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে প্রভাবিত থেকেছে, রয়েছে এখনো। যেকোনো নিগৃহীত জনগোষ্ঠীর যাবতীয় সহজাত বাধা-নিষেধ ও সংকোচের শৃঙ্খলে আবদ্ধ থাকার কারণে, পূর্ববাংলার মানুষ নবলব্ধ স্বাধীনতার সঙ্গে সংগতিপরায়ণ গুণাবলির সঙ্গে এখনো মনস্তাত্ত্বিকভাবে খাপ খাইয়ে উঠতে পারেনি। এই ঐতিহাসিক পশ্চাৎপদতাই তাদের ভেতর বিরাজিত সর্বব্যাপী হীনম্মন্যতা, বিভক্তিমূলক স্বাতন্ত্র্যবোধ, সন্দেহবাতিক আর আত্মরক্ষাপরায়ণ আগ্রাসী মনোভাবের উৎস।”২৭৪
উপনিবেশবাদী দৃষ্টিভঙ্গি অন্তর্গতভাবেই বৈষম্যমূলক— যা শুধু ভাষার ক্ষেত্রে নয়, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক নীতিমালার ভেতরও অভিপ্রকাশ লাভ করতে বাধ্য। পূর্ব পাকিস্তানের ব্যাপারে পশ্চিমী শাসকশ্রেণির উপনিবেশবাদী কর্মকাণ্ডের মধ্যেও অতএব সেই সব বৈশিষ্ট্য অভিব্যক্ত হয়েছিল। পাকিস্তানের পূর্ব ও পশ্চিমাংশের উন্নয়ন বৈষম্যের ওপর ১৯৬২ সালে প্রকাশিত বাঙালি অর্থনীতিবিদ ড. আখলাকুর রহমানের (১৯২৫-১৯৯২) একটি বিস্তারিত গবেষণা থেকে জানা যায় যে, পশ্চিমভিত্তিক শাসকশ্রেণির বৈষম্যমূলক অর্থনৈতিক নীতিমালা ছাড়াও, পূর্ব থেকে পশ্চিমে পুঁজি পাচার ছিল পূর্বের নিরন্তর অনুন্নয়ন ও পশ্চিমের ক্রমবর্ধমান উন্নয়নের প্রধান উৎস।২৭৫ বিভিন্ন বাঙালি বুদ্ধিজীবীর নানা ধরনের গবেষণালব্ধ তথ্য, উপাত্ত ও বৈষম্যমূলক পাকিস্তানি অর্থনীতির স্বরূপ উন্মোচন করলেও, নানা খোঁড়া যুক্তির ভিত্তিতে পশ্চিমী শাসকশ্রেণি বহুকাল তা অস্বীকার করে যেতে থাকে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত, ১৯৬৩ সালে, পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান দেশটির দুই অঞ্চলে বৈষম্যমূলক অর্থনৈতিক উন্নয়নের কথা স্বীকার করতে বাধ্য হয়ে বলেন যে, “বিদ্যমান অবস্থা বিবেচনায়, নানা প্রয়াস গ্রহণ করলেও, ১৯৮৫ সালের পূর্বে দুই অঞ্চলের অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীকরণ সম্ভব নয়।”২৭৬
রাজনৈতিকভাবে বৈষম্যমূলক উপনিবেশবাদী ব্যবস্থা জারি রাখার জন্য কেবল বৈষম্যমূলক অর্থনৈতিক নীতিমালার চর্চাই যথেষ্ট নয়, রাষ্ট্রের ওপর সামরিক-বেসামরিক নিয়ন্ত্রণ জারি রাখাও অপরিহার্য হয়ে পড়ে, আর তা করা হয় রাষ্ট্রের দুই প্রধান স্তম্ভের— জনপ্রশাসন ও সেনাবাহিনী— ওপর নিয়ন্ত্রণ জারি রাখার মাধ্যমে। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় জনপ্রশাসনে ‘১৯৫৮ সাল অবধি’ মোট ‘১৬ জন সচিব’ ছিলেন, যার মধ্যে একজনও পূর্ব পাকিস্তানি ছিলেন না, সকলেই ছিলেন পশ্চিমী। তাছাড়া, যুগ্ম ও উপ-সচিব মিলে ‘প্রায় দেড়শ’ কর্মকর্তা ছিলেন, কিন্তু তাঁদের মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানি ছিলেন মাত্র ‘জনা কুড়ি’।২৭৭ সেনাবাহিনীর ক্ষেত্রে বৈষম্যমূলক নিয়ন্ত্রণের মাত্রা ছিল রীতিমতো বিস্ময়কর। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকে ১৯৭০ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম সাধারণ নির্বাচন পর্যন্ত সময়ব্যাপী, পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কর্মকর্তা ও সৈন্য মিলিয়ে পূর্বের প্রতিনিধিত্ব ছিল মাত্র ১০ শতাংশ, আর শুধু কর্মকর্তার প্রতিনিধিত্ব ছিল মাত্র ৫ শতাংশ।
সামরিক বাহিনীতে নিজের এহেন নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ জারি রাখার জন্য পাকিস্তান রাষ্ট্রের অবাঙালি পশ্চিমী শাসকশ্রেণি ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকদের বর্ণবাদী যোদ্ধৃ/অযোদ্ধৃ জাতিতত্ত্ব ব্যবহার করেছে। ১৯৪১ সালে ব্রিটিশ রাজনীতিক ও শিক্ষাবিদ থমাস ম্যাকলে বাঙালি পুরুষের শারীরিক গঠনকে ‘রীতিমতো মেয়েদের মতো দুর্বল’ আখ্যায়িত করে দাবি করেছিলেন যে, তারা ‘কোনো পুরুষোচিত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে অক্ষম’। তিনি আরও দাবি করেছেন যে, ‘বিদেশি শাসনের জোয়াল বহন করার জন্য প্রকৃতি ও স্বভাবগতভাবে উপযুক্ত এমন একটি জনগোষ্ঠী পৃথিবীর আর কোথাও কোনোকালে ছিল না’।
বাঙালি সম্পর্কে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকশ্রেণির এই বর্ণবাদী বয়ান ১৮৫৭ সালে সংগঠিত ভারতীয় ‘সিপাহি বিদ্রোহের’ মাধ্যমে ভয়ানক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়ে পড়ে। এই বিদ্রোহের উদ্যোক্তা ও প্রধান শক্তি ছিল বাঙালি সৈন্য অধ্যুষিত ‘বেঙ্গল রেজিমেন্ট’। ব্রিটিশ শাসকরা শেষ পর্যন্ত ভাড়াটে পাঞ্জাবি সৈন্যদের সশস্ত্র সহযোগিতায় এই বিদ্রোহ নির্মমভাবে দমন করতে সমর্থ হয় এবং ১৮৫৯ সালের জুলাই মাসে বাহাদুর শাহ জাফরের গ্রেপ্তারের মধ্যদিয়ে এর আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে। কিন্তু এই সময় থেকে বিদ্রোহ দমনকারী ব্রিটিশরাজের জন্য বাঙালি সৈন্যরা আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ফলে, ভারতে ব্রিটিশ বাহিনীর ‘বেঙ্গল রেজিমেন্ট’ ভেঙে দেয়া হয় এবং ভারতীয় ব্রিটিশ বাহিনীতে বাঙালি সৈন্য ভর্তি না করার অজুহাত হিসেবে এই অসত্য বয়ান প্রচার করা হয় যে, বাঙালিরা ‘অযোদ্ধা জাতি’। অন্যদিকে, গুর্খা, মারাঠি, রাজপুত, পাঞ্জাবি প্রভৃতি সম্প্রদায়ভুক্ত সৈন্যদের ওপর যোদ্ধা জাতির আলংকারিক মর্যাদা আরোপ করা হয়। ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে সম্পৃক্ত হওয়ার পর ব্রিটিশ শাসকরা বাধ্য হয়ে ফের হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে বাঙালি নিয়োগ শুরু করেছিল।
পরবর্তীকালে, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে ভারতবর্ষের ‘রাজনৈতিক মুক্তির’ মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তানে পাঞ্জাব-নিয়ন্ত্রিত পশ্চিম পাকিস্তানি সেনানেতৃত্ব বাঙালি মুসলমানদের ব্যাপারেও ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকদের রাজনৈতিক অপপ্রচার জারি রাখে। ব্রিটিশ অপকৌশল অবলম্বনে পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী বাঙালি মুসলমানদেরও ‘অযোদ্ধা জাতি’ হিসেবে আখ্যায়িত করে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে তাদের যথাযথ সংখ্যায় নিয়োগদানে বিরত থাকে।
তথ্যসূত্র:২৬৯. আতাউর রহমান খান, ওজারতির দুই বছর: ১৯৫৬-১৯৫৮, পৃষ্ঠা : ৩৪২৭০. প্রাগুক্ত ২৭২. প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা: ৩৫২৭১. প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা: ৩৭২৭৩. Mohammad Ayub Khan, Friends Not Masters: A Political Autobiography, p. ১৮৭২৭৪. প্রাগুক্ত২৭৫. বিস্তারিতের জন্য দেখুন, গ. Akhlaqur Rahman, Partition, Integration, Economic Growth and Interregional Trade: A Studz of Interwing Trade in Pakistan : ১৯৪৮-১৯৪৯, ঢ়. ১৫৪২৭৬. তফাজ্জল হোসেন মানিক মিঞা, পাকিস্তানী রাজনীতির বিশ বছর, পৃষ্ঠা: ১৭৯২৭৭. আতাউর রহমান খান, ওজারতির দুই বছর, পৃষ্ঠা : ৪১
রাজধানীর গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরাতে এবং যানজট কমাতে ছয়টি রুটে একক কোম্পানির অধীনে বাস চালানোর সিদ্ধান্ত…
নেত্রকোনার দুর্গাপুরে লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকির নামের এক সাংবাদিককে গুলি করে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। বৃহস্পতিবার রাতে…
সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ১ অক্টোবরের পর থেকে ২০ বার হামলা…
যুক্তরাষ্ট্রের ওরেগনের একটি প্রাথমিক স্কুলে বন্দুকধারীর হামলায় তিন শিশু ও এক শিক্ষক নিহত হয়েছেন। ঘটনায়…
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে সেপ্টেম্বরে ফ্রান্সে বার্ষিক ভোক্তা মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৩.১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা আগস্টে ছিল…
বাংলাদেশের জন্য প্রস্তাবিত ৪৫০ থেকে ৫০০ কোটি ডলারের নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনায় রাজস্ব আহরণ…
This website uses cookies.