
সুস্বাস্থ্য রক্ষা ও পুষ্টির ঘাটতি পূরণে ডিমকে একটি ‘পরিপূর্ণ খাদ্য’ বা ‘সুপার ফুড’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আজ ৯ অক্টোবর ২০২৬, শুক্রবার বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে ৩০তম বিশ্ব ডিম দিবস। ১৯৯৬ সালে অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায় ইন্টারন্যাশনাল এগ কমিশনের (আইইসি) উদ্যোগে প্রথম এই দিবসটির সূচনা হয়েছিল। এ বছর দিবসটির মূল প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘প্রোটিন দ্যাট পাওয়ার্স অ্যান্ড প্রোটেক্টস’, যার বাংলা অর্থ ‘শক্তি জোগায়, সুরক্ষা দেয় প্রোটিন’। ডিমের উচ্চমানের প্রোটিন কীভাবে শরীরের বৃদ্ধি, পেশি গঠন ও সামগ্রিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ভূমিকা রাখে, তা তুলে ধরাই এবারের আয়োজনের মূল লক্ষ্য।
বিশ্ব ডিম দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর, ওয়ার্ল্ডস পোলট্রি সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন (বাংলাদেশ শাখা) এবং বাংলাদেশ পোলট্রি行业জ সেন্ট্রাল কাউন্সিলের (বিপিআইসিসি) যৌথ উদ্যোগে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা ও সেমিনারের আয়োজন করা হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে সচেতনতামূলক কর্মসূচি পালিত হচ্ছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের মতে, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস মানে কেবল ক্ষতিকর চর্বি যেমন—গরু-খাসির জমাট চর্বি, ঘি, মাখন বা পেস্ট্রি বাদ দেওয়া নয়, বরং খাদ্যতালিকায় ডিমের মতো উপকারী উপাদান যুক্ত করা। ডিমে রয়েছে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড, যা হৃদরোগ প্রতিরোধে অত্যন্ত কার্যকরী। এছাড়া ১০০ গ্রাম খাসির মাংস থেকে যে পরিমাণ প্রোটিন পাওয়া যায়, তা মাত্র ৪টি ডিম থেকেই মেটানো সম্ভব। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, নারীরা বয়ঃসন্ধিকালে বা পরবর্তী সময়ে সপ্তাহে অন্তত ৬টি ডিম খেলে স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি প্রায় ৪৪ শতাংশ হ্রাস পায়।
বর্তমানে বাংলাদেশে বার্ষিক ডিমের উৎপাদন প্রায় ২,৪৪৬.৫ কোটি, যা দৈনিক হিসাবে ৬ কোটিরও বেশি। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) সুপারিশ অনুযায়ী, সুস্থ থাকার জন্য একজন মানুষের বছরে অন্তত ১০৪টি ডিম খাওয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশে বর্তমানে মাথাপিছু ডিমের প্রাপ্যতা ১৩৭টি হলেও, মানুষ গড়ে বছরে মাত্র ৪৫ থেকে ৫০টি ডিম ব্যবহার করছে। তবে আশার কথা হলো, মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রতিদিনের নাস্তা, টিফিন এবং দুপুরের বা রাতের খাবারে ডিমের ব্যবহার বাড়ছে। ২০৩০ সালের মধ্যে বার্ষিক মাথাপিছু ডিমের প্রাপ্যতা ২০০ থেকে ২০৮টিতে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে সরকার ও সংশ্লিষ্ট খাতগুলো। এ লক্ষ্য অর্জনে আগামী চার বছরে মাথাপিছু প্রাপ্যতা আরও প্রায় ৬৮টি বাড়াতে হবে।
দেশের পোলট্রি শিল্প বর্তমানে আমিষ ও মাংসের চাহিদার প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ জোগান দিচ্ছে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে দেশে যেখানে ডিমের উৎপাদন ছিল ১,৪৯৩ কোটি ৩১ লাখ, সেখানে প্রায় এক দশকের ব্যবধানে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা ৬৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ২,৫০৯ কোটি ৪১ লাখে। বর্তমানে ভুট্টা ও সয়াবিনের সমন্বয়ে অর্গ্যানিক পদ্ধতিতে পোলট্রি ফিড তৈরি হচ্ছে। আগে হ্যাচিং ডিম আমদানি করতে হলেও এখন দেশে নিজস্ব গ্র্যান্ড প্যারেন্টস্টক (জিপি) ফার্ম গড়ে উঠেছে। এছাড়া ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ৮০টি প্যারেন্টস্টক (পিএস) ফার্ম রয়েছে। আধুনিক হ্যাচারিগুলোতে যান্ত্রিক উপায়ে সপ্তাহে ১ কোটি ১০ লাখের বেশি ডিম ফোটানো হচ্ছে। খাবার ও পানি সরবরাহ থেকে শুরু করে ডিম সংগ্রহ পর্যন্ত সবকিছুই এখন স্বয়ংক্রিয় উপায়ে হচ্ছে, যা ভোক্তাদের জীবাণুমুক্ত ডিম ও মাংসের নিশ্চয়তা দিচ্ছে।
২০০৫ সালের আগেও বাংলাদেশ থেকে ডিম রপ্তানি হতো। তবে ২০০৭ ও ২০০৯ সালে এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা বা বার্ড ফ্লুর প্রাদুর্ভাবের কারণে বিশ্ব প্রাণিস্বাস্থ্য সংস্থার (ওআইই) শর্তের মুখে রপ্তানি বন্ধ হয়ে যায়। সেই ধকল কাটিয়ে দেশের পোলট্রি উদ্যোক্তারা আবারও ডিম ও পোলট্রি পণ্য বিদেশে রপ্তানির জোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এমনকি ঘর সাজানোর কাজে ডিমের খোসার ওপর সুক্ষ্ম কারুকার্যের ব্যবহারও শুরু হয়েছে। তবে পোলট্রি ফিড, বাচ্চা, ওষুধ ও জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচ অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সঙ্গে মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব ও সরবরাহ ব্যবস্থার ত্রুটির কারণে খামারিদের বিক্রয়মূল্য এবং খুচরা বাজারের মূল্যের মধ্যে বড় ব্যবধান তৈরি হচ্ছে, যার ফলে প্রান্তিক খামারিরা লোকসানের মুখে পড়ছেন।
পুষ্টিহীনতার কারণে শিশুরা রাতকানা, রক্তস্বল্পতা ও রিকেটসের মতো রোগে ভোগে। মেক্সিকোতে মাথাপিছু বার্ষিক ডিম ব্যবহারের হার ৪০৯টি, জাপানে ৩৩৭টি এবং উন্নত দেশগুলোতে গড়ে ২৭০ থেকে ৩০০টি। বাংলাদেশে শিশুদের পুষ্টি ও মেধার বিকাশের জন্য সরকারি স্কুল ফিডিং কার্যক্রমে ডিম অন্তর্ভুক্ত করার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। কৃষি ও অর্থনীতি বিশ্লেষক এস এম মুকুল মনে করেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিলে দেশে ডিমের ব্যবহার ও চাহিদা বহুলাংশে বৃদ্ধি পাবে, যা একটি মেধাবী প্রজন্ম ও সমৃদ্ধ অর্থনীতি গঠনে সহায়ক ভূমিকা রাখবে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মাহের আহমেদ, প্রধান সম্পাদক: মোঃ মোত্তালিব সরকার। প্রকাশক কর্তৃক ৫৫০বি, হজ্জ ক্যাম্প রোড, আশকোনা, দক্ষিণখান, ঢাকা-১২৩০, বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত। সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় (ঢাকা) : ৫৫০বি, হজ্জ ক্যাম্প রোড, আশকোনা, দক্ষিণখান, ঢাকা-১২৩০, বাংলাদেশ। আঞ্চলিক কার্যালয় (বগুড়া): টোলারগেট, শেরপুর–৫৮৪০, শেরপুর, বগুড়া। অফিস: ০১৭৭৬-১৩৬০৫০ (হোয়াটসঅ্যাপ), বিজ্ঞাপন: ০৯৬৯৭-৫৪৪৮২৭। ই-মেইল: dailyjokhonsomoy@gmail.com।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রনালয়ের বিধি মোতাবেক নিবন্ধনের জন্য আবেদিত ©সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © দৈনিক যখন সময় ২০২২