Header Premium (728×90)

কানেত্তির অনন্য সাহিত্যদর্শন ও কাফকার চিঠির অন্তরাল

বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম প্রভাবশালী ও জটিল চরিত্রের চিন্তাবিদ এলিয়াস কানেত্তি। ১৯৪৩ সালে তিনি লিখেছিলেন, “আমি বিনয়ী হতে পারি না। আমার ভেতরে অনেক কিছু জ্বলছে। পুরোনো সমাধানগুলো ভেঙে পড়ছে; নতুনগুলোর কিছুই এখনো তৈরি হয়নি। তাই আমি সব জায়গায় একসঙ্গে শুরু করি—যেন আমার সামনে আরও এক শতাব্দী পড়ে আছে।” এই আত্মসচেতন, অস্থির এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষী লেখক পৃথিবীকে শুধু বুঝতে চাননি, বরং তাকে নিজের ভেতরে সম্পূর্ণভাবে ধারণ করতে চেয়েছিলেন। তাঁর এই বিপুল জ্ঞানতৃষ্ণা এবং ক্ষমতার প্রতি তীব্র ঘৃণা তাঁকে সাহিত্যের ইতিহাসে এক অনন্য আসনে বসিয়েছে। পাঠকদের জন্য সুখবর হচ্ছে, দৈনিক এদিন অনলাইন ফ্রান্ৎস কাফকার বিখ্যাত ‘লেটার্স টু ফেলিস বাই ফ্রান্ৎস কাফকা’ বই থেকে তাঁর চিঠিগুলো ধারাবাহিকভাবে বাংলায় প্রকাশ করতে যাচ্ছে। এই চিঠিপত্রের মধ্য দিয়ে পাঠকেরা কাফকার এক গভীর ও ব্যক্তিগত জগতে প্রবেশ করার সুযোগ পাবেন।

কানেত্তির চিন্তাজগৎ গড়ে উঠেছিল তাঁর বিচিত্র জীবন ও বহুভাষিক পরিমণ্ডলে। ১৯০৫ সালে বুলগেরিয়ার রুসে শহরে এক সেফার্দি ইহুদি পরিবারে তাঁর জন্ম হয়, যাদের শিকড় ছিল তুরস্কে। শৈশবেই তিনি বুলগেরিয়া, ইংল্যান্ড, সুইজারল্যান্ড ও জার্মানির মতো বিভিন্ন দেশ ও ভাষার মুখোমুখি হন। ভিয়েনা ও প্যারিস ঘুরে শেষ পর্যন্ত তিনি লন্ডনে স্থায়ী বসতি গড়েন। কানেত্তির কাছে প্রতিটি স্থান মানেই ছিল একটি নতুন ভাষা। তাঁর দাদা সতেরোটি ভাষা জানতেন এবং তাঁর জন্মশহরের রাস্তায় প্রতিদিন সাত-আটটি ভাষা শোনা যেত। লাদিনো, বুলগেরিয়ান, জার্মান, ইংরেজি ও ফরাসি ভাষার আবহে বড় হওয়া কানেত্তির মনে এই বিশ্বাস দৃঢ় হয়েছিল যে, পৃথিবী কোনো একক ভাষার সম্পত্তি নয়। তবে তাঁর চিন্তার প্রধান বাহন হয়ে উঠেছিল জার্মান ভাষা। ১৯৩৮ সালে নাৎসিবাদের ভয়ে ভিয়েনা ছেড়ে নির্বাসনে যেতে বাধ্য হলেও তিনি তাঁর লেখার ভাষা পরিবর্তন করেননি। ১৯৪৪ সালে তিনি জেদ নিয়ে লিখেছিলেন, “আমি জার্মান ভাষাতেই লিখব—কারণ আমি ইহুদি।” ঘৃণার কারণে তিনি গ্যেটে, ব্রখ বা ক্রাউসের মতো মহৎ লেখকদের জার্মান সংস্কৃতিকে বর্জন করতে চাননি।

১৯৩৫ সালে প্রকাশিত হয় কানেত্তির প্রথম এবং একমাত্র উপন্যাস ‘অটো-দা-ফে’। এর মূল চরিত্র প্রফেসর কিয়েন পঁচিশ হাজার বইয়ের মালিক এবং একজন সিনোলজিস্ট, যিনি বইয়ের বাইরের বাস্তব পৃথিবী সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ। কিয়েনের কাছে বইগুলো কেবল জ্ঞান অর্জনের মাধ্যম ছিল না, বরং তাঁর নিজের মনেরই সম্প্রসারণ ছিল। কানেত্তি এই চরিত্রের মাধ্যমে মানুষের অতিরিক্ত জ্ঞানলোভকে ব্যঙ্গ করেছেন, যা শেষ পর্যন্ত মানুষকে সমাজ ও পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। কিয়েনের এই জগৎকে কানেত্তি তিনটি স্তরে ভাগ করেছিলেন— “একটি পৃথিবীহীন মাথা”, “একটি মাথাহীন পৃথিবী” এবং “মাথার ভেতরের পৃথিবী”। এই ত্রিভুজের মধ্যে কানেত্তির নিজের চিন্তার ছায়াও স্পষ্ট, যিনি নিজেও সবকিছু একটি মাথার মধ্যে এনে এক করে ফেলার মরিয়া চেষ্টা করেছিলেন। তাঁর পরবর্তী কাজ ‘ইয়ারউইটনেস’-এ তিনি মানুষের পঞ্চাশ ধরনের একগুঁয়ে মানসিকতার সংক্ষিপ্ত ও তীক্ষ্ণ প্রতিকৃতি এঁকেছেন, যা মানুষের বিচিত্র আবেশের এক অভিধানের মতো।

কানেত্তির দীর্ঘ ২৫ বছরের সাধনার ফসল ‘ক্রাউডস অ্যান্ড পাওয়ার’ (১৯৬০)। ১৯৩৮ থেকে ১৯৬০ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ সময় তিনি প্রায় কিছুই প্রকাশ করেননি, যেন পুরো শতাব্দীকে একটি বইয়ের ভেতর পুরে দিতে চেয়েছিলেন। এই বইয়ে তিনি জনতা ও ক্ষমতার প্রাচীন ও জৈবিক প্রবণতা নিয়ে আলোচনা করেছেন। তাঁর কাছে জনতা কোনো রাজনৈতিক বা সামাজিক শ্রেণী নয়, বরং তা কখনো আগুন, কখনো বৃষ্টি, কখনো বন, মৌমাছির ঝাঁক কিংবা সাপের দলের মতো এক গতিশীল শক্তি। ক্ষমতা কেন এবং কীভাবে কাজ করে, মানুষ কেন আদেশ মেনে নেয়—তা তিনি মানুষের শরীর, ভয় ও সমষ্টিগত আচরণের মধ্য দিয়ে বিশ্লেষণ করেছেন। এই বইয়ে রূপান্তরের এক চমৎকার উদাহরণ দিতে গিয়ে তিনি একটি জর্জীয় লোককাহিনির অবতারণা করেছেন। সেখানে এক শিক্ষানবিশ ছেলে ইঁদুর হয়ে পালিয়ে গেলে তার গুরু তাকে ধরতে বিড়াল রূপ নেন। এরপর শিকার ও শিকারির এই লড়াই চলে একের পর এক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে—জাল, বাজপাখি, ছুরি এবং শেষে বাচ্চাসহ একটি মুরগি। কানেত্তির মতে, এখানে রূপান্তর কোনো অলৌকিক বিষয় নয়, বরং এটি আক্রমণের এক উন্মত্ত কৌশল, যা মানুষের ‘ম্যানিয়া’ বা আবেশের সঙ্গে মিলে যায়। ম্যানিয়াগ্রস্ত মানুষও শিকারকে দেখা, ধাওয়া করা ও ধরার এক তীব্র তৃষ্ণায় তাড়িত হয়, যেখানে ভক্ষণের চেয়ে দখল করাটাই প্রধান হয়ে ওঠে।

অন্যান্য লেখকদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনকে কানেত্তি এক ধরনের নৈতিক অনুশীলন মনে করতেন। ১৯৩৬ সালের নভেম্বরে ভিয়েনায় হারমান ব্রখের পঞ্চাশতম জন্মদিন উপলক্ষে দেওয়া বক্তৃতায় তিনি নিজের লেখকসত্তার মানদণ্ড নির্ধারণ করেছিলেন। তিনি এমন এক লেখক হতে চেয়েছিলেন যিনি নিজের সময়কে ধারণ করেও সময়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াবেন। কার্ল ক্রাউসের প্রতি তাঁর যৌবনের মুগ্ধতা এবং ফ্রান্ৎস কাফকার প্রতি গভীর সাহিত্যিক আকর্ষণ তাঁর চিন্তাকে সমৃদ্ধ করেছিল। কাফকা সম্পর্কে তাঁর বিখ্যাত উক্তি ছিল, “তাকে পড়লে মানুষ ভালো হয়ে যায়—কিন্তু তার জন্য গর্ব করার কিছু থাকে না।” কাফকার লেখায় ক্ষমতার যে প্রত্যাখ্যান এবং দুর্বলতার যে নৈতিক মর্যাদা ছিল, তা কানেত্তিকে গভীরভাবে টেনেকছিল। ‘কাফকাস আদার ট্রায়া’-এ তিনি কাফকার সঙ্গে ফেলিসে বাউয়ারের সম্পর্ককে এক নৈতিক উপাখ্যান হিসেবে পাঠ করেছেন। কানেত্তির কাছে ক্ষমতার বিপরীত রূপ ছিল ক্ষমতাহীনতা, যা তিনি প্রায়শই নিপীড়িত মানুষের চেয়ে প্রাণীদের মধ্যে বেশি খুঁজে পেতেন, যা ফরাসি দার্শনিক সিমোন ভেইলের চিন্তার সঙ্গে মিলে যায়।

মৃত্যুর বিরুদ্ধে কানেত্তির ছিল এক আজীবন ও আপসহীন লড়াই। তিনি মৃত্যুকে জীবনের স্বাভাবিক সমাপ্তি হিসেবে মানতে চাননি, একে দেখেছেন একটি চরম অন্যায় হিসেবে। ১৯৬০ সালে তিনি লিখেছিলেন, “আমি এখনো মৃত্যুর বিরুদ্ধে কিছু করতে পারিনি।” তিনি একশ বছর বাঁচতে চেয়েছিলেন আরও বেশি অনুভব করতে এবং বিশ্বকে নিজের মধ্যে ধারণ করতে। এই তীব্র আকাঙ্ক্ষা তাঁকে এক চিরশিক্ষার্থীতে পরিণত করেছিল, যার প্রমাণ মেলে তাঁর নোটবইগুলোতে। সেখানে প্রবাদ, মৃত্যু, বন্ধুত্ব, ক্ষমতা ও প্রেম নিয়ে অসংখ্য ছোট-বড় চিন্তা পাশাপাশি অবস্থান করছে। কানেত্তি চোখের চেয়ে কানের ওপর বেশি ভরসা করতেন, কারণ কান মানুষের উপস্থিতিকে স্বীকার করে। তাঁর ‘দ্য ভয়েসেস অব ম্যারাকেশ’ বইয়ে তিনি ভিক্ষুক, অন্ধ শিশু ও প্রাণীদের কান পেতে শুনেছেন এবং লিখেছেন, “আমি সেই পুঁটলিটির জন্য গর্বিত ছিলাম, কারণ সেটি জীবিত ছিল।” মায়ের কাছ থেকে বই ও ভাষার প্রতি তীব্র অনুরাগ পেলেও পরে তিনি বিজ্ঞান ও আদিম সংস্কৃতির দিকে ঝুঁকে পড়েন। তিনি বলেছিলেন, “সব জাতির সব মিথকে জানা আমার জীবনের একটি গুরুতর লক্ষ্য।” শেষ পর্যন্ত, কানেত্তির সাহিত্য আমাদের শেখায় কীভাবে আরাম ও আত্মতুষ্টি এড়িয়ে জীবনকে তীব্রভাবে অনুভব করতে হয়। ব্রখ ও গ্যেটের মতো তাঁর সাহিত্যও শেষ পর্যন্ত আমাদের কাছে একটি সাধারণ কিন্তু কঠিন আহ্বান জানায়—শুধু শান্ত হয়ে ‘শ্বাস নেওয়া’।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Adin

Recent Posts

লক্ষ্মীপুরে কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযানে ২৪৪ জন আটক

লক্ষ্মীপুর জেলার ছয় থানায় একযোগে কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযান চালিয়েছে জেলা পুলিশ। পাঁচ ঘণ্টার এ অভিযানে…

8 minutes ago

ওয়াশিংটনে সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী, মার্কো রুবিওর সঙ্গে বৈঠকের প্রস্তুতি

সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান সরকারি সফরে ওয়াশিংটন ডিসিতে পৌঁছেছেন। সফরকালে তিনি মার্কিন…

8 minutes ago

গাজীপুরে পুলিশ হেফাজত থেকে বাথরুমে যাওয়ার কথা বলে পলাতক হাজতি

গাজীপুরে আদালতে হাজিরা দিয়ে ফেরার পথে বাথরুমে যাওয়ার কথা বলে পুলিশের হেফাজত থেকে পালিয়ে গেছেন…

29 minutes ago

পাটগ্রামে ট্রাক-ইজিবাইক সংঘর্ষে নিহত ৩, আহত ৪

লালমনিরহাটের পাটগ্রামের বুড়িমারী ঘন্টিবাজার এলাকায় ট্রাক ও ইজিবাইকের মুখোমুখি সংঘর্ষে ৩ জন নিহত ও অন্তত…

30 minutes ago

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মাদকবিরোধী অভিযানের খবর সংগ্রহে আহত ৩ সাংবাদিক

রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে শাহবাগ থানা পুলিশের মাদকবিরোধী অভিযান চলাকালে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে হামলার শিকার…

37 minutes ago

মিরপুরে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা: নতুন ওসি ও ৪ পরিদর্শক বদলি

রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় মিরপুর মডেল থানার ওসিসহ মোট পাঁচ…

38 minutes ago

This website uses cookies.