
তুরস্কের ইস্তাম্বুলে মাটির নিচে পাঁচশো কিলোমিটারের বেশি টানেল প্রস্তুত করা হয়েছে। জার্মানি তাদের পাতাল রেল স্টেশনগুলো আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহারযোগ্য কি না তা যাচাই করছে। ফিনল্যান্ড তাদের রিজার্ভ বাহিনীর বয়সসীমা ৬৫ বছর পর্যন্ত বাড়িয়ে নিয়েছে। ইউরোপ জুড়ে যুদ্ধের এই প্রস্তুতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা, আমেরিকার পতন ও চীনের উত্থানের মতো সমীকরণগুলো বিশ্বযুদ্ধের আশঙ্কাকে জোরালো করছে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সামাজিক মাধ্যমে একটি ধারণা বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে—বিশ্বযুদ্ধ লাগলে বাংলাদেশ নাকি রাতারাতি ধনী হয়ে যাবে। কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, বাংলাদেশ কৃষিপণ্য উৎপাদন করে এবং নদীপথ থাকার সুবাদে যুদ্ধের সময় সারা বিশ্বকে খাদ্য সরবরাহ করতে পারবে।
তবে এই সরল সমীকরণটি বাস্তবতার চেয়ে ইচ্ছাপূরণের ওপর বেশি নির্ভরশীল। প্রথমত, তিস্তার পানি নিয়ে গত এক দশকের সংকট প্রমাণ করে যে বাংলাদেশের নদীগুলোর নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি আমাদের হাতে নেই। পদ্মা, তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্রের পানিপ্রবাহ উজানের দেশের নীতির ওপর নির্ভরশীল, যা যুদ্ধের বাজারে নদীকে 'সোনার পথ' হিসেবে গড়ে তোলার সম্ভাবনাকে দুর্বল করে দেয়। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশ। কৃষি যন্ত্রপাতি ও সেচ ব্যবস্থার জন্য প্রয়োজনীয় ডিজেল ও বিদ্যুৎ এবং সারের জন্য আমরা আমদানির ওপর নির্ভরশীল। বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হলে অন্য সবার আগে বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদনই বড় ধরনের ধাক্কা খাবে।
তৃতীয়ত, একটি সত্যিকারের বিশ্বযুদ্ধ মানে কেবল সৈনিকদের খাবারের চাহিদা নয়, বরং গোটা বৈশ্বিক অর্থব্যবস্থার পতন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাস বলে, সেই সময় শিপিং রুট বিপর্যস্ত হয়েছিল, বিমা প্রিমিয়াম আকাশচুম্বী হয়েছিল এবং আন্তর্জাতিক লেনদেন ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়েছিল। এই পরিস্থিতিতে ধান বা সবজি উৎপাদন করলেই তা বিদেশি সৈনিকদের কাছে বিক্রি হবে—এই ধারণাটি একটি রূপকথা ছাড়া আর কিছুই নয়। পণ্য কেনার সক্ষমতা, মুদ্রার বিনিময় এবং নিরাপদ বন্দর ব্যবহারের প্রশ্নগুলো এখানে অমীমাংসিত থেকে যায়।
তাহলে ইউরোপের দেশগুলোর এই প্রস্তুতির অর্থ কী? তাদের এই উদ্যোগ মুনাফার জন্য নয়, বরং টিকে থাকার জন্য। বাঙ্কার বানানো বা রিজার্ভ বাহিনী বাড়ানো ধ্বংস এড়ানোর প্রস্তুতি। বাংলাদেশের জন্য প্রকৃত চিন্তার বিষয় হওয়া উচিত—যুদ্ধ লাগলে আমরা নিজেদের খাদ্য নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করব? আমদানিনির্ভর জ্বালানি ও সারের বিকল্প কী হতে পারে? দেশের নিজস্ব কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থা কতটা স্বনির্ভর—বিক্রি করার জন্য নয়, নিজেদের বাঁচানোর জন্য। একাত্তরের চেতনা নিয়ে বিতর্ক, জুলাই বিপ্লবের ব্যাখ্যা বা তেলের দাম নিয়ে ক্ষোভের মতো আলোচনার মাঝে এই মৌলিক প্রশ্নটি হারিয়ে যাচ্ছে। বিশ্ব যখন অনিশ্চয়তার প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন আমরা কি প্রস্তুতি নিচ্ছি, নাকি কেবল স্বপ্ন দেখছি? প্রস্তুতি আর কল্পনার মধ্যে পার্থক্যটা বড়। একটা আমাদের বাঁচায়, অন্যটি কেবল সান্ত্বনা দেয়। যুদ্ধ থেকে কেউ ধনী হয় না, বরং কিছু মানুষ ধ্বংস এড়িয়ে টিকে থাকে। প্রশ্ন হলো—আমরা কি সেই টিকে থাকার দলে থাকতে পারব?
সম্পাদক ও প্রকাশক: মাহের আহমেদ, প্রধান সম্পাদক: মোঃ মোত্তালিব সরকার। প্রকাশক কর্তৃক ৫৫০বি, হজ্জ ক্যাম্প রোড, আশকোনা, দক্ষিণখান, ঢাকা-১২৩০, বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত। সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় (ঢাকা) : ৫৫০বি, হজ্জ ক্যাম্প রোড, আশকোনা, দক্ষিণখান, ঢাকা-১২৩০, বাংলাদেশ। আঞ্চলিক কার্যালয় (বগুড়া): টোলারগেট, শেরপুর–৫৮৪০, শেরপুর, বগুড়া। অফিস: ০১৭৭৬-১৩৬০৫০ (হোয়াটসঅ্যাপ), বিজ্ঞাপন: ০৯৬৯৭-৫৪৪৮২৭। ই-মেইল: dailyjokhonsomoy@gmail.com।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রনালয়ের বিধি মোতাবেক নিবন্ধনের জন্য আবেদিত ©সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © দৈনিক যখন সময় ২০২২