
আমি যখন প্রথম বোর্হেস পড়ি, তখন তিনি বিশ্বসাহিত্যের কোনো সুপরিচিত নাম ছিলেন না। তাঁর নাম তখন ছিল কয়েক তরুণ লেখক ও পাঠকের মধ্যে বিনিময় করা এক গোপন সংকেতের মতো। ১৯৪০-এর কাছাকাছি সময়ে মেক্সিকোতে হোসে লুইস মার্তিনেস, আলি চুমাসেরো, হাভিয়ের ভিয়াউরুতিয়া এবং আরও কয়েকজন মিলে আমরা তাঁকে এক গোপন নিষ্ঠার সঙ্গে পাঠ করতাম। বোর্হেস ছিলেন লেখকদের জন্য লেখক। তাঁর গল্পগুলো প্রথমে পত্রিকার পাতায় প্রকাশিত হয় এবং পরে ১৯৪১ সালে 'দ্য গার্ডেন অব ফর্কিং পাথস' গ্রন্থে স্থান পায়। আমার কাছে এখনো সেই নীল মলাট ও সাদা অক্ষরের পুরনো সংস্করণটি আছে, যার নিচে একটি তীর চিহ্ন ছিল। সেই তীরটি কোনো ভৌগোলিক দক্ষিণ নয়, বরং এক মানসিক ভূখণ্ডের দিকে নির্দেশ করত।
বোর্হেসকে পড়া মানে কেবল একটি বই পড়া নয়, বরং এক কণ্ঠের সঙ্গে নীরবে কথোপকথন চালিয়ে যাওয়া। পরবর্তী জীবনে খ্যাতি তাঁকে পৌরাণিক ব্যক্তিত্বে পরিণত করলেও, আমাদের প্রথম বোর্হেস ছিলেন অন্যরকম। তাঁর বইয়ের আড়ালে মানুষটি প্রায় অদৃশ্য থাকতেন। আলফোনসো রেয়েসের কাছে প্রথম তাঁর বাস্তব উপস্থিতির কথা শুনেছিলাম। রেয়েস তাঁকে শ্রদ্ধা ও স্নেহ করলেও তাঁদের সাহিত্যিক রুচি ছিল ভিন্ন। ১৯৪৭ সালে প্যারিসে আর্জেন্টাইন বন্ধু হোসে বিয়াঙ্কো, সিলভিনা ওকাম্পো ও আদলফো বিয়োই কাসারেসের মুখে বোর্হেসের কথা এত শুনেছিলাম যে, না দেখেও মনে হতো আমি তাঁকে চিনি।
১৯৭১ সালে অস্টিনে অবশেষে তাঁর সঙ্গে দেখা হলো। সেখানে সৌজন্য ছিল, আবার দূরত্বও ছিল। আলামোর রক্ষকদের প্রতি তাঁর প্রশংসা আমাকে আহত করেছিল, কারণ আমার দেশপ্রেম তখন ইতিহাসকে সরল করে দেখেছিল। পরে মেক্সিকো ও বুয়েনস আয়ার্সে আমাদের দেখা হয়েছে, তখন কথাবার্তা সহজ হয়েছে। আমরা আবিষ্কার করেছি আমাদের প্রিয় অনেক কবিই একই। বোর্হেস এই মিলগুলোতে আনন্দ পেতেন। কোনো কবিতার পঙ্ক্তি হঠাৎ আবৃত্তি করলে কথোপকথন বদলে যেত; সাহিত্য তখন আলোচনার বিষয় না হয়ে ভাগ করা অভিজ্ঞতায় পরিণত হতো।
মেক্সিকোর একটি অনুষ্ঠানে ভক্তদের ভিড় থেকে সরিয়ে নিয়ে আমার স্ত্রী ও আমি তাঁর সঙ্গে এক কোণে দাঁড়িয়েছিলাম। সেই ভিড়ের মধ্যেই তিনি তুলে-র কবিতা আবৃত্তি করলেন, যেন বর্তমানের মাঝখানে হঠাৎ অতীত এসে দাঁড়িয়েছে। বুয়েনস আয়ার্সে মারিয়া কোদামা আমাদের নিয়ে গেলেন পুরোনো লেজামা পার্কে। সেখানে রোমান নেকড়ের মূর্তির সামনে বোর্হেস গভীর আবেগে রেমুসের মাথায় হাত রাখলেন। এরপর ক্যাফে তোর্তোনির আড্ডায় তিনি তাঁর যৌবনের বুয়েনস আয়ার্সের কথা বলতেন—সেই শহর, যা পাথরের নয়, শব্দের শহর।
সেদিন তাঁর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে তাঁর বিষণ্নতা আমাকে বিস্মিত করেছিল। খ্যাতি একজন লেখককে কখনো কখনো তাঁর নিজের সময়ের কাছ থেকেও বিচ্ছিন্ন করে। তিনি অন্য এক সময়ের মানুষ হয়ে উঠেছিলেন। বোর্হেস একদিন বলেছিলেন, তিনি অন্য কোথাও গিয়ে মরতে চান—হয়তো জাপানে। বৌদ্ধ না হয়েও শূন্যতার ধারণা তাঁকে আকর্ষণ করত। শেষের দিকে নিউইয়র্কে আমাদের শেষ দেখা হয়েছিল। সেখানে এলিয়ট ওয়াইনবার্গারের উপস্থিতিতে চীনা কবিতা নিয়ে কথাবার্তা হয়েছিল। আমি ভেলার্দের কবিতার লাইন আবৃত্তি করলে তিনি থেমে জিজ্ঞেস করেছিলেন, কিন্তু আমি কোনো উত্তর খুঁজে পাইনি।
বোর্হেসের মৃত্যু আমাকে সেই পুরোনো সত্যের সামনে দাঁড় করিয়েছিল যে, মৃত্যুর জন্য আমরা সারাজীবন প্রস্তুত হই, কিন্তু মৃত্যু কখনো প্রস্তুত হয়ে আসে না। ছিয়াশি বছর বয়সও মৃত্যুর জন্য যথেষ্ট নয়। খ্যাতির মুখোশ সরে গেছে, থেকে গেছে তাঁর লেখা। তিনি প্রবন্ধ, কবিতা ও ছোটগল্প—এই তিনটি রূপে লিখলেও তাঁর ক্ষেত্রে বিভাজনটি গুরুত্বপূর্ণ নয়। তাঁর প্রবন্ধে গল্পের গতি, গল্পে কবিতার ঘনত্ব, কবিতায় প্রবন্ধের চিন্তা—সবকিছুর সেতু হলো চিন্তা। তিনি ছিলেন অধিবিদ্যার প্রতি আকৃষ্ট এক সংশয়বাদী মন।
তাঁর লেখায় আয়না বারবার ফিরে আসে, যা আমাদের জানিয়ে দেয় যে ‘আমি’ একটি প্রতিচ্ছবি মাত্র। বোর্হেসের কাছে পরিচয় ছিল একটি প্রশ্ন, উত্তর নয়। তাঁর বিশ্বজনীনতা লাতিন আমেরিকার পরিচয়কে মুছে দেয়নি, বরং ইউরোপীয় ঐতিহ্যকে ভেতর ও বাইরে থেকে দেখার এক অনন্য দৃষ্টিভঙ্গি দিয়েছিল। সভ্যতা ও বর্বরতা, যুক্তি ও প্রবৃত্তি, গ্রন্থাগার ও রাস্তা—এই দ্বৈততার সংঘর্ষ থেকেই তাঁর সাহিত্য তৈরি হয়েছে। তিনি কোনো মতবাদকেই সাহিত্যিক প্রশ্নের ঊর্ধ্বে রাখেননি।
তাঁর গল্পের শক্তি ফর্মের বিপ্লবে নয়, বরং ভারসাম্যে। তিনি একটি পরিস্থিতিকে এমনভাবে নির্মাণ করেন, যাতে তা বাস্তবের চেয়ে একটু বেশি বাস্তব হয়ে ওঠে। তিনি বিন্দুর মধ্যে অসীমকে ধরতে চেয়েছেন। তাঁর সমস্ত সাহিত্যকে একটি মাত্র বাক্যে নামিয়ে আনা যায়—মানুষ সময়ের মধ্যে নিজেকে খুঁজছে এবং প্রতিবারই নিজের বদলে অন্য কাউকে আবিষ্কার করছে। বোর্হেস বলেছিলেন, 'সময়ই সেই পদার্থ, যা দিয়ে আমি তৈরি।' একটি তীর ছুড়ে বুঝতে পারা যায়, তীরন্দাজ, তীর ও লক্ষ্য—তিনটি আলাদা বস্তু নয়। মানুষই তীরন্দাজ, মানুষই তীর, মানুষই লক্ষ্য। আর সময়—সম্ভবত সেই অদৃশ্য স্থান, যেখানে তিনটিই এক মুহূর্তের জন্য মিলিত হয়।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মাহের আহমেদ, প্রধান সম্পাদক: মোঃ মোত্তালিব সরকার। প্রকাশক কর্তৃক ৫৫০বি, হজ্জ ক্যাম্প রোড, আশকোনা, দক্ষিণখান, ঢাকা-১২৩০, বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত। সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় (ঢাকা) : ৫৫০বি, হজ্জ ক্যাম্প রোড, আশকোনা, দক্ষিণখান, ঢাকা-১২৩০, বাংলাদেশ। আঞ্চলিক কার্যালয় (বগুড়া): টোলারগেট, শেরপুর–৫৮৪০, শেরপুর, বগুড়া। অফিস: ০১৭৭৬-১৩৬০৫০ (হোয়াটসঅ্যাপ), বিজ্ঞাপন: ০৯৬৯৭-৫৪৪৮২৭। ই-মেইল: dailyjokhonsomoy@gmail.com।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রনালয়ের বিধি মোতাবেক নিবন্ধনের জন্য আবেদিত ©সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © দৈনিক যখন সময় ২০২২