
উপনিবেশোত্তর সমাজ ও রাষ্ট্রে গণতান্ত্রিক রূপান্তরের ক্ষেত্রে ঔপনিবেশিক আমলের মনস্তাত্ত্বিক ও প্রশাসনিক প্রভাব এখনো এক বড় অন্তরায় হিসেবে কাজ করছে। দখলদার শক্তিগুলো কীভাবে তাদের শাসন দীর্ঘস্থায়ী করতে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ভেতর কায়েমি স্বার্থবাদী এলিট শ্রেণি তৈরি করেছিল এবং কীভাবে ইতিহাস বিকৃতি ও ভাষার ওপর আঘাত এনেছিল, তা গভীরভাবে পর্যালোচনার দাবি রাখে।
ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো প্রধানত তিনটি কৌশলে তাদের শাসন টিকিয়ে রাখত। প্রথমত, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্য থেকে একটি বৈষয়িক স্বার্থান্বেষী শ্রেণি তৈরি করা হতো, যারা নিজেদের স্বার্থে বিদেশি শাসনকে টিকিয়ে রাখতে সহযোগিতা করত। দ্বিতীয়ত, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের বিকৃত বয়ান ছড়িয়ে স্থানীয়দের মনে হীনম্মন্যতা তৈরি করা হতো এবং সাম্প্রদায়িক বিভেদ সৃষ্টি করা হতো। তৃতীয়ত, মাতৃভাষার পরিবর্তে ঔপনিবেশিক ভাষা ও নতুন শিক্ষানীতি চালুর মাধ্যমে একটি জনবিচ্ছিন্ন ‘শিক্ষিত’ এলিট সম্প্রদায় তৈরি করা হতো।
নিজস্ব ভাষা ও ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পর্কহীন এই তরুণ প্রজন্ম নিজের মাতৃভূমি ও সংস্কৃতিকে অবজ্ঞার চোখে দেখতে শুরু করে। এই এলিটদের মানসিকতা নিয়ে ১৮৯২ সালের শুরুতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১ / 1861-1941) লিখেছিলেন, "যাহারা অনেক ইংরাজি কেতাব পড়িয়াছেন তাঁহারা অনেকেই আধুনিক বাংলা লেখা ও লেখকদের প্রতি কৃপাকটাক্ষ নিক্ষেপ করিয়া থাকেন। এই রূপ অবজ্ঞা প্রকাশ করিয়া তাহারা অনেকটা আত্মপ্রসাদ লাভ করেন। বোধ করি ইতর-সাধারণ হইতে আপনাকে স্বতন্ত্র করিয়া লইয়া অভিমানে তাঁহারা আপাদমস্তক কণ্টকিত হইয়া উঠেন।"
এই এলিট শ্রেণির একটি ক্ষুদ্র অংশ অবশ্য উচ্চশিক্ষার প্রভাবে স্বাধিকার আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। যেমন তানজানিয়ার জুলিয়াস নেরেরে, ঘানার কোয়ামে নক্রুমা, ফরাসি শাসিত গিনির আহমেদ সেকু তুরে, পর্তুগিজ শাসিত গিনির আমিলকার কাবরাল এবং ভারতে করমচাঁদ গান্ধী, মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ও জওহরলাল নেহরু। তবে এলিটদের একটি বড় অংশ ঔপনিবেশিক শক্তির দালালি করেছে এবং স্বাধীনতার পরও সেই ঔপনিবেশিক ধ্যান-ধারণা ধরে রেখেছে, যা বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে প্রকৃত গণতান্ত্রিক মুক্তির পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভারতবর্ষে ইউরোপীয় উপনিবেশের সূচনা হয় ১৫০৩ সালে কেরালার কোচিন বন্দরে পর্তুগিজদের বাণিজ্যকুঠি স্থাপনের মধ্য দিয়ে। পরে ১৫১০ সালে তারা গোয়া দখল করে প্রথম ইউরোপীয় উপনিবেশ স্থাপন করে। বাংলায় ১৫১৬ সালে পর্তুগিজদের আগমন ঘটে এবং ১৫৩৬ সালে সুলতান গিয়াসউদ্দিন মাহমুদ শাহ্র অনুমতিতে চট্টগ্রামে বাণিজ্যকুঠি খোলে। তবে জলদস্যুতা, লুণ্ঠন ও বলপূর্বক ধর্মান্তকরণের অভিযোগে ১৬৩২ সালে মোগল সম্রাট শাহজাহান হুগলি থেকে এবং ১৬৬৬ সালে সম্রাট আওরঙ্গজেব চট্টগ্রাম থেকে পর্তুগিজদের বিতাড়িত করেন। ১৯৬১ সালে সামরিক অভিযানের মাধ্যমে ভারত সরকার গোয়াকে পর্তুগিজ শাসনমুক্ত করে, যা ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশরা চলে যাওয়ার পরও পর্তুগিজদের দখলে ছিল।
অন্যদিকে, ব্রিটিশ শাসনের সূচনাও বাণিজ্যের পথ ধরে। ১৬০৯ সালে মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীরের (১৫৬৯-১৬২৭ / 1569-1627) অনুমতি নিয়ে ১৯১২ (1912) সালের মধ্যে সুরাটে বাণিজ্যকেন্দ্র গড়ে তোলে ইংরেজরা। তবে ভারতে ব্রিটিশ শাসনের মূল ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয় ১৬৩৩ সালে উড়িষ্যার বালাসোরে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির একটি ছোট কারখানা স্থাপনের মাধ্যমে। যদিও খোদ বাংলা প্রদেশে কারখানা স্থাপনের অনুমতি পেতে কোম্পানিকে আরও ২৩ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল। (তথ্যসূত্র: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, “বাংলাসাহিত্যের প্রতি অবজ্ঞা”, প্রবন্ধ সমগ্র, পৃষ্ঠা: ৪৮১ / 481)
সম্পাদক ও প্রকাশক: মাহের আহমেদ, প্রধান সম্পাদক: মোঃ মোত্তালিব সরকার। প্রকাশক কর্তৃক ৫৫০বি, হজ্জ ক্যাম্প রোড, আশকোনা, দক্ষিণখান, ঢাকা-১২৩০, বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত। সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় (ঢাকা) : ৫৫০বি, হজ্জ ক্যাম্প রোড, আশকোনা, দক্ষিণখান, ঢাকা-১২৩০, বাংলাদেশ। আঞ্চলিক কার্যালয় (বগুড়া): টোলারগেট, শেরপুর–৫৮৪০, শেরপুর, বগুড়া। অফিস: ০১৭৭৬-১৩৬০৫০ (হোয়াটসঅ্যাপ), বিজ্ঞাপন: ০৯৬৯৭-৫৪৪৮২৭। ই-মেইল: dailyjokhonsomoy@gmail.com।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রনালয়ের বিধি মোতাবেক নিবন্ধনের জন্য আবেদিত ©সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © দৈনিক যখন সময় ২০২২