২০২৬ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বহুল আলোচিত তিস্তা মহাপরিকল্পনা প্রকল্পে যুক্ত হওয়ার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে আগ্রহ প্রকাশ করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। সরকারের কাছে ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে এই আগ্রহের কথা জানানোর পর গত ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে একটি মার্কিন বিশেষজ্ঞ দল বাংলাদেশ সফরে এসে তিস্তা ব্যারাজ এলাকা পরিদর্শনও করে গেছে। ২০২৬ (2026) সালের এই সফরটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় ও কূটনৈতিক সূত্রগুলো এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা এই প্রকল্পের জন্য যখন বাংলাদেশ ও চীনের বিশেষজ্ঞদের নিয়ে যৌথ সমীক্ষা কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া চলছে, ঠিক তখনই যুক্তরাষ্ট্রের এই আগ্রহকে ঘিরে নতুন ভূরাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হচ্ছে।
কূটনৈতিক মহলের মতে, তিস্তা প্রকল্পে যুক্তরাষ্ট্রের আকস্মিক আগ্রহ মূলত এই অঞ্চলে চীন-মার্কিন ভূরাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতারই অংশ। এর আগে ২০২৪ সালেও চীনা অর্থায়নে প্রকল্পটি যখন প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে ছিল, তখন হঠাৎ করে ভারত এক বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব দিলে তিস্তা বাস্তবায়নের উদ্যোগ থমকে যায়। এবারের মার্কিন আগ্রহের বিষয়ে ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তাদের কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছেন, ওয়াশিংটন এই প্রকল্পটিকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে এবং মার্কিন সেনাবাহিনীর পানিসম্পদ বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী ড. ক্যালভিন ক্রিচের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল ইতিমধ্যেই প্রকল্প এলাকা ঘুরে গেছে।
ড. ক্যালভিন ক্রিচ মার্কিন ইঞ্জিনিয়ারিং কোরের একজন সিনিয়র পানি বিশেষজ্ঞ এবং নদী প্রকৌশলের আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব। তিনি আন্তর্জাতিক পানি পরিবহন পরিকাঠামো সংস্থার (পিআইএএনসি) সহ-সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। সমন্বিত পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা, নদী ভূ-আকৃতিবিদ্যা, পলি পরিবহন মডেলিং, ড্রেজিং এবং নৌ চলাচল বিষয়ে প্রায় দুই দশকের অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। এর আগে তিনি ইউএসএসিই ল্যাটিন আমেরিকা (ল্যাটাম) উদ্যোগের সিনিয়র কারিগরি প্রধান হিসেবে ব্রাজিল, পেরু, কলম্বিয়া, ইকুয়েডর ও পানামায় বিভিন্ন নদীপথ প্রকল্প পরিচালনা করেছেন।
পানিসম্পদ ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তিস্তা প্রকল্পের একটি বড় ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র ঠিক কীভাবে এই প্রকল্পে যুক্ত হতে চায় তা এখনও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। তাদের পাঠানো চিঠিতে বিস্তারিত কিছু না থাকলেও প্রাথমিকভাবে তারা ইকোলজিক্যাল ইমপ্যাক্ট এসেসমেন্ট বা পরিবেশগত প্রভাব নিরূপণের কাজ করতে চায় বলে জানিয়েছে। কর্মকর্তারা উল্লেখ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের মতো একটি দেশকে ‘না’ বলা বাংলাদেশের জন্য কঠিন। আগামীতে বিস্তারিত আলোচনার মাধ্যমে তাদের মূল ভাবনা স্পষ্ট হবে বলে তারা আশা করছেন।
এই প্রকল্পে ভারতের ভূমিকা নিয়ে কর্মকর্তারা জানান, ২০১৬ সাল থেকে চীনের সঙ্গে তিস্তা প্রকল্প নিয়ে আলোচনা চলছে এবং বর্তমানে চীন বেশ তৎপর। ২০২০ সালে চীনকে প্রকল্প থেকে দূরে রাখতে ভারত এক বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছিল। বর্তমানে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের অস্থিরতার কারণে ভারত সরাসরি চীনের বিরোধিতার অবস্থানে নেই। এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র যুক্ত হলে ভারত নাখোশ হবে না, বরং খুশিই হতে পারে; যদিও ভারত এই অঞ্চলে মার্কিন উপস্থিতি খুব একটা ভালো চোখে দেখে না।
এদিকে, বর্তমান বিএনপি সরকার তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়নে নতুন করে কাজ শুরু করতে চাইছে। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নতুন করে ফিজিবিলিটি স্টাডি বা সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য একটি উচ্চপর্যায়ের বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন চূড়ান্ত হয়েছে। এই কমিটিতে ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিং (আইডব্লিউএম), সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেস (সিইজিআইএস), পানি উন্নয়ন বোর্ডের বর্তমান ও সাবেক বিশেষজ্ঞ, নদী গবেষণা ইনস্টিটিউট, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা এবং বুয়েটের পানি বিশেষজ্ঞরা থাকবেন।
নতুন এই কমিটিতে অন্তত তিনজন চীনা বিশেষজ্ঞ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়ে গত ২ সেপ্টেম্বর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে চীন সরকারকে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠানো হয়েছে। তবে চীন সরকার বিশেষজ্ঞদের নামের তালিকা পাঠানোর আগে জানতে চেয়েছে, তাদের বিশেষজ্ঞদের ভূমিকা ঠিক কী হবে—তারা কি বাংলাদেশে এসে সরেজমিনে কাজ করবেন নাকি বেইজিংয়ে বসে পরামর্শ দেবেন। চীন মূলত তাদের বিশেষজ্ঞদের যুক্ত করার আগে সার্বিক বিষয়ে নিশ্চিত হতে চাইছে।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, তিস্তা প্রকল্পে চীন ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়েরই সহযোগিতা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। সমীক্ষার কাজে চীনা বিশেষজ্ঞদের যুক্ত করার পাশাপাশি তাদের কাছ থেকে ঋণ ও কারিগরি সহায়তা নেওয়া যেতে পারে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে কারিগরি সহায়তার পাশাপাশি তিস্তার উজানে ভারতের কার্যক্রম সংক্রান্ত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য-উপাত্ত পাওয়া সম্ভব। সরকার মূলত একটি ভারসাম্যপূর্ণ নীতির মাধ্যমে তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে চায় এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমীকরণকেও বিবেচনায় রাখছে।
যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবীর মনে করেন, তিস্তা প্রকল্পে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ মূলত চীনকে মোকাবিলা করার ভূরাজনৈতিক পদক্ষেপ। তিনি বলেন, চীন ও যুক্তরাষ্ট্র দুই দেশই বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এবং এখানে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে এগোতে হবে। চীন থেকে কারিগরি ও ঋণ সহায়তা নেওয়া যেতে পারে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কারিগরি সহায়তার পাশাপাশি বিশ্বব্যাংকের ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে তাদের সাহায্য নেওয়া যেতে পারে। তবে বাংলাদেশ যেন ভূরাজনীতির খেলার মাঠে পরিণত না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. এম শহীদুজ্জামান এই মার্কিন আগ্রহকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র যুক্ত হলে এখানে ভারতের নাক গলানোর সুযোগ থাকবে না। তিনি মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে এক ধরনের বোঝাপড়া রয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র জানে যে চীনকে বাদ দিয়ে এই অঞ্চলে কিছু করা সম্ভব নয়। তাই তিস্তা প্রকল্প নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনা কী, তা আমাদের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক ও উন্নয়ন সহযোগী চীনের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করা উচিত।
উল্লেখ্য, ২০১৬ সালে চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ‘পাওয়ার চায়না’র সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সইয়ের মাধ্যমে ‘তিস্তা নদী মহাপরিকল্পনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প’ এর যাত্রা শুরু হয়। ২০১৯ সালে তারা সমীক্ষা শেষ করে নদীর তলদেশের ১০০ কিলোমিটারের বেশি অংশ খনন, ১৭১ বর্গকিমি ভূমি পুনরুদ্ধার এবং বন্যা প্রতিরোধে ১০০ কিলোমিটারের বেশি বাঁধ ও সড়ক নেটওয়ার্ক নির্মাণের প্রস্তাব দেয়। ২০২০ সালে বাংলাদেশ সরকার চীনের কাছ থেকে ৯৮৩.২৭ মিলিয়ন ডলারের ঋণ সহায়তা চাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ২০২২ সালে চীন পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট প্রকাশ করলেও কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি সই হয়নি।
২০২৪ সালের নির্বাচনের পর শেখ হাসিনার চীন সফরের সময় এই চুক্তি সইয়ের কথা থাকলেও, তার আগেই ৮ মে ভারতের তৎকালীন পররাষ্ট্র সচিব বিনয় মোহন কোয়াত্রা ঢাকা সফরে এসে তিস্তায় এক বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব দেন। এরপর শেখ হাসিনা জুনে ভারত এবং জুলাইয়ে চীন সফর করেন। চীন সফরে তিস্তা ইস্যুটি এড়িয়ে যাওয়া হয় এবং পরবর্তীতে ১৪ জুলাই হাসিনা ঘোষণা করেন যে তিনি চান প্রকল্পটি ভারতই বাস্তবায়ন করুক। এর তিন সপ্তাহের মাথায় ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নেন। পরবর্তী সময়ে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার চীনের সহায়তায় প্রকল্পটি এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেও কাজ শুরু করতে পারেনি। এখন নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তিস্তা প্রকল্প নিয়ে নতুন করে এগোচ্ছে সরকার।
হাসিনা ২০২৪ সালের ৯ জুন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে যোগ দেন। এরপর ওই বছরের ২১-২২ জুন ভারতে রাষ্ট্রীয় সফর করেন হাসিনা। দিল্লি সফরের মাত্র দুই সপ্তাহ পর ৮-১০ জুলাই বেইজিং সফর করেন তিনি। ওই সফরে তিস্তার ইস্যুটি এড়িয়ে যায় বাংলাদেশ। ফলে খালি হাতে ফিরতে হয় হাসিনাকে। ১৪ জুলাই গণভবনে সংবাদ সম্মেলনে হাসিনা ঘোষণা করেনÑ তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়নে চীন প্রস্তুত। কিন্তু আমি চাই, এই প্রকল্প ভারত বাস্তবায়ন করুক। ভারত যদি এই প্রকল্প হাতে নেয়, তাহলে সরকার যা যা প্রয়োজন তার সব কিছুই করবে। ওই ঘোষণার মাত্র তিন সপ্তাহের মধ্যে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে দেশ থেকে পালিয়ে দিল্লিতে আশ্রয় নেন হাসিনা। পরবর্তী সময়ে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার চীনের সহায়তায় তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিলেও তা বাস্তবায়নের কাজ শুর করতে পারেনি। এখন তিস্তা প্রকল্পে চীনের পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আগ্রহ দেখানোর পর এই প্রকল্পের ব্যাপারে নতুন পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হতে চাইছে বিএনপি সরকার।
দেশের চারটি ডিজিটাল ব্যাংক স্থাপনের প্রাথমিক অনুমতি দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ। এর মধ্যে রয়েছে…
রাজধানীর শাহ আলী থানার ডি ব্লকের ৮ নম্বর সড়কের পাশে একটি কালো পলিথিনের ব্যাগ থেকে…
সৌদি আরবের মক্কা নগরীসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে সম্ভাব্য ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন হামলার আশঙ্কায় উচ্চ সতর্কতা…
রাজশাহীর মোহনপুরে মাদকাসক্ত ছেলের হাসুয়ার কোপে মা জান্নাতুন নিহত হয়েছেন। এ সময় বাবাকে কুপিয়ে জখম…
১৮তম বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস পরীক্ষায় গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের পাঁচ শিক্ষার্থী সিভিল…
সৌদি আরবের পবিত্র নগরী মক্কাসহ দেশটির বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় সম্ভাব্য বিপদ বা ঝুঁকির বিষয়ে…
This website uses cookies.