বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতি বর্তমানে এক গভীর পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী মার্কিন ডলার ও পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানের আধিপত্য এখন ভূরাজনৈতিক সংঘাত, বাণিজ্যযুদ্ধ ও নিষেধাজ্ঞার কারণে চ্যালেঞ্জের মুখে। এই পটভূমিতে ব্রিকস জোটের 'নয়াদিল্লি ঘোষণা' বিশ্ব অর্থনীতির ক্ষমতার ভারসাম্যে বিকল্প চিন্তার উত্থানকে নির্দেশ করছে।
ঘোষণাটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সদস্য দেশগুলোর পারস্পরিক বাণিজ্যে স্থানীয় মুদ্রার ব্যবহার বৃদ্ধির অঙ্গীকার। এটি সরাসরি ডলারবিরোধী কোনো অবস্থান না হলেও, বৈশ্বিক অর্থনীতিতে দীর্ঘদিনের ডলার-নির্ভর কাঠামোর বিকল্প গড়ে তোলার প্রচেষ্টা নিঃসন্দেহে। ভারত নিজেই স্পষ্ট করেছে যে, তাদের লক্ষ্য ডলারকে প্রত্যাখ্যান করা নয়; বরং আন্তর্জাতিক লেনদেনের জন্য আরও বৈচিত্র্যময় ও স্থিতিশীল ব্যবস্থা তৈরি করা। বাস্তবতা হলো, আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে কোনো একক মুদ্রার অতিরিক্ত আধিপত্য উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য ঝুঁকি তৈরি করে। ফলে স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য বৃদ্ধি একটি অর্থনৈতিক নিরাপত্তা কৌশল হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।
বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য এই পরিবর্তন অত্যন্ত গুরুত্ববহ। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ, ডলারের মূল্য বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতার কারণে গত কয়েক বছরে বাংলাদেশকে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে। যদি আঞ্চলিক অংশীদারদের সঙ্গে নিজস্ব বা পারস্পরিক মুদ্রাভিত্তিক লেনদেনের সুযোগ সম্প্রসারিত হয়, তাহলে ডলারের চাহিদা কিছুটা কমতে পারে এবং বৈদেশিক বাণিজ্য আরও নমনীয় হতে পারে। তবে এর জন্য শক্তিশালী আর্থিক অবকাঠামো, মুদ্রার স্থিতিশীলতা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর মধ্যে উচ্চমাত্রার সমন্বয় অপরিহার্য।
নয়াদিল্লি ঘোষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ এবং অন্যান্য বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানের সংস্কারের দাবি। বর্তমান বিশ্বে অর্থনৈতিক ও জনসংখ্যাগত শক্তির বড় অংশ এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকায় অবস্থান করলেও আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রগুলো এখনও অনেকাংশে পুরোনো ক্ষমতার কাঠামোর অধীন। ব্রিকস এই বৈষম্যের অবসান চায়। উন্নয়নশীল বিশ্বের প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধির দাবি শুধু রাজনৈতিক নয়, এটি বৈশ্বিক ন্যায়বিচার ও অংশীদারিত্বের প্রশ্নও। দক্ষিণ এশিয়ার জন্য এই বিতর্ক বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। ভারত বৈশ্বিক শক্তি হিসেবে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করতে চায়, অন্যদিকে বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, নেপাল ও মালদ্বীপের মতো দেশগুলোও একটি বেশি অন্তর্ভুক্তিমূলক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার পক্ষে। কারণ বৈশ্বিক সিদ্ধান্তের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর, অথচ সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের ভূমিকা তুলনামূলকভাবে সীমিত।
ঘোষণায় একতরফা শুল্ক ও বাণিজ্য-নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতাও বর্তমান আন্তর্জাতিক অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা তুলে ধরেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ক্রমেই অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতায় রূপ নিয়েছে। শুল্ক, নিষেধাজ্ঞা এবং প্রযুক্তিগত বিধিনিষেধকে অনেক দেশ এখন কৌশলগত অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। এর ফলে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতির দেশ হিসেবে বাংলাদেশও এই পরিস্থিতি থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। বিশ্ববাজারে নিয়মভিত্তিক, উন্মুক্ত এবং পূর্বানুমানযোগ্য বাণিজ্যব্যবস্থা বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। একই সঙ্গে ব্রিকসের সন্ত্রাসবাদবিরোধী অবস্থান এবং আন্তর্জাতিক নৌপথের নিরাপত্তার ওপর জোর দেওয়াও দক্ষিণ এশীয় বাস্তবতায় গুরুত্বপূর্ণ। বঙ্গোপসাগর, ভারত মহাসাগর এবং মধ্যপ্রাচ্যের বাণিজ্যপথ বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব অঞ্চলে অস্থিরতা বৃদ্ধি পেলে জ্বালানি আমদানি, রপ্তানি বাণিজ্য ও বৈদেশিক বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ফলে আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা এখন শুধু নিরাপত্তা নয়, অর্থনৈতিক উন্নয়নেরও পূর্বশর্ত।
তবে ব্রিকসের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য। রাশিয়া, চীন, ভারত, ব্রাজিল ও অন্যান্য সদস্য দেশের কৌশলগত অগ্রাধিকার সবসময় এক নয়। বিশেষ করে ডলার নির্ভরতা কমানোর প্রশ্নে সদস্যদের অবস্থানের মধ্যে সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে। ফলে ঘোষণাপত্রে যে রাজনৈতিক ঐকমত্য দেখা গেছে, বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তা কতটা কার্যকর হবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়। তবুও নয়াদিল্লি ঘোষণা বিশ্ব ব্যবস্থার পরিবর্তনশীল চরিত্রের একটি সুস্পষ্ট বার্তা বহন করে। এটি এমন এক বিশ্বের ইঙ্গিত দেয়, যেখানে ক্ষমতা, বাণিজ্য এবং কূটনৈতিক প্রভাব ক্রমশ বহুমাত্রিক হয়ে উঠছে। বাংলাদেশের মতো মধ্যম আয়ের পথে অগ্রসর দেশগুলোর জন্য এই পরিবর্তন একদিকে সুযোগ, অন্যদিকে চ্যালেঞ্জ। বিচক্ষণ কূটনীতি, অর্থনৈতিক বহুমুখীকরণ এবং আঞ্চলিক অংশীদারিত্ব জোরদারের মাধ্যমে বাংলাদেশ যদি নতুন বাস্তবতাকে কাজে লাগাতে পারে, তাহলে উদীয়মান বৈশ্বিক ব্যবস্থায় তার অবস্থান আরও শক্তিশালী হতে পারে। বিশ্ব এখন আর একক কেন্দ্রের চারপাশে ঘুরছে না; বরং বহু কেন্দ্র, বহু অংশীদার এবং বহু বিকল্পের নতুন এক অধ্যায়ে প্রবেশ করছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্য এ পরিবর্তনকে বুঝতে পারা এবং সময়োপযোগী কৌশল গ্রহণ করাই হবে আগামী দিনের সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরীক্ষা।
নোয়াখালীর সোনাইমুড়ীতে সংবাদ প্রকাশের জেরে দুই সাংবাদিকের ওপর হামলার ঘটনায় মামলা না নেওয়া এবং সিসিটিভি…
মানবজমিন পত্রিকায় রিপোর্টার পদে প্রাথমিকভাবে মনোনীতদের লিখিত পরীক্ষা আগামী ২৯ সেপ্টেম্বর, মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত হবে।
জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়ানোর সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে বরিশালে বিক্ষোভ সমাবেশ ও মিছিল করেছে…
ফরিদপুরের ভাঙ্গা টোলপ্লাজায় একটি যাত্রীবাহী গাড়িতে অভিযান চালিয়ে ১২০ বোতল নেশাজাতীয় সিরাপ জব্দ করেছে র্যাব-১০।…
মৌলভীবাজারের জুড়ী সীমান্তে বিশেষ অভিযান চালিয়ে ৩৮ বোতল ভারতীয় মদ জব্দ করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ…
বাংলাদেশে নতুন তিনটি আইনের মাধ্যমে মানবাধিকার সুরক্ষাকে সংকুচিত করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে হিউম্যান রাইটস…
This website uses cookies.