Header Premium (728×90)

ইয়েমেনে হুতিদের ঝোড়ো অগ্রযাত্রা, ঝুঁকিতে বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্য

ইয়েমেনের কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ লোহিত সাগর উপকূলের প্রায় ১৩০ কিলোমিটার এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে ইরান সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা। শুষ্ক উপকূলীয় সমভূমি তিহামাহর দক্ষিণাঞ্চলজুড়ে হুতিদের এই ঝড়ের গতির অগ্রযাত্রা আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের বিস্মিত করেছে। মাত্র কয়েক দিন আগেও এই অঞ্চলের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করত ইরানবিরোধী জোট ‘ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স’। তবে সাম্প্রতিক এই সামরিক সাফল্যের মধ্য দিয়ে হুতিরা প্রমাণ করেছে যে, ১২ বছরের গৃহযুদ্ধ, সৌদি আরবের বিমান হামলা এবং মার্কিন-যুক্তরাজ্য-ইসরায়েলি হামলা সত্ত্বেও তারা এখনো এক অপরাজেয় শক্তি হিসেবে টিকে আছে।

ব্রাসেলসভিত্তিক ইউরোপিয়ান ইনস্টিটিউট অব পিসের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক হিশাম আল-ওমেইসি বিবিসিকে বলেন, হুতিরা এখন সেখানে পৌঁছে গেছে এবং তারা সেখানে নিজেদের শক্ত অবস্থান গড়ে তুলবে। তাদের সেখান থেকে সরানো এখন অনেক বেশি ব্যয়বহুল হবে। বিশ্লেষকদের মতে, লেবাননের হিজবুল্লাহ, গাজার হামাস এবং সিরিয়ার বাশার আল-আসাদের শাসনব্যবস্থা সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক ধাক্কা ও পরাজয়ের মুখে পড়ায় হুতিদের প্রতি ইরানের সমর্থন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আল-ওমেইসি উল্লেখ করেন, ইরান এখন তাদের সমর্থন হুতিদের দিকে সরিয়ে দিয়েছে এবং হুতিদেরও এই মুহূর্তে সেই সমর্থন প্রয়োজন। তবে হুতিদের কেবল ইরানের ‘পুতুল’ হিসেবে বর্ণনা করাকে ভুল মনে করেন অধিকাংশ বিশ্লেষক।

এই ঘটনাপ্রবাহের ফলে একটি অস্বস্তিকর নতুন বাস্তবতা সামনে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের যৌথ হামলা শুরুর সাত মাস পর এখন তেহরানের কর্তৃত্ব বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ দুটি সামুদ্রিক পথের ওপর প্রভাব বিস্তার করছে—যার একটি পারস্য উপসাগরের প্রবেশমুখে হরমুজ প্রণালি এবং অন্যটি লোহিত সাগরের প্রবেশদ্বার বাব আল-মান্দাব। লন্ডনের থিঙ্কট্যাংক চ্যাথাম হাউসের গবেষক ফারিয়া আল-মুসলিমি বলেন, ইরান এখন সরাসরি এবং প্রক্সিদের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্য তথা বিশ্বের দুটি গুরুত্বপূর্ণ সংকটপথ নিয়ন্ত্রণ করছে। এর মাধ্যমে বৈশ্বিক জ্বালানি ও তেল বাণিজ্যের ৩৫ শতাংশের বেশি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব, যা পারমাণবিক বোমার মতোই শক্তিশালী এক চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার। হুতিরা যদি বাব আল-মান্দাবের সবচেয়ে সরু অংশের মাঝখানে অবস্থিত পেরিম দ্বীপসহ লোহিত সাগরের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপও নিয়ন্ত্রণে নিয়ে থাকে, তবে আন্তর্জাতিক নৌযান চলাচলে হস্তক্ষেপের সক্ষমতা তাদের অনেক বেড়ে যাবে।

গাজায় ইসরাইলের যুদ্ধের পর হুতিদের কর্মকাণ্ড লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি স্পষ্ট করে তুলেছে। ইয়েমেনবিষয়ক বিশেষজ্ঞ আইওনা ক্রেইগ বিবিসির এক রেডিও অনুষ্ঠানে বলেন, ভূখণ্ড দখল না করেও তারা বাব আল-মান্দাব দিয়ে এবং সুয়েজের দিকে কী ঢুকছে ও বের হচ্ছে, তা নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছিল। এখন তারা বাব আল-মান্দাবের ঠিক পাশের এলাকা নিয়ন্ত্রণ করায় তাদের প্রভাব বিস্তারের ক্ষমতা অনেক বেড়েছে। অবশ্য শুক্রবার বিকেলে হুতিদের সামরিক বাহিনী এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, সমুদ্রপথে চলাচল সব কোম্পানির জন্য ‘নিরাপদ’ থাকবে, তবে সৌদি আরবের জাহাজ এর আওতামুক্ত থাকবে। কারণ এসব জাহাজের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে অবরোধ আরোপ করা হয়েছে। তবে জাহাজ চলাচলকারী কোম্পানিগুলো হুতিদের এই বক্তব্যের সত্যতা নিয়ে সন্দিহান। কারণ অতীতে হুতিরা শুধু ইসরাইল-সংশ্লিষ্ট জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করার দাবি করলেও বাস্তবে নরওয়ের পতাকাবেহী তেলবাহী জাহাজসহ বেশ কিছু অসংশ্লিষ্ট জাহাজে হামলা চালানো হয়েছিল।

আইওনা ক্রেইগের মতে, হুতিরা নির্বিচারে হামলা থেকে বিরত থাকতে পারে। কারণ তারা ২০২৫ সালের বসন্তে যুক্তরাষ্ট্রের ‘অপারেশন রাফ রাইডার’-এর পুনরাবৃত্তি চায় না, যে অভিযানে ছয় সপ্তাহ ধরে হুতিদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের মার্কিন বিমান ও নৌ হামলা চালানো হয়েছিল। তবে প্রশ্ন হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র আদৌ নতুন করে এই সংঘাতের ফ্রন্টে জড়াতে চাইবে কি না। প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ এমনিতেই জনপ্রিয় নয়, তার ওপর তেলের দাম আবার বাড়তে শুরু করেছে। ফলে ইয়েমেনে নতুন একটি যুদ্ধক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের প্রবেশ ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কিংবা নভেম্বরে মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির সম্ভাবনা বাড়াবে এমনটা মনে করার কারণ কম। অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান যুক্তরাষ্ট্রকে হস্তক্ষেপের আহ্বান জানালেও ওয়াশিংটন সরাসরি সামরিকভাবে জড়িয়ে পড়া এড়িয়ে চলতে চাইছে, যদিও তারা সৌদির প্রতি সমর্থন বাড়ানোর চেষ্টা করছে।

সৌদি আরবের উদ্বেগ শুধু বাব আল-মান্দাবের সম্ভাব্য হুমকি নিয়ে নয়। উপগ্রহচিত্রে সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইনে হুতি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার সম্ভাব্য প্রমাণ পাওয়া গেছে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর চলতি বছরের শুরুতে তেল রপ্তানির বিকল্প গুরুত্বপূর্ণ পথ হিসেবে এই পাইপলাইনটি ব্যবহার করা হচ্ছিল। এতে ধারণা করা হচ্ছে, ইরানের ইয়েমেনি মিত্ররা ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের যুদ্ধ থেকে তৈরি অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়ানোর চেষ্টা করছে।

লন্ডনভিত্তিক রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের গবেষক ও বিশ্লেষক বারায়া শাইবান বলেন, ২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতির পর ইয়েমেনে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে ভয়াবহ লড়াইয়ের সূত্রপাত জুলাইয়ে। ওই সময় হুতিদের একটি প্রতিনিধি দল ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির রাষ্ট্রীয় শেষকৃত্যে অংশ নিয়ে দেশে ফিরে আসার পরপরই উত্তেজনা বাড়তে শুরু করে। স্পষ্ট মনে হচ্ছিল, ইরান এখন লোহিত সাগরে আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। বর্তমানে ইয়েমেন আবার পূর্ণমাত্রার যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে আরও কঠিন করে তুলবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Manab Zamin

Recent Posts

অস্ট্রেলিয়ার স্বাস্থ্য পোর্টালে এআই এজেন্টের অননুমোদিত প্রবেশ, তীব্র উদ্বেগ

গত জুনে ওপেনএআইয়ের একটি এআই এজেন্ট অস্ট্রেলিয়ার সরকারি একটি স্বাস্থ্য ডেটা পোর্টালে অননুমোদিতভাবে প্রবেশ করে…

27 minutes ago

২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে ৮ মৃত্যু, হাসপাতালে ১৭৮২ নতুন রোগী

গত ২৪ ঘণ্টায় সারাদেশে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে আটজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে দেশের বিভিন্ন…

33 minutes ago

এশিয়ান গেমসের সেমিফাইনালে বাংলাদেশের দ্রুততম মানব ইমরানুর

এশিয়ান গেমসে পুরুষদের ১০০ মিটার স্প্রিন্টের সেমিফাইনালে জায়গা করে নিয়েছেন বাংলাদেশের দ্রুততম মানব ইমরানুর রহমান।…

54 minutes ago

ক্রিকেটার রবিন দাসের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ, আদালতে হাজিরা ৯ অক্টোবর

বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ইংলিশ ক্রিকেটার রবিন দাসের বিরুদ্ধে ধর্ষণের দুটি অভিযোগ আনা হয়েছে। আগামী ৯ অক্টোবর…

2 hours ago

বিকাশ, রবিসহ ৪ ডিজিটাল ব্যাংককে প্রাথমিক অনুমোদন দিল বাংলাদেশ ব্যাংক

দেশের চারটি ডিজিটাল ব্যাংক স্থাপনের প্রাথমিক অনুমতি দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ। এর মধ্যে রয়েছে…

2 hours ago

শাহ আলীতে পলিথিন ব্যাগ থেকে নবজাতক উদ্ধার, ৯৯৯-এ ফোন

রাজধানীর শাহ আলী থানার ডি ব্লকের ৮ নম্বর সড়কের পাশে একটি কালো পলিথিনের ব্যাগ থেকে…

2 hours ago

This website uses cookies.