Header Premium (728×90)

জোয়ার-ভাটার দেশে মানুষ, ইতিহাস ও প্রকৃতি: অমিতাভ ঘোষের উপন্যাসে সুন্দরবন

সুন্দরবনের নদী কখনো শুধু নদী নয়। তার সঙ্গে মিশে থাকে মাটি, লবণ, কাদা, মাছ, বাঘ, মানুষের ঘাম এবং বহু পুরোনো ভয়। জোয়ার এলে নদী তার সীমানা ভুলে যায়। কোথায় ছিল ঘর, কোথায় ছিল উঠান, কোথায় মানুষের হাঁটার পথ—সবকিছু ধীরে ধীরে জলের নিচে চলে যায়। আবার ভাটা এলে অন্য এক ভূখণ্ড দেখা দেয়। মনে হয়, এই মাটি যেন প্রতিদিন নিজের শরীর বদলায়।

অমিতাভ ঘোষের ‘দ্য হাংরি টাইড’ সেই বদলে যাওয়া ভূখণ্ডের গল্প। তবে এটি শুধু সুন্দরবনের প্রকৃতির গল্প নয়। এর ভেতরে আছে মানুষের ইতিহাস, উদ্বাস্তুদের স্মৃতি, প্রেম, ক্ষুধা, মৃত্যু এবং প্রকৃতিকে বাঁচানোর নামে মানুষের জীবনকে বিসর্জন দেওয়ার এক গভীর প্রশ্ন।

পিয়ালি রয় একজন সমুদ্রজীববিজ্ঞানী। ইরাবতী ডলফিনের সন্ধানে সে সুন্দরবনে আসে। তার চোখে এই ভূখণ্ড প্রথমে গবেষণার জায়গা—একটি জটিল পরিবেশ, যেখানে বিরল প্রাণীদের জীবন বোঝা দরকার। কিন্তু খুব দ্রুত সে বুঝতে পারে, কোনো ভূখণ্ডকে শুধু মানচিত্র বা বৈজ্ঞানিক তথ্য দিয়ে বোঝা যায় না। একটি নদীকে বুঝতে হলে তার পাশে বসবাসকারী মানুষের জীবনকেও বুঝতে হয়।

কানাই দত্তের সঙ্গে তার দেখা হয়। কানাই ভাষার মানুষ, অনুবাদ তার কাজ। কিন্তু উপন্যাসে ভাষা কখনো সম্পূর্ণ সেতু হয়ে উঠতে পারে না। একজন যা বলে, অন্যজন তার শব্দের অর্থ বুঝতে পারে; কিন্তু সেই শব্দের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা স্মৃতি, ভয় বা অভিজ্ঞতা সবসময় বোঝা সম্ভব হয় না।

ফকির খুব বেশি কথা বলে না। তার জীবন নদীর সঙ্গে যুক্ত। নৌকা চালানো, মাছ ধরা, জোয়ারের গতিপথ বোঝা—এসব তার কাছে কোনো আলাদা জ্ঞান নয়। তার জীবনই এই জ্ঞান। পিয়ালির কাছে যে নদী গবেষণার বিষয়, ফকিরের কাছে সেটিই ঘর, পথ এবং বিপদ। একটি দুর্ঘটনার পর পিয়ালির জীবন তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। তাদের মধ্যে যে সম্পর্ক তৈরি হয়, তার কোনো সহজ নাম নেই। ভাষা দিয়ে তাকে পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা যায় না। মানুষের সবচেয়ে গভীর সম্পর্কগুলোর কিছু হয়তো এমনই—তারা কথার আগে জন্ম নেয়।

কিন্তু ব্যক্তিগত সম্পর্কের ভেতর দিয়েই ইতিহাস ঢুকে পড়ে। মারিচঝাঁপির স্মৃতি সুন্দরবনের জলের নিচে চাপা পড়ে থাকা কোনো পুরোনো গ্রামের মতো। ১৯৭৯ সালে উদ্বাস্তুদের উচ্ছেদ এবং তাদের ওপর চালানো সহিংসতার ঘটনা দেখিয়ে ঘোষ আমাদের মনে করিয়ে দেন, ইতিহাস কখনো সত্যিই অতীত হয় না। মানুষ চলে যায়, বসতি হারায়, কিন্তু সেই ঘটনার স্মৃতি থেকে যায়। কোনো কোনো স্মৃতি নদীর মতো—তার ওপর যতই নতুন জল বয়ে যাক, পুরোনো স্রোত কোথাও থেকে যায়।

উপন্যাসের এই অংশে এসে সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটি আসে প্রকৃতি নিয়ে। বনকে রক্ষা করতে হবে, বাঘকে রক্ষা করতে হবে, ডলফিনকে রক্ষা করতে হবে। কিন্তু যে মানুষটি সেই বনের পাশে বাস করে, তার কী হবে? পিয়ালি যখন গ্রামের মানুষকে একটি বাঘ হত্যা করতে দেখে, তার কাছে ঘটনাটি নিষ্ঠুর মনে হয়। বাঘ তার কাছে একটি বিপন্ন প্রাণী। কিন্তু গ্রামের মানুষের কাছে বাঘের অর্থ অন্যরকম। বাঘ তাদের ভয় দেখায়। কখনো তাদের স্বামী, বাবা কিংবা সন্তানকে নিয়ে যায়। একই প্রাণী তাই একজনের কাছে রক্ষার প্রতীক, আরেকজনের কাছে মৃত্যুর সম্ভাবনা। এখানেই পিয়ালির পরিবর্তন শুরু হয়।

সে বুঝতে পারে, প্রকৃতি সংরক্ষণকে মানুষের জীবন থেকে আলাদা করে দেখা যায় না। ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে নদী শুধু সুন্দর নয়; নদী খাবারের উৎস। বন শুধু সবুজ নয়; বন জীবিকার জায়গা। আবার সেই নদী ও বনই কখনো তাদের জীবন কেড়ে নেয়। সুন্দরবনের মানুষের কাছে প্রকৃতি তাই একই সঙ্গে আশ্রয় এবং হুমকি। এই ভয়কে ঘোষ কুসংস্কার বলে সরিয়ে দেন না। কারণ মানুষের ভয়ও তার ইতিহাসের অংশ। যে মানুষ বহুবার নদীর হাতে ঘর হারিয়েছে, তার কাছে নদীকে শুধু বৈজ্ঞানিকভাবে ব্যাখ্যা করলে তার অভিজ্ঞতা ব্যাখ্যা করা হয় না।

সুন্দরবনের মানুষ জানে, মাটি স্থায়ী নয়। একসময় যেখানে নদী ছিল না, সেখানে নদী আসে। যেখানে গ্রাম ছিল, সেখানে জল জমে। আবার কোথাও নতুন চর ওঠে। একটি শিশুকে তার দাদি যে গল্প শোনান, তার মধ্যেও এই বদলে যাওয়া ভূগোল থাকে। সুন্দরবনে পারিবারিক স্মৃতি আর ভূগোল আলাদা নয়। দুটোই একে অপরের মধ্যে মিশে থাকে। জলবায়ু পরিবর্তন সেই পরিবর্তনকে আরও তীব্র করে তুলেছে। সমুদ্রের জল বাড়ছে, নদীর স্বভাব বদলাচ্ছে, ঘূর্ণিঝড় আরও ভয়ংকর হয়ে উঠছে।

কিন্তু ঘোষ প্রকৃতিকে কোনো প্রতিশোধপরায়ণ শক্তি হিসেবে দেখেন না। বরং মানুষের কর্মকাণ্ড কীভাবে সেই ভঙ্গুর ভারসাম্যকে বদলে দিয়েছে, সেদিকেই আমাদের তাকাতে বাধ্য করেন। ঘূর্ণিঝড়ের সময় এই সত্য সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বহু বছরের বসতি, ঘর, গাছ, স্মৃতি—সবকিছু জলের সঙ্গে ভেসে যায়। মানুষের তৈরি পৃথিবী কতটা অস্থায়ী, তখন তা বোঝা যায়।

ফকিরের মৃত্যু এই অস্থায়িত্বকে ব্যক্তিগত করে তোলে। অন্য একজনকে বাঁচাতে গিয়ে সে নিজের জীবন হারায়। পিয়ালি বেঁচে থাকে, কিন্তু তার বেঁচে থাকা আর আগের মতো থাকে না। একজন মানুষের মৃত্যু আরেকজন মানুষের জীবনের অর্থ বদলে দিতে পারে। শোক তখন শুধু কান্না নয়; কখনো তা হয়ে ওঠে কাজ করার কারণ। ফকিরের স্মৃতিকে সঙ্গে নিয়ে পিয়ালি স্থানীয় জেলেদের জীবন ও পরিবেশ সংরক্ষণের মধ্যে একটি নতুন সম্পর্ক তৈরি করার চেষ্টা করে।

যেন সে বুঝতে পারে, প্রকৃতিকে রক্ষা করার সবচেয়ে মানবিক পথ হলো প্রকৃতির পাশে থাকা মানুষদেরও রক্ষা করা। এখানে এসে উপন্যাসের নামটি নতুন অর্থ পায়—‘দ্য হাংরি টাইড’। জোয়ার ক্ষুধার্ত।

মানুষও ক্ষুধার্ত। মানুষ জমি চায়, খাবার চায়, নিরাপত্তা চায়। নদী তার জমি চায়। বন তার জায়গা ধরে রাখতে চায়। বাঘ তার শিকার চায়। সবাই যেন বেঁচে থাকার জন্য অন্য কিছুর দিকে হাত বাড়ায়। এই পৃথিবীতে কেউ পুরোপুরি নির্দোষ নয়। আবার কেউ পুরোপুরি অপরাধীও নয়। মানুষ প্রকৃতিকে ধ্বংস করে। প্রকৃতি আবার মানুষের তৈরি ঘর ভেঙে দেয়।

মানুষ বাঘকে হত্যা করে। বাঘও মানুষকে হত্যা করে। রাষ্ট্র সংরক্ষণের নামে মানুষকে উচ্ছেদ করে। আর মানুষ, বেঁচে থাকার জন্য, সেই সংরক্ষিত বনেই ঢুকে পড়ে। এই পরস্পরবিরোধী সত্যগুলোকে একসঙ্গে ধরে রাখাই অমিতাভ ঘোষের উপন্যাসটির বড় শক্তি।

শেষ পর্যন্ত ‘দ্য হাংরি টাইড’ আমাদের সুন্দরবন সম্পর্কে শুধু নতুন কিছু জানায় না; মানুষ সম্পর্কে আমাদের ধারণাকেও বদলে দেয়। মানুষ এখানে প্রকৃতির বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা কোনো পর্যবেক্ষক নয়। সে প্রকৃতিরই অংশ—তার ক্ষুধা আছে, ভয় আছে, স্মৃতি আছে, ভালোবাসা আছে। জোয়ার যখন আসে, সে মানুষ ও প্রকৃতির মধ্যে আঁকা সব সীমারেখা মুছে দেয়। আর সেই জলের নিচে থাকে মানুষের ঘর, মৃত মানুষের স্মৃতি, হারিয়ে যাওয়া গ্রামের চিহ্ন, বাঘের পায়ের ছাপ এবং এমন এক ইতিহাস, যা প্লাবিত হয় কিন্তু ভেসে যায় না।

সুন্দরবনের মতোই ‘দ্য হাংরি টাইড’ তাই আমাদের মনে করিয়ে দেয়—কোনো পৃথিবীই স্থির নয়। মানুষ ভাবে সে একটি জায়গায় বাস করে। আসলে জায়গাটিও তার মধ্যে বাস করে। নদী বদলায়, মাটি বদলায়, মানুষ চলে যায়; কিন্তু তাদের সম্পর্কের গল্প থেকে যায়। জোয়ারের পর ভাটার মতো, আবার ভাটার পর জোয়ারের মতো। হার্পার পেরেনিয়াল থেকে প্রকাশিত ৩৫২ পৃষ্ঠার এই বইটির দাম ১৭.৩৩ ডলার।

লেখক অমিতাভ ঘোষ সমকালীন ভারতীয় সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ ইংরেজি ভাষার লেখক। ১৯৫৬ সালে কলকাতায় জন্ম নেওয়া ঘোষ শৈশব কাটিয়েছেন ভারত, বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কায়। দিল্লি, অক্সফোর্ড ও আলেকজান্দ্রিয়ায় পড়াশোনা শেষে তিনি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সামাজিক নৃবিজ্ঞানে পিএইচডি অর্জন করেন। অমিতাভ ঘোষের প্রথম উপন্যাস দ্য সার্কেল অব রিজন প্রকাশিত হয় ১৯৮৬ সালে। এরপর ‘দ্য শ্যাডো লাইনস’, ‘দ্য গ্লাস প্যালেস’, ‘দ্য হাংরি টাইড’ এবং ‘দ্য ইবিস ট্রিলজি’ তাকে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত করে।

ইতিহাস, উপনিবেশবাদ, অভিবাসন, নদী-সমুদ্র ও জলবায়ু পরিবর্তন তার লেখার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ‘দ্য গ্রেট ডিরেঞ্জমেন্ট’ বইয়ে তিনি জলবায়ু সংকটের মানবিক ও সাহিত্যিক দিক নিয়ে গভীরভাবে লিখেছেন। ২০১৮ সালে তিনি ভারতের সর্বোচ্চ সাহিত্য সম্মান জ্ঞানপীঠ পুরস্কার পাওয়া প্রথম ইংরেজি ভাষার লেখক। ২০২৪ সালে পান এরাসমাস পুরস্কার এবং ২০২৬ সালে গুগেনহাইম ফেলোশিপ পান।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Adin

Recent Posts

২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে ৮ মৃত্যু, হাসপাতালে ১৭৮২ নতুন রোগী

গত ২৪ ঘণ্টায় সারাদেশে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে আটজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে দেশের বিভিন্ন…

1 minute ago

এশিয়ান গেমসের সেমিফাইনালে বাংলাদেশের দ্রুততম মানব ইমরানুর

এশিয়ান গেমসে পুরুষদের ১০০ মিটার স্প্রিন্টের সেমিফাইনালে জায়গা করে নিয়েছেন বাংলাদেশের দ্রুততম মানব ইমরানুর রহমান।…

23 minutes ago

ক্রিকেটার রবিন দাসের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ, আদালতে হাজিরা ৯ অক্টোবর

বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ইংলিশ ক্রিকেটার রবিন দাসের বিরুদ্ধে ধর্ষণের দুটি অভিযোগ আনা হয়েছে। আগামী ৯ অক্টোবর…

1 hour ago

বিকাশ, রবিসহ ৪ ডিজিটাল ব্যাংককে প্রাথমিক অনুমোদন দিল বাংলাদেশ ব্যাংক

দেশের চারটি ডিজিটাল ব্যাংক স্থাপনের প্রাথমিক অনুমতি দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ। এর মধ্যে রয়েছে…

1 hour ago

শাহ আলীতে পলিথিন ব্যাগ থেকে নবজাতক উদ্ধার, ৯৯৯-এ ফোন

রাজধানীর শাহ আলী থানার ডি ব্লকের ৮ নম্বর সড়কের পাশে একটি কালো পলিথিনের ব্যাগ থেকে…

2 hours ago

সৌদি আরবের বিভিন্ন এলাকায় সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কায় উচ্চ সতর্কতা

সৌদি আরবের মক্কা নগরীসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে সম্ভাব্য ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন হামলার আশঙ্কায় উচ্চ সতর্কতা…

2 hours ago

This website uses cookies.