
বাংলাদেশে বর্তমানে কবি হওয়ার পথটি কবিতার গুণমান দিয়ে তৈরি হচ্ছে না, বরং এটি ক্ষমতা, পদ-পদবি ও পরিচিতির সিঁড়ি বেয়ে অর্জিত হচ্ছে। এক সময় কবি হওয়ার জন্য বছরের পর বছর সাধনা, পাঠকের প্রত্যাখ্যান সহ্য করা এবং সাহিত্যিক সমাজের কঠিন পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হতো। কিন্তু বর্তমান দৃশ্যপট ভিন্ন। এখন এমপি বা মন্ত্রী হলেই কবিতা পাঠের মঞ্চ দরকার হয় এবং ক্ষমতার কেন্দ্রে থেকে কবি-সাহিত্যিকদের জড়ো করে নিজের সাহিত্যিক পরিচয় প্রতিষ্ঠার আয়োজন শুরু হয়।
ক্ষমতার সঙ্গে কবিত্বের এই সম্পর্ক নতুন নয়। এরশাদ আমলে রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা অবস্থায় নিজেকে কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা দেখা গিয়েছিল, যেখানে রাষ্ট্রীয় প্রচারযন্ত্রও সেই পরিচয়কে সামনে এনেছিল। তৎকালীন কবি মোহাম্মদ রফিকের ‘খোলা কবিতা’ সেই সময়ের শাসকের কবি হয়ে ওঠার আকাঙ্ক্ষাকে তীব্র ব্যঙ্গের ভাষায় আঘাত করেছিল। আজ সেই পুরোনো দৃশ্য নতুন সাজে ফিরে আসছে। বিশেষ করে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন মন্ত্রী ও এমপির মধ্যে হঠাৎ কবি হওয়ার প্রবল আগ্রহ দেখা যাচ্ছে।
রাজনীতিবিদদের কবিতা লেখার অধিকার নিয়ে কারো আপত্তি নেই, কিন্তু সমস্যা শুরু হয় যখন রাষ্ট্রক্ষমতা, রাজনৈতিক প্রভাব ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করে সেই পরিচয় প্রতিষ্ঠা করা হয়। বিস্ময়কর বিষয় হলো, তারা এখন এমন কবিদের কাছে স্বীকৃতি খুঁজছেন যারা অতীতে তাদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ছিলেন বা আওয়ামী লীগ-সমর্থক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। নিজের কবি পরিচয়ের বৈধতা পেতে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে সাহিত্যিক অভিভাবক হিসেবে বেছে নেওয়ার এই প্রতিযোগিতা রাজনীতির অদ্ভুত হিসাব-নিকাশকেই সামনে আনে।
যখন একজন মন্ত্রী রাষ্ট্রের অধীন সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের মঞ্চ ব্যবহার করে কবিতা পাঠের মহা আয়োজন করেন, তখন সেখানে স্বার্থের সংঘাত বা ‘Conflict of Interest’-এর প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় ও প্রশাসনিক প্রভাবে আয়োজিত এসব অনুষ্ঠান নিছক সাহিত্যিক চর্চা থাকে না, বরং তা ব্যক্তিগত সাহিত্যিক ব্র্যান্ডিংয়ের ঝুঁকি তৈরি করে। কবিতা ক্ষমতার অলংকার হওয়ার কথা নয়; বরং কবিতা ক্ষমতাকে প্রশ্ন করবে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে। অথচ আমাদের দেশে এমন এক সাংস্কৃতিক দরবার তৈরি হয়েছে যেখানে ক্ষমতাবানরা কবিদের কাছে স্বীকৃতি চান, আর কবিরাও সুযোগ-সুবিধার আশায় সেই স্বীকৃতির মালা পরিয়ে দেন।
শেষ পর্যন্ত পাঠক যদি কবিতায় কবিতা খুঁজে না পান, তবে শত বই প্রকাশ বা জন্মদিনে সংবর্ধনা আয়োজন করেও কবি হওয়া যায় না। কবি হওয়া কোনো সরকারি পদ বা রাজনৈতিক দলের মনোনয়ন নয়। তাই প্রশ্ন থেকেই যায়, ব্যক্তি সত্যিই কবি হতে চাইছেন, নাকি কেবল কবি হিসেবে পরিচিত হতে চাইছেন?
সম্পাদক ও প্রকাশক: মাহের আহমেদ, প্রধান সম্পাদক: মোঃ মোত্তালিব সরকার। প্রকাশক কর্তৃক ৫৫০বি, হজ্জ ক্যাম্প রোড, আশকোনা, দক্ষিণখান, ঢাকা-১২৩০, বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত। সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় (ঢাকা) : ৫৫০বি, হজ্জ ক্যাম্প রোড, আশকোনা, দক্ষিণখান, ঢাকা-১২৩০, বাংলাদেশ। আঞ্চলিক কার্যালয় (বগুড়া): টোলারগেট, শেরপুর–৫৮৪০, শেরপুর, বগুড়া। অফিস: ০১৭৭৬-১৩৬০৫০ (হোয়াটসঅ্যাপ), বিজ্ঞাপন: ০৯৬৯৭-৫৪৪৮২৭। ই-মেইল: dailyjokhonsomoy@gmail.com।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রনালয়ের বিধি মোতাবেক নিবন্ধনের জন্য আবেদিত ©সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © দৈনিক যখন সময় ২০২২