
স্পেনের বুর্গোস শহরের বুক চিরে হেঁটে গেলে হয়তো প্রথম দেখায় বোঝার উপায় নেই যে, সেখানকার একটি পুরোনো বইয়ের দোকানের ভেতর লুকিয়ে আছে দেশটির শিক্ষার ইতিহাসের এক বিশাল অধ্যায়। ১৮৫০ সালে সান্তিয়াগো রদ্রিগেস আলোনসো নামের এক স্বশিক্ষিত মানুষ এই বুর্গোস শহরেই গড়ে তুলেছিলেন ‘হিজোস দে সান্তিয়াগো রদ্রিগেজ’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। শুধু বই বিক্রি নয়, একই ছাদের নিচে ছাপাখানা ও প্রকাশনার মেলবন্ধন ঘটিয়েছিল এই দোকান। দীর্ঘ ১৭৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে স্পেনের সাধারণ মানুষের জ্ঞান অর্জনের সঙ্গী হওয়া এই ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠানটি ২০২৬ সালে এসে এক গুরুতর আর্থিক সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। ঋণ ও অর্থনৈতিক চাপের মুখে ঐতিহ্যবাহী এই দোকানটিকে টিকিয়ে রাখতে শুরু হয়েছে অর্থ সংগ্রহের বিশেষ উদ্যোগ, যেখানে এটিকে বাঁচাতে স্পেনের সংবাদমাধ্যমে লেখক, পাঠক ও বইপ্রেমীদের পক্ষ থেকে আকুল আবেদন জানানো হচ্ছে।
সান্তিয়াগো রদ্রিগেস যখন এই পথচলা শুরু করেছিলেন, তখন তাঁর সামনে কোনো নিশ্চিত ভবিষ্যৎ ছিল না। তবে তিনি মনে-প্রাণে বিশ্বাস করতেন এক অমোঘ সত্য—‘স্কুল মানুষকে মুক্ত করে এবং সভ্য করে।’ উনিশ শতকের স্পেনে যখন শিক্ষা ছিল এক গভীর সামাজিক প্রশ্ন, তখন সান্তিয়াগো বইকে কেবল পণ্য হিসেবে দেখেননি। তিনি চেয়েছিলেন এমন বই তৈরি করতে, যা সাধারণ ও দরিদ্র পরিবারের শিশুদের কাছে সহজে পৌঁছাতে পারে। বিশেষ করে স্কুলের পাঠ্যবই এবং শিশুদের জন্য সহজ ভাষায় সস্তা বই প্রকাশের সিদ্ধান্তই এই প্রতিষ্ঠানের ইতিহাসকে বদলে দেয়। কবি আন্তোনিও মাচাদোর সেই বিখ্যাত পঙ্ক্তি—‘পথিক, কোনো তৈরি পথ নেই; চলতে চলতেই পথ তৈরি হয়’—যেন সান্তিয়াগোর এই জীবনসংগ্রামের সঙ্গেই মিলে যায়।
ঐতিহাসিক এই প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস ঘাঁটলে জানা যায়, সান্তিয়াগো রদ্রিগেস আধুনিক মুদ্রণপ্রযুক্তির গুরুত্ব খুব দ্রুত অনুধাবন করেছিলেন। ইউরোপের একটি প্রদর্শনীতে নতুন ধরনের মুদ্রণযন্ত্র দেখে মুগ্ধ হয়ে তিনি সেই প্রযুক্তিকে বুর্গোসে নিয়ে আসেন, যার নাম ছিল ‘মিনার্ভা’। জ্ঞান ও প্রজ্ঞার প্রতীক এই মিনার্ভা যন্ত্র কেবল অক্ষরই ছাপেনি, বরং বুর্গোস থেকে স্পেনের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে দিয়েছে শিক্ষার আলো। পরবর্তীতে শিশুদের জন্য প্রকাশিত ‘বিব্লিওটেকাস রদ্রিগেজ’ নামক বিভিন্ন বইয়ের সিরিজ স্প্যানিশ শিশুদের পাঠাভ্যাস তৈরি এবং কল্পনার জগৎ গঠনে অনন্য ভূমিকা পালন করে। ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকার ‘সবুজ, তোমাকে আমি সবুজ বলেই ভালোবাসি’ কবিতার মতো এই দোকানেরও নিজস্ব এক রং ছিল, যা তৈরি হয়েছিল কাগজের গন্ধ, পুরোনো কালি আর নতুন বইয়ের সাদা পাতার স্পর্শে।
ছয় প্রজন্ম ধরে পারিবারিক ঐতিহ্য ধরে রাখা এই প্রতিষ্ঠানটি একে একে পেরিয়ে এসেছে উনিশ শতকের ছাপাখানার বিবর্তন, দুটি বিশ্বযুদ্ধ, স্পেনের গৃহযুদ্ধ এবং আধুনিক ইন্টারনেট ও ই-বুকের যুগ। কিন্তু ২০২৬ সালের বর্তমান পরিস্থিতি যেন সব অতীত লড়াইকে ছাপিয়ে গেছে। গুস্তাভো আদলফো বেকের লিখেছিলেন, ‘কবি হয়তো নাও থাকতে পারেন; কিন্তু কবিতা সব সময় থাকবে।’ তেমনি একটি বইয়ের দোকান হয়তো চিরকাল খোলা থাকবে না, কিন্তু তার রেখে যাওয়া প্রভাব ও স্মৃতি থেকে যায় মানুষের মনে। বুর্গোসের এই দোকানটি বন্ধ হয়ে যাওয়া মানে কেবল একটি ব্যবসা বন্ধ হওয়া নয়, বরং একটি শহরের সাংস্কৃতিক স্মৃতি এবং হাজারো মানুষের শৈশবের ঠিকানা হারিয়ে যাওয়া। মাচাদোর আরেকটি পঙ্ক্তির মতো—‘পথিক, তোমার পদচিহ্নই পথ; আর কিছু নয়’—সান্তিয়াগোর রেখে যাওয়া সেই পদচিহ্ন ধরেই আজ ১৭৫ বছর পর আরও একবার বইয়ের দোকানটিকে বাঁচানোর লড়াইয়ে শামিল হয়েছেন স্পেনের বইপ্রেমীরা।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মাহের আহমেদ, প্রধান সম্পাদক: মোঃ মোত্তালিব সরকার। প্রকাশক কর্তৃক ৫৫০বি, হজ্জ ক্যাম্প রোড, আশকোনা, দক্ষিণখান, ঢাকা-১২৩০, বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত। সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় (ঢাকা) : ৫৫০বি, হজ্জ ক্যাম্প রোড, আশকোনা, দক্ষিণখান, ঢাকা-১২৩০, বাংলাদেশ। আঞ্চলিক কার্যালয় (বগুড়া): টোলারগেট, শেরপুর–৫৮৪০, শেরপুর, বগুড়া। অফিস: ০১৭৭৬-১৩৬০৫০ (হোয়াটসঅ্যাপ), বিজ্ঞাপন: ০৯৬৯৭-৫৪৪৮২৭। ই-মেইল: dailyjokhonsomoy@gmail.com।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রনালয়ের বিধি মোতাবেক নিবন্ধনের জন্য আবেদিত ©সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © দৈনিক যখন সময় ২০২২