
হাম বা রুবিওলা একটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে ও তীব্র ভাইরাসজনিত রোগ, যা সঠিক সময়ে উপযুক্ত চিকিৎসার মাধ্যমে নিরাময় সম্ভব। তবে সময়মতো সচেতন না হলে এটি মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি, এমনকি মৃত্যুর কারণও হতে পারে। বিশেষ করে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে এই রোগের জটিলতা অনেক বেশি দেখা যায় এবং চলতি বছর হাম-পরবর্তী জটিলতায় বেশ কিছু শিশুর মৃত্যুও হয়েছে। গাজীপুরের ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতালের এমবিবিএস শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী হাসান মাহমুদ শুভ হামের লক্ষণ ও প্রতিকার নিয়ে বিস্তারিত তথ্য জানিয়েছেন।
প্যারামক্সিভাইরাস গোত্রের মর্বিলিভাইরাস গণের অন্তর্ভুক্ত একটি ভাইরাসের কারণে এই রোগটি হয়ে থাকে। শ্বাসতন্ত্রের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশের পর হাম ভাইরাস (Measles virus—MV) প্রথমে ওপরের শ্বাসনালিতে বংশবিস্তার করে এবং পরে পার্শ্ববর্তী লসিকাগ্রন্থিতে ছড়িয়ে পড়ে সেখানকার কোষ ধ্বংস করে। এর ফলে রোগীর শরীরে শ্বেত রক্তকণিকার সংখ্যা কমে যাওয়ার মতো তীব্র লিউকোপেনিয়া দেখা হতে পারে। পরবর্তীতে ভাইরাসটি রক্তপ্রবাহে ছড়িয়ে পড়ে, যাকে প্রাথমিক ভাইরেমিয়া বলা হয়। এর মাধ্যমে ভাইরাস দেহের রেটিকুলোএন্ডোথেলিয়াল সিস্টেম (RES) এবং শ্বাসতন্ত্রসহ বিভিন্ন অঙ্গ ও তন্ত্রে ছড়িয়ে যায়। এরপর দ্বিতীয় পর্যায়ের ভাইরেমিয়ার মাধ্যমে ভাইরাসটি আরও ব্যাপকভাবে ত্বক, কিডনি, মূত্রথলিসহ অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন অঙ্গকে আক্রান্ত করে।
হাম অত্যন্ত ছোঁয়াচে একটি রোগ যা বাতাসের মাধ্যমে ছড়ায়। আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি-কাশির মাধ্যমে এই জীবাণু অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে যেতে পারে, ফলে একই পরিবারে থাকা অন্য সদস্যরা সহজেই এতে আক্রান্ত হতে পারেন। তবে আক্রান্ত হওয়া বা না হওয়া মূলত ব্যক্তির রোগ প্রতিরোধক্ষমতার ওপর নির্ভর করে। সাধারণত হাম ভাইরাসের সংক্রমণ স্বতঃসীমাবদ্ধ বা সেলফ-লিমিটিং। শরীরের নিজস্ব রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা আক্রান্ত কোষগুলোকে ধ্বংস করার মাধ্যমে ধীরে ধীরে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনে এবং একবার সুস্থ হওয়ার পর সাধারণত শরীরে আজীবন রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে ওঠে।
হামের লক্ষণগুলোকে প্রধানত তিনটি ধাপে ভাগ করা যায়। প্রথমত, ৩ থেকে ৪ দিনের প্রড্রোমাল পর্যায়ে রোগীর জ্বর, কাশি, চোখ লাল হওয়া এবং নাক দিয়ে পানি পড়ার মতো উপসর্গ দেখা দেয়। এ সময় গালের ভেতরের মিউকোসায়, বিশেষ করে ওপরের মোলার দাঁতের বিপরীতে ছোট ছোট সাদা দানার মতো ‘কপলিকের দাগ’ বা কপলিকস স্পট দেখা যায়, যা এই রোগের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। দ্বিতীয়ত, ৬ থেকে ৭ দিনের এক্সানথেমেটাস পর্যায়ে ত্বকে ফুসকুড়ি বা ম্যাকুলোপ্যাপুলার র্যাশ দেখা দেয়। সাধারণত জ্বরের চতুর্থ দিনে, যখন তাপমাত্রা সর্বোচ্চ থাকে, তখন প্রথমে কানের পেছনে র্যাশ দেখা দেয়। পরবর্তী ৩-৪ দিনে এই ফুসকুড়ি সারা শরীর এবং হাত-পায়ের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। ত্বক ও অভ্যন্তরীণ অঙ্গে এই র্যাশ মূলত দেহের বিলম্বিত অতি-সংবেদনশীলতাজনিত প্রতিক্রিয়ার ফল।
শেষ ধাপে বা আরোগ্য পর্যায়ে রোগের উপসর্গগুলো ধীরে ধীরে কমতে থাকে। ফুসকুড়িগুলো যে ক্রমে শরীরে ছড়িয়েছিল, ঠিক একই ক্রমে তা মিলিয়ে যেতে শুরু করে। র্যাশ সেরে যাওয়ার পর ত্বকে সূক্ষ্ম বাদামি রঙের খসখসে চামড়া ওঠার প্রবণতা দেখা যেতে পারে এবং কাশি প্রায় দুই সপ্তাহ পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। হামের কারণে শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস পাওয়ায় ব্যাকটেরিয়াজনিত মারাত্মক সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যায়। এর ফলে শিশুদের নিউমোনিয়া, মস্তিষ্কের প্রদাহ (এনকেফালাইটিস), মস্তিষ্কের পর্দার প্রদাহ (মেনিনজাইটিস), রক্তে সংক্রমণ (সেপটিসেমিয়া), তীব্র ডায়রিয়া, দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়া এবং কানের ইনফেকশন হতে পারে।
হাম নিরাময়ের জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো ওষুধ নেই। চিকিৎসকেরা মূলত রোগীর কষ্ট উপশম করতে উপসর্গ অনুযায়ী ওষুধ দিয়ে থাকেন। তাই হামের কোনো লক্ষণ দেখা দিলে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং সে অনুযায়ী যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
হামের অন্যতম বৈশিষ্ট্য কপলিকের দাগ (Koplik’s spots) এবং ত্বকের র্যাশ মূলত দেহের বিলম্বিত অতি-সংবেদনশীলতাজনিত প্রতিক্রিয়া (delayed hypersensitivity reaction)-এর ফল বলে মনে করা হয়।
হামের লক্ষ্মণ : প্রড্রোমাল পর্যায় (৩–৪ দিন) এই পর্যায়ে সাধারণত নিম্নোক্ত উপসর্গ দেখা যায়— জ্বর,কাশি, চোখ লাল হয়ে যাওয়া,নাক দিয়ে পানি পড়া, কপলিকের দাগ (Koplik’s spot) দেখা দেওয়া—উপরের মোলার দাঁতের বিপরীতে গালের ভেতরের মিউকোসায় ছোট ছোট সাদা দানার মতো দাগ দেখা যায়।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মাহের আহমেদ, প্রধান সম্পাদক: মোঃ মোত্তালিব সরকার। প্রকাশক কর্তৃক ৫৫০বি, হজ্জ ক্যাম্প রোড, আশকোনা, দক্ষিণখান, ঢাকা-১২৩০, বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত। সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় (ঢাকা) : ৫৫০বি, হজ্জ ক্যাম্প রোড, আশকোনা, দক্ষিণখান, ঢাকা-১২৩০, বাংলাদেশ। আঞ্চলিক কার্যালয় (বগুড়া): টোলারগেট, শেরপুর–৫৮৪০, শেরপুর, বগুড়া। অফিস: ০১৭৭৬-১৩৬০৫০ (হোয়াটসঅ্যাপ), বিজ্ঞাপন: ০৯৬৯৭-৫৪৪৮২৭। ই-মেইল: dailyjokhonsomoy@gmail.com।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রনালয়ের বিধি মোতাবেক নিবন্ধনের জন্য আবেদিত ©সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © দৈনিক যখন সময় ২০২২