
দেশের বাজারে সুগন্ধি বা পোলাও চালের দাম অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। গত এক মাসে প্রতি কেজি পোলাও চালের দাম ৮০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি তেলের বাড়তি দামের প্রভাবে এমনিতেই নিত্যপণ্যের বাজারে সাধারণ মানুষ দিশেহারা। এর মধ্যে পোলাও চালের এই দাম বৃদ্ধি নিম্ন ও মধ্যবিত্তের জন্য বড় ধাক্কা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ক্রেতাদের অভিযোগ, বাজার তদারকির দুর্বলতা এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের কারসাজিতে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
বাজারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ছয় মাসে কেজিপ্রতি পোলাও চালের দাম বেড়েছে ৮০ থেকে ৯০ টাকা পর্যন্ত। বর্তমানে ব্র্যান্ডভেদে প্যাকেটজাত সুগন্ধি চাল (চিনিগুঁড়া বা কালিজিরা) প্রতি কেজি সর্বনিম্ন ২১০ থেকে সর্বোচ্চ ২২৩০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। খোলা পোলাও চালের দামও হু-হু করে বাড়ছে, যা কোথাও কোথাও ১৮০ থেকে ২০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হতে দেখা গেছে। দাম বাড়ার কারণে অনেক ব্যবসায়ী আগের কম দামের প্যাকেটজাত চাল বেশি দামে বিক্রি করছেন, আবার কেউ কেউ প্যাকেটের চাল খুলে খোলা হিসেবে ২০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করছেন। বাজারে সাধারণত এসিআই, স্কয়ার, প্রাণ, আকিজসহ কয়েকটি ব্র্যান্ডের পোলাও চাল বেশি বিক্রি হয়।
ব্যবসায়ীরা জানান, এক মাস আগেও পাইকারি বাজারে বস্তাপ্রতি (৫০ কেজি) সবচেয়ে বেশি বিক্রীত চিনিগুঁড়া চালের দাম ছিল ৭ হাজার ৫০০ টাকা। বর্তমানে তা ২ হাজার টাকা বেড়ে ৯ হাজার ৫০০ টাকায় ঠেকেছে। রাজধানীর পলাশী মোড়ের বুয়েট মার্কেটে থেকে ১৯০ টাকায় এক কেজি চিনিগুঁড়া পোলাও চাল কিনে ক্ষোভ প্রকাশ করেন ক্রেতা আব্দুস সাত্তার। তিনি বলেন, আগে শুনতাম ইলিশ বা চিংড়ি মাছ রপ্তানি হয় বলে দাম বেশি থাকে, এখন দেখছি পোলাও চাল রপ্তানি হলেও দাম বাড়ে। কৃষিপ্রধান দেশে এত দাম দিয়ে চাল কেনা দুঃখজনক।
একই বাজারের নজরুল রাইস এজেন্সির মালিক নজরুল ইসলাম জানান, এক মাস আগেও খোলা পোলাও চালের দাম ছিল সর্বোচ্চ ১১০ টাকা, যা এখন ১৯০-২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে বাজারে চালের কোনো ঘাটতি নেই। ইনসাফ বাজারের মালিক ওমর ফারুক রাহিম বলেন, এক মাস আগে ১১০ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি হওয়া প্যাকেটের চাল এখন ২২০ থেকে ২৩০ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। এর ফলে বিক্রি অনেক কমে গেছে এবং নিম্ন ও মধ্যবিত্তের ক্রেতারা এখন প্যাকেট চাল কেনা কমিয়ে দিয়েছেন। সেগুনবাগিচা কাঁচাবাজারের সেলিম রাইস ভাণ্ডারের স্বত্বাধিকারী মো. সেলিম উদ্দিন মোল্লা জানান, পাইকারি বাজারে রপ্তানির অজুহাতে পর্যাপ্ত চাল পাওয়া যাচ্ছে না। গত এক মাসে চিনিগুঁড়া চালের দাম বস্তাপ্রতি ২৫ শতাংশের বেশি বেড়েছে।
ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ দাবি করছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা বেশি থাকায় দেশীয় বাজারে দাম বাড়ছে। এবার প্রতি কেজি চাল রপ্তানির সর্বনিম্ন মূল্য ১ দশমিক ৬০ মার্কিন ডলার (বর্তমান ডলার রেট অনুযায়ী প্রায় ১৯৭ টাকা) নির্ধারণ করা হয়েছে। এক মাস আগে যখন রপ্তানির অনুমোদন দেওয়া হয়, তখন দেশে প্রতি কেজি চিনিগুঁড়া চালের দাম ছিল ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা। ফলে আন্তর্জাতিক মূল্যের সঙ্গে সমন্বয় করে স্থানীয় বাজারেও দাম বেড়েছে।
তবে কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর সহ-সভাপতি নাজের হোসাইন এই অজুহাতকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন। তিনি বলেন, দেশে বছরে ১০ থেকে ১২ লাখ টন সুগন্ধি চাল উৎপাদন হয়। অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়েও কয়েক লাখ টন উদ্বৃত্ত থাকে। সরকার সেই উদ্বৃত্ত অংশ থেকে মাত্র কয়েক হাজার টন চাল রপ্তানির অনুমোদন দিয়েছে, যা মূলত প্রবাসীরা কেনেন। পরিবহন বা জ্বালানি খরচের অজুহাতও অযৌক্তিক, কারণ তা সত্য হলে অন্য চালের দামও বাড়ত। এটি মূলত কতিপয় করপোরেট ব্যবসায়ী ও মিলারদের যোগসাজশে তৈরি করা একটি কৃত্রিম সংকট।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যমতে, ২০০৯-১০ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে প্রথমবার মাত্র ৬৬৩ টন সুগন্ধি চাল রপ্তানি শুরু হয়। ২০১৯-২০ অর্থবছরে তা ১০ হাজার ৮৭৯ টনে উন্নীত হয়। এরপর ২০২০-২১ অর্থবছরে সাড়ে ৮ হাজার টন এবং ২০২১-২২ অর্থবছরে ৫ হাজার ১০০ টন সুগন্ধি চাল রপ্তানি হয়েছিল। ২০২২-২৩ ও ২০২৩-২৪ অর্থবছরে রপ্তানি স্থগিত রাখার পর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দুই দফায় ২৩ হাজার ৯৫৯ টন রপ্তানির অনুমতি দেওয়া হয়। পরবর্তীতে রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা প্রায় দ্বিগুণ বাড়িয়ে ৪৫ হাজার ৩২০ টনে উন্নীত করে মেয়াদ চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত করা হয়।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, দেশের শীর্ষ ১০টি বড় মিলমালিকের কাছে বিপুল পরিমাণ সুগন্ধি চাল মজুত রয়েছে। তারা বাজারে প্রয়োজন অনুযায়ী চাল না ছেড়ে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোকে সঙ্গে নিয়ে বাজার তদারকি জোরদার করার নির্দেশ দিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। পাশাপাশি রপ্তানি কোটা পুনর্বিবেচনা করে তা কমানো বা সমন্বয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ চাল রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ ইশাকুল হোসেন জানান, গত এক মাসে মাত্র দুই হাজার টনের মতো পোলাও চাল রপ্তানি হয়েছে। কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতেই সরকার এই অনুমোদন দিয়েছে। দেশে বার্ষিক অন্তত ১০ লাখ টন সুগন্ধি চাল উৎপাদিত হয়, যেখানে অভ্যন্তরীণ চাহিদা মাত্র চার লাখ টন। ফলে প্রায় ছয় লাখ টন উদ্বৃত্ত থাকে। এই পরিস্থিতিতে সামান্য চাল রপ্তানি হলে সরবরাহে ঘাটতি হওয়ার কথা নয়। মূলত কিছু মিল মালিক চাল মজুত করে দাম বাড়িয়ে পরিস্থিতির সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করছেন, যা দেশের কৃষি রপ্তানির সম্ভাবনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
তবে কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) সহ-সভাপতি নাজের হোসাইন এদিনকে বলেন, ‘আমাদের দেশে বছরে ১০-১২ লাখ টন সুগন্ধি চাল উৎপাদন হয়। বার্ষিক অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়েও যা থেকে কয়েক লাখ টন উদ্বৃত্ত থেকে যায়। ওই উদ্বৃত্ত অংশ থেকেই মাত্র কয়েক হাজার টন চাল বিভিন্ন দেশে রপ্তানির অনুমোদন দিয়েছে সরকার। এই যে রপ্তানি হবে এটিও বিভিন্ন দেশে থাকা প্রবাসী বাংলাদেশিরা কিনবেন। সেই অর্থে দেশের মানুষের স্বার্থেই রপ্তানি হবে।’
সম্পাদক ও প্রকাশক: মাহের আহমেদ, প্রধান সম্পাদক: মোঃ মোত্তালিব সরকার। প্রকাশক কর্তৃক ৫৫০বি, হজ্জ ক্যাম্প রোড, আশকোনা, দক্ষিণখান, ঢাকা-১২৩০, বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত। সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় (ঢাকা) : ৫৫০বি, হজ্জ ক্যাম্প রোড, আশকোনা, দক্ষিণখান, ঢাকা-১২৩০, বাংলাদেশ। আঞ্চলিক কার্যালয় (বগুড়া): টোলারগেট, শেরপুর–৫৮৪০, শেরপুর, বগুড়া। অফিস: ০১৭৭৬-১৩৬০৫০ (হোয়াটসঅ্যাপ), বিজ্ঞাপন: ০৯৬৯৭-৫৪৪৮২৭। ই-মেইল: dailyjokhonsomoy@gmail.com।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রনালয়ের বিধি মোতাবেক নিবন্ধনের জন্য আবেদিত ©সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © দৈনিক যখন সময় ২০২২