Header Premium (728×90)

পুরোনো ওষুধ নীতিতে ফিরছে সরকার, রোগীদের ভোগান্তি বাড়ার আশঙ্কা

অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা ও মূল্য নির্ধারণে তিন দশকেরও বেশি সময় পর সংস্কারের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তা থেকে সরে এসেছে সরকার। গত ৩ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে অন্তর্বর্তী সরকার প্রণীত ‘অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা-২০২৬’ এবং ‘ওষুধের মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি-২০২৬’ বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর ফলে ১৯৯৪ সালের পুরোনো তালিকা এবং সরকারি মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থাই দেশে আবার বহাল হতে যাচ্ছে। সরকারের এই নীতিগত পরিবর্তনের ফলে জীবনরক্ষাকারী ওষুধের দাম এবং সাধারণ মানুষের চিকিৎসা ব্যয় আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

ওষুধের এই দাম বৃদ্ধির আশঙ্কায় সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তায় পড়েছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের রোগীরা। কাজীপাড়ার বাসিন্দা ও বেসরকারি চাকরিজীবী মিজানুর রহমান জানান, তাঁর মা-বাবা দুজনেই ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। বাবার হৃদরোগ ও উচ্চ রক্তচাপের চিকিৎসাও চলছে। নিয়মিত চিকিৎসক দেখানো, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ওষুধের পেছনেই তাঁর মাসে ২০-২৫ হাজার টাকা খরচ হয়। উচ্চ মূল্যস্ফীতির এই সময়ে বাড়িভাড়া, সন্তানের পড়াশোনা ও সংসারের অন্যান্য খরচ মিটিয়ে চিকিৎসা ব্যয় বহন করতে গিয়ে তিনি এখন হাঁপিয়ে উঠেছেন। তাঁর মতো লাখ লাখ মানুষ জীবন রক্ষাকারী ওষুধের ব্যয় মেটাতে গিয়ে সঞ্চয় হারাচ্ছেন, ঋণগ্রস্ত হচ্ছেন এবং অনেকে নতুন করে দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে পড়ছেন।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের প্রায় ৭৯ শতাংশই রোগীকে নিজের পকেট থেকে বহন করতে হয়। চিকিৎসা ও ওষুধের এই বিশাল খরচ জোগাতে না পেরে অনেকে চিকিৎসকের কাছে যাওয়া বন্ধ করে দেন, আবার কেউ কেউ মাঝপথে ওষুধ খাওয়া ছেড়ে দেন। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, তিন দশক পর ওষুধের তালিকা ও দাম নির্ধারণের নীতি সংস্কার করা ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের অন্যতম বড় পদক্ষেপ। কিন্তু পুরোনো ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ায় ওষুধের কাঁচামালের দাম, উৎপাদন খরচ ও ডলারের মূল্যবৃদ্ধির অজুহাতে কোম্পানিগুলো ওষুধের দাম বাড়ানোর সুযোগ পাবে, যা দীর্ঘমেয়াদি রোগীদের ওপর বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি করবে।

এর আগে, ২০২৫ সালের ২৫ নভেম্বর হাইকোর্টের এক রায়ের প্রেক্ষিতে পুরোনো ১১৭টি ওষুধের তালিকা বাতিল করে নতুন তালিকা তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। সেই অনুযায়ী, ২০২৫ সালে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের সংখ্যা বাড়িয়ে ২৯৭টি করা হয়, যেখানে নতুন করে ১৭৮টি ওষুধ যুক্ত হয়েছিল। চলতি বছরের ৮ জানুয়ারি উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে অনুমোদনের পর ৩ ফেব্রুয়ারি এটি গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়। তৎকালীন স্বাস্থ্য উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান এই উদ্যোগকে ‘ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী’ বলে অভিহিত করেছিলেন।

তবে এই সংস্কার নিয়ে শুরু থেকেই আপত্তি জানিয়ে আসছিল বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতি। গত বছরের ১৩ আগস্ট বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এই নীতিকে ‘অস্বচ্ছ ও একপেশে’ আখ্যা দিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি অভিযোগ করেছিলেন যে, অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা তৈরি ও সরবরাহ নিশ্চিত করার টাস্কফোর্স এবং ড্রাগ কন্ট্রোল কমিটির কারিগরি উপকমিটিতে ঔষধ শিল্প সমিতির কোনো প্রতিনিধি রাখা হয়নি। পরবর্তীতে ৩ আগস্টের মন্ত্রিসভার বৈঠকের পর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ জানায়, ‘ওষুধ ও কসমেটিকস আইন, ২০২৩’ অনুযায়ী জাতীয় ওষুধ উপদেষ্টা পরিষদের পরামর্শ ছাড়া এই তালিকা প্রণয়ন করায় তা বাতিল করা হয়েছে। সরকার অবশ্য নতুন করে তালিকা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তবে পুরোনো নীতি বাতিলের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে দায়ের করা রিট বর্তমানে বিচারাধীন রয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের ১৫০টির বেশি দেশে ওষুধের দাম ও সরবরাহ নিয়ন্ত্রণে জাতীয় অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা ব্যবহার করা হয়। এ প্রসঙ্গে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, সরকারের এই সিদ্ধান্ত জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। প্রযুক্তির এই যুগে এসে ৩২ বছরের পুরোনো আইনে ফিরে যাওয়া কোনোভাবেই যৌক্তিক নয়। ১৯৯৪ সালের তালিকার অনেক ওষুধ এখন অকার্যকর এবং নতুন প্রযুক্তির কারণে অনেক ওষুধের উৎপাদন খরচও কমেছে। তাই পুরো ব্যবস্থা বাতিল না করে প্রয়োজন অনুযায়ী সংশোধন করা উচিত ছিল।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আবদুল হামিদ মনে করেন, ওষুধ ও রোগ নির্ণয়ের খরচ যেভাবে বাড়ছে, তাতে দীর্ঘদিন ধরে জেনেরিক ওষুধের তালিকা পর্যালোচনা না করা একটি বড় ঘাটতি। নতুন নীতি এমন হওয়া উচিত যাতে ওষুধ ব্যবসায়ীরা যেমন টিকে থাকতে পারেন, তেমনি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যেও দাম থাকে। অন্যথায় এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না।

এদিকে সরকারের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতি। সংগঠনের মহাসচিব মোহাম্মদ হালিমুজ্জামান দাবি করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের নেওয়া উদ্যোগটি ছিল সম্পূর্ণ অবৈধ এবং তাদের সঙ্গে কোনো আলোচনা ছাড়াই এটি করা হয়েছিল। এর ফলে গত দুই বছর ধরে ঔষধ শিল্পে স্থবিরতা বিরাজ করছিল। নতুন সিদ্ধান্তের ফলে বাজারে স্বস্তি ফিরবে এবং মানুষ সাশ্রয়ী মূল্যে ওষুধ পাবে বলে তিনি দাবি করেন। অন্যদিকে, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক ড. আকতার হোসেন জানান, মন্ত্রণালয় থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক আদেশ না পাওয়ায় এ বিষয়ে মন্তব্য করা সম্ভব নয়।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Amar Desh

Recent Posts

ইন্দোনেশিয়ার ফ্লোরেসে ৭.৭ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প

শনিবার ভোরে ইন্দোনেশিয়ার ফ্লোরেস অঞ্চলে ৭.৭ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। এতে সুনামির আশঙ্কা তৈরি…

53 seconds ago

গ্যাসের হাহাকারে বিপর্যস্ত জনজীবন, পাল্লা দিয়ে বাড়ছে লোডশেডিং

সারা দেশে গ্যাস সংকটের কারণে জনজীবনে নজিরবিহীন হাহাকার চলছে। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে লোডশেডিং।…

21 minutes ago

আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম এক লাফে বাড়ল ১ ডলার

হরমুজ প্রণালিতে ট্যাঙ্কারে হামলা এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি আলোচনার অচলাবস্থার জেরে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম…

23 minutes ago

রংপুর অঞ্চলে মাছের ঘাটতি ১৯ হাজার টন, সংকট নিরসনে উদ্যোগ

রংপুর বিভাগের ৮ জেলায় বার্ষিক মাছের চাহিদা ও উৎপাদনের মধ্যে ১৯ হাজার মেট্রিক টন ঘাটতি…

29 minutes ago

বাংলাদেশের মাটিতে আর ফ্যাসিবাদের জায়গা হবে না: শামা ওবায়েদ

ফরিদপুরের সালথায় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম মন্তব্য করেছেন যে, দীর্ঘ ১৮ বছরের আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য…

31 minutes ago

মেরুপথে রাশিয়া-চীন বাণিজ্য বৃদ্ধি: উদ্বেগে পশ্চিমা বিশ্ব

মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এড়াতে এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার মধ্যে বিকল্প হিসেবে সুমেরু অঞ্চলকে বেছে নিয়েছে মস্কো ও…

35 minutes ago

This website uses cookies.