Header Premium (728×90)

সামরিক হুমকি ছেড়ে ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়াচ্ছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প

ইরানের বিরুদ্ধে প্রায় ২৩ সপ্তাহ ধরে সামরিক অভিযান চালানোর পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবার সামরিক সংঘাত বাড়ানোর পথ থেকে সরে এসেছেন। তেহরানের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেওয়ার লক্ষ্যে তিনি এখন অর্থনৈতিক অবরুদ্ধতা জোরদার করার দিকেই বেশি মনোযোগ দিচ্ছেন। গত সপ্তাহে ইরানকে ভয়াবহ সামরিক হামলার হুমকি দিলেও, ট্রাম্প প্রশাসন এখন সেই অবস্থান পরিবর্তন করে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপের নীতিকেই বেছে নিয়েছে।

এই কৌশলগত সংঘাতের জেরে পারস্য উপসাগরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় বৈশ্বিক শিপিং ব্যবসা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। একই সময়ে ইরানের বন্দরগুলোকে লক্ষ্য করে মার্কিন নৌবাহিনীর গড়ে তোলা অবরোধ আরও জোরদার করা হয়েছে। ওমান ও ইরান হরমুজ প্রণালির ব্যবস্থাপনা নিয়ে একটি সমঝোতার কাছাকাছি পৌঁছানোর দাবি করলেও, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জানিয়েছেন যে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে অত্যন্ত সীমিত বা আংশিক আলোচনা করছে। তবে তেহরান ওয়াশিংটনের সাথে সরাসরি কোনো ধরনের আলোচনার বিষয়টিকে স্পষ্টভাবে অস্বীকার করেছে।

ওয়াশিংটন চাইছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য যেন কোনো ধরনের বাধা, অনুমোদন বা মাশুল ছাড়াই এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ ব্যবহার করতে পারে। অন্যদিকে তেহরানের দাবি, আমেরিকাকে তাদের ওপর আরোপিত নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার করতে হবে, অন্যায্য নিষেধাজ্ঞা শিথিল করতে হবে এবং যুদ্ধজনিত ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের ওপর নিজেদের সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণ ও ট্রানজিট ফি আদায়ের দাবি বজায় রাখতে চায় ইরান, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি নাকচ করে দিয়েছে। এই জটিলতায় গভীর সমুদ্রে বাণিজ্যিক জাহাজ পরিচালনার ক্ষেত্রে মূল সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে জাহাজ মালিক ও বীমা কোম্পানিগুলোকে। কোনো আন্তর্জাতিক জাহাজ যদি ইরানি কর্তৃপক্ষের দাবি মেনে ট্রানজিট ফি প্রদান করে, তবে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়ার এবং আন্তর্জাতিক বীমা কভারেজ বাতিলের ঝুঁকি তৈরি হয়। আবার ফি না দিলে তেহরানের সামরিক বাহিনীর হাতে আটক বা আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বাড়ে। ফলে সমুদ্রপথে চলাচলের বাস্তবিক নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত পণ্য ও জ্বালানিবাহী জাহাজগুলো এই পথ ব্যবহারে চরম অনিশ্চয়তায় ভুগছে, যার প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আবারও বাড়ছে।

ট্রাম্পের এই অর্থনৈতিক কৌশলের অন্যতম লক্ষ্য হলো ইরানের অভ্যন্তরীণ মূল্যস্ফীতি, অর্থনৈতিক বিপর্যয় ও সামরিক বাহিনীর অর্থায়নে সৃষ্ট সংকটকে কাজে লাগিয়ে তেহরানকে কোণঠাসা করা। দীর্ঘদিনের সমুদ্র অবরোধের কারণে ইরানের অপরিশোধিত তেল রপ্তানি তলানিতে এসে ঠেকেছে, যাকে ট্রাম্প ‘ইস্পাতের প্রাচীর’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। ওয়াশিংটন মনে করছে, এই দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক পঙ্গুত্ব ইরানকে চুক্তিতে আসতে বাধ্য করবে। তবে অনেক কূটনৈতিক বিশ্লেষক ও পররাষ্ট্র বিশেষজ্ঞ মনে করেন, এই নীতি সফল হওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ, কারণ কঠোর নিষেধাজ্ঞা অতীতে ইরানের রাজনৈতিক নেতৃত্বের আচরণ বদলাতে পারেনি। স্বৈরাচারী ও অভ্যন্তরীণভাবে কঠোর নিয়ন্ত্রণকারী শাসনকাঠামো হওয়ায় অর্থনৈতিক দুর্দশার ভার সাধারণ জনগণের ওপর পড়লেও নীতিনির্ধারণে তার প্রভাব খুবই কম পড়ে।

এছাড়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপেও বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা প্রকাশ পেয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের সূত্র অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউক্রেন সংঘাতের কারণে পেন্টাগনের উচ্চমানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও গোলাবারুদের মজুদ মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে। মার্কিন শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন যে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত মার্কিন সশস্ত্র বাহিনীর নিরাপত্তা প্রস্তুতিকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। যদিও পেন্টাগন দাবি করছে যে যুদ্ধ পরিচালনার জন্য পর্যাপ্ত অস্ত্র রয়েছে, তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ জনগণের মধ্যে এই যুদ্ধের জনপ্রিয়তা আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের মুখে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটার সামরিক অভিযানের চেয়ে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমাধানকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছেন।

এই পরিস্থিতিতে তেহরানের পরমাণু কর্মসূচি বন্ধ না হলে চুক্তি হবে না—এমন অবস্থান থেকে সরে আসতে বাধ্য হচ্ছে ট্রাম্প প্রশাসন। মার্কিন কর্মকর্তাদের সূত্রে জানা গেছে, পারমাণবিক চুক্তি ছাড়াই ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন ট্রাম্প। এর মূল শর্ত হলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া এবং বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করা। ট্রাম্প তার সহযোগীদের জানিয়েছেন, বিশ্ববাজার ও মার্কিন অর্থনীতিকে সামাল দিতে পরমাণু চুক্তি ছাড়াই যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়াতে বা যুদ্ধ থেকে সরে আসতে তিনি প্রস্তুত। তবে তেহরান সহজে এই প্রণালি খুলতে রাজি নয়। এর বিনিময়ে তারা ওয়াশিংটনের কাছে আন্তর্জাতিক নৌ-অবরোধের অবসান, বিলিয়ন ডলারের যুদ্ধক্ষতিপূরণ প্রদান, অঞ্চলটি থেকে মার্কিন বাহিনী প্রত্যাহার এবং জব্দ করা ইরানি সম্পত্তি ফেরত দেওয়ার মতো কঠোর শর্ত দিয়েছে।

ইরানের এই কঠোর মনোভাবের কারণে দর-কষাকষির টেবিল থমকে গেছে, যা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেই ট্রাম্পের নীতির তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে। ডেমোক্র্যাট সিনেটর ক্রিস মারফি এক সাক্ষাৎকারে মন্তব্য করেছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইতোমধ্যে ইরানের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধে হেরে গেছেন। তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, যুদ্ধ যত দীর্ঘায়িত হচ্ছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে ততই দুর্বল হচ্ছে এবং ইরান শক্তিশালী হয়ে উঠছে, যার ফলে আমেরিকানদের জীবনযাত্রার ব্যয় ও পণ্যের দাম বাড়ছে। মারফির মতে, বিশ্ববাজারে স্থিতিশীলতা ফেরাতে এবং হরমুজ প্রণালি দ্রুত চালু করতে প্রয়োজনে একটি ‘খারাপ চুক্তি’ মেনে নেওয়াও আমেরিকার জন্য বুদ্ধিমানের কাজ হবে। তিনি স্পষ্ট জানান, যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে কোনো নতুন অর্থ বরাদ্দে তিনি সমর্থন দেবেন না, বরং যুদ্ধ থামার পর নিঃশেষিত সামরিক অস্ত্রাগার পুনর্গঠন করতেই মনোযোগ দেওয়া উচিত।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Dainik Amader Shomoy

Recent Posts

কাশীয়ানীতে ১৯৮ ইয়াবাসহ ছাত্রদল নেতা গ্রেপ্তার

গোপালগঞ্জের কাশীয়ানীতে ১৯৮ পিস ইয়াবাসহ উপজেলা ছাত্রদলের সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. জুয়েল রানাকে গ্রেপ্তার…

6 minutes ago

ট্রাম্প-শি বৈঠকে সমঝোতা না হলেও যুক্তরাষ্ট্রে আসবে চীনা বৈদ্যুতিক গাড়ি

যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে অনুষ্ঠিত দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় চীনা ইভি মার্কিন বাজারে প্রবেশের বিষয়ে কোনো বড়…

20 minutes ago

শ্রীনগরে অগ্রণী ব্যাংকের টাকা লোপাট: পলাতক কর্মকর্তা শরীফুজ্জামান

মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগরে অগ্রণী ব্যাংকের ক্যাশ কর্মকর্তা শরীফুজ্জামান গ্রাহকদের টাকা আত্মসাৎ করে পলাতক রয়েছেন। এই ঘটনায়…

26 minutes ago

ডেঙ্গুতে একদিনে ৬ মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তিতে নতুন রেকর্ড

দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে আরও ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে ২ হাজার…

47 minutes ago

১০ বছরে পা দিল আব্রাম, ছেলের জন্মদিনে আবেগপ্রবণ অপু

ঢাকাই সিনেমার তারকা শাকিব খান ও অপু বিশ্বাসের ছেলে আব্রাম খান জয় ১০ বছরে পা…

55 minutes ago

মিরপুরে জাতীয় নাগরিক পার্টির আংশিক আহ্বায়ক কমিটি অনুমোদন

কুষ্টিয়া জেলা শাখার অধীন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মিরপুর উপজেলা শাখার আংশিক আহ্বায়ক কমিটি গঠন…

57 minutes ago

This website uses cookies.