
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার সম্পর্ক ইতিহাস, ভূগোল এবং পারস্পরিক স্বার্থের একটি অবিচ্ছেদ্য বুনন। যদিও এই সম্পর্ক কোনো একক ঘটনার ওপর নির্ভরশীল নয়, তবুও সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা কূটনৈতিক আস্থাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। ২০২৬ সালের ৫ আগস্ট নয়াদিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব অব সাউথ এশিয়ায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনকে ঘিরে ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যে নতুন কূটনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। এই ঘটনাটি কেবল একটি রাজনৈতিক অনুষ্ঠানের প্রশ্ন নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, বিচারিক প্রক্রিয়া, প্রত্যর্পণ চুক্তি এবং প্রতিবেশী সম্পর্কের মৌলিক নীতির সঙ্গে সরাসরি জড়িত।
বাংলাদেশ সরকারের অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্ট। ঢাকা এটিকে কেবল একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি হিসেবে দেখেনি, বরং জনগণের অনুভূতি, বিচারিক প্রক্রিয়া এবং রাষ্ট্রের মর্যাদার সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয় হিসেবে বিবেচনা করেছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিবাদপত্রেও সেই অবস্থানই তুলে ধরা হয়েছে। অন্যদিকে, ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এটি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের আয়োজন ছিল এবং এতে ভারত সরকারের সরাসরি সম্পৃক্ততা ছিল না। তবে কূটনীতিতে কোনো অনুষ্ঠান সরকার আয়োজন করেছে কি না, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো একটি দেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ওপর প্রভাব বিস্তারকারী কর্মকাণ্ডের কূটনৈতিক অভিঘাত।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ঘটনাবলি বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। সেই সময়কার সহিংসতা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগগুলো জাতিসংঘের তদন্তে উঠে এসেছে এবং এ নিয়ে দেশে বিচারিক প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় দিয়েছে এবং বর্তমান সরকার তাঁকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার দাবি পুনর্ব্যক্ত করেছে। ২০১৩ সালের প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় শেখ হাসিনাকে ফেরত চেয়ে বাংলাদেশ একাধিকবার আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানালেও ঢাকার অভিযোগ অনুযায়ী ভারত থেকে কার্যকর কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। এই নীরবতা কূটনৈতিক অনিশ্চয়তা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
দুই দেশের সম্পর্কের ভিত্তি হওয়া উচিত পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সার্বভৌম সমতা এবং একে অপরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা। ভারত দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম গণতন্ত্র ও আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইলে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের উদ্বেগকে গুরুত্ব দেওয়া এবং সংবেদনশীল বিষয়ে সতর্ক থাকা তাদের দায়িত্বের অংশ। একইভাবে বাংলাদেশেরও উচিত কূটনৈতিক চ্যানেল ও আন্তর্জাতিক আইনের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান জোরালোভাবে তুলে ধরা। আগামী সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে এই বিষয়টি উত্থাপিত হলে প্রত্যর্পণ চুক্তির কার্যকারিতা ও বিচারিক সহযোগিতার মতো বিষয়গুলো বিশ্বমঞ্চে আলোচনার সুযোগ পাবে।
বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক কেবল সরকারে সরকারে নয়, বরং বাণিজ্য, জ্বালানি, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং জনগণের পারস্পরিক যোগাযোগের ওপর নির্ভরশীল। পারস্পরিক আস্থা ক্ষুণ্ণ হলে সম্পর্কের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই উভয় দেশেরই উচিত সংবেদনশীল রাজনৈতিক ঘটনা যেন এই বিস্তৃত সম্পর্ককে স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না করে, সেদিকে নজর রাখা। ভারতের আশ্রয় নেওয়া শেখ হাসিনাকে কেন্দ্র করে এই বিতর্কের স্থায়ী সমাধান বিবৃতি বা পাল্টা বিবৃতিতে সম্ভব নয়। এর সমাধান নিহিত আছে আন্তরিক কূটনৈতিক সংলাপ, আইনের শাসনের প্রতি সম্মান এবং পারস্পরিক আস্থার পুনর্গঠনে। প্রতিবেশী বদলানো যায় না, কিন্তু সম্পর্ককে আরও দায়িত্বশীল ও সম্মানজনক করে তোলা সম্ভব—যা দুই দেশের দীর্ঘমেয়াদী স্বার্থে সবচেয়ে বিচক্ষণ পথ।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মাহের আহমেদ, প্রধান সম্পাদক: মোঃ মোত্তালিব সরকার। প্রকাশক কর্তৃক ৫৫০বি, হজ্জ ক্যাম্প রোড, আশকোনা, দক্ষিণখান, ঢাকা-১২৩০, বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত। সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় (ঢাকা) : ৫৫০বি, হজ্জ ক্যাম্প রোড, আশকোনা, দক্ষিণখান, ঢাকা-১২৩০, বাংলাদেশ। আঞ্চলিক কার্যালয় (বগুড়া): টোলারগেট, শেরপুর–৫৮৪০, শেরপুর, বগুড়া। অফিস: ০১৭৭৬-১৩৬০৫০ (হোয়াটসঅ্যাপ), বিজ্ঞাপন: ০৯৬৯৭-৫৪৪৮২৭। ই-মেইল: dailyjokhonsomoy@gmail.com।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রনালয়ের বিধি মোতাবেক নিবন্ধনের জন্য আবেদিত ©সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © দৈনিক যখন সময় ২০২২