
নরসিংদীর মাধবদীতে কয়েক মাসের এক শিশুর পা মোচড় দেওয়ার একটি ভিডিও সম্প্রতি দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। যদিও তদন্তে দেখা গেছে যে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত কিছু তথ্য অতিরঞ্জিত ছিল এবং শিশুটির পা ভাঙেনি, কিন্তু এই ঘটনাটি একটি বড় প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। প্রশ্নটি হলো, যে শিশু নিজের কষ্টের কথা ভাষায় প্রকাশ করতে পারে না, সে কীভাবে পারিবারিক বিরোধের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়? এই ঘটনাটিকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার কোনো সুযোগ নেই। মাগুরায় শিশু ধর্ষণ ও মৃত্যু, নোয়াখালীতে বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী শিশুর ওপর নির্যাতন, কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নির্যাতনের মতো অসংখ্য ঘটনা একই বাস্তবতাকে বারবার সামনে নিয়ে আসছে।
বাংলাদেশে একজন শিশু সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে তার নিজের পরিবার, আত্মীয়স্বজন কিংবা পরিচিত মানুষের সান্নিধ্যেই। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের প্রতি দুইজন শিশুর একজন কোনো না কোনো ধরনের সহিংসতার শিকার হয় এবং বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। ইউনিসেফ বারবার সতর্ক করেছে যে, শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার একটি বড় অংশ ঘটে সেইসব মানুষের হাতে, যাদের শিশুরা বিশ্বাস করে এবং যাদের কাছেই নিরাপত্তা পাওয়ার কথা।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্যমতে, চলতি বছরের প্রথম কয়েক মাসেই শতাধিক শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এর পাশাপাশি ধর্ষণচেষ্টা, ধর্ষণের পর হত্যা ও আত্মহত্যার মতো ঘটনাও নথিভুক্ত হয়েছে। বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম (বিএসএএফ) ও অন্যান্য পর্যবেক্ষক সংস্থার মতে, শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার ধরন দিন দিন বহুমাত্রিক হয়ে উঠছে। শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, যৌন সহিংসতা এবং অনলাইন শোষণের মতো ঘটনাগুলো শিশু সুরক্ষাকে একটি গভীর সামাজিক সংকটে পরিণত করেছে।
প্রকাশিত পরিসংখ্যান পরিস্থিতির পূর্ণ চিত্র তুলে ধরে না। বেশিরভাগ তথ্য সংবাদমাধ্যমের ওপর ভিত্তি করে তৈরি, কিন্তু অধিকাংশ নির্যাতনের ঘটনা সামাজিক লজ্জা বা প্রভাবশালীদের চাপে ধামাচাপা পড়ে যায়। বিশেষ করে নির্যাতনকারী যখন পরিবারের সদস্য বা পরিচিত কেউ হন, তখন বিচার পাওয়ার পথ আরও সংকুচিত হয়ে পড়ে। বাংলাদেশে শিশু নির্যাতনের ক্ষেত্রে অপরাধী প্রায়শই চাচা, খালা, শিক্ষক, প্রতিবেশী, গৃহশিক্ষক বা পরিবারের বন্ধু হয়ে থাকেন। এটি শুধু আইনশৃঙ্খলার ব্যর্থতা নয়, বরং সামাজিক সম্পর্কেরও বড় সংকট।
পরিবারকে একটি ব্যক্তিগত ক্ষেত্র হিসেবে দেখার কারণে শিশুর ওপর নির্যাতনকে অনেক সময় 'শাসন' বা 'পারিবারিক বিষয়' হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার প্রবণতা রয়েছে। এছাড়া আমাদের শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থা মূলত প্রতিক্রিয়াশীল, প্রতিরোধমূলক নয়। ঘটনা ভাইরাল হওয়ার পরই প্রশাসন নড়েচড়ে বসে, কিন্তু ঝুঁকিপূর্ণ পরিবার চিহ্নিত করা বা সামাজিক কর্মীদের হস্তক্ষেপের ব্যবস্থা খুবই সীমিত। বিচারহীনতার সংস্কৃতি অপরাধীদের উৎসাহিত করছে, আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নির্যাতনের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ায় শিশুটি পুনরায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
শিশু সুরক্ষাকে কেবল আইনশৃঙ্খলা নয়, বরং জনস্বাস্থ্য, শিক্ষা ও মানসিক স্বাস্থ্যের অংশ হিসেবে দেখা জরুরি। প্রতিটি বিদ্যালয়ে সুরক্ষা নীতিমালা কার্যকর করা, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, ইউনিয়ন পর্যায়ে সুরক্ষা কমিটি সক্রিয় করা এবং অভিভাবকদের জন্য ইতিবাচক প্যারেন্টিং কর্মসূচি চালু করা এখন সময়ের দাবি। শিশুরা কোনো পারিবারিক বিরোধের অস্ত্র বা প্রতিশোধের লক্ষ্য নয়, তারা রাষ্ট্রের সমান মর্যাদাসম্পন্ন নাগরিক। একটি রাষ্ট্র তার সবচেয়ে দুর্বল মানুষের নিরাপত্তা কতটা দিতে পারে, তার ওপরই তার সভ্যতার মান নির্ভর করে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মাহের আহমেদ, প্রধান সম্পাদক: মোঃ মোত্তালিব সরকার। প্রকাশক কর্তৃক ৫৫০বি, হজ্জ ক্যাম্প রোড, আশকোনা, দক্ষিণখান, ঢাকা-১২৩০, বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত। সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় (ঢাকা) : ৫৫০বি, হজ্জ ক্যাম্প রোড, আশকোনা, দক্ষিণখান, ঢাকা-১২৩০, বাংলাদেশ। আঞ্চলিক কার্যালয় (বগুড়া): টোলারগেট, শেরপুর–৫৮৪০, শেরপুর, বগুড়া। অফিস: ০১৭৭৬-১৩৬০৫০ (হোয়াটসঅ্যাপ), বিজ্ঞাপন: ০৯৬৯৭-৫৪৪৮২৭। ই-মেইল: dailyjokhonsomoy@gmail.com।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রনালয়ের বিধি মোতাবেক নিবন্ধনের জন্য আবেদিত ©সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © দৈনিক যখন সময় ২০২২