
বিশ্বের অধিকাংশ দেশে সরকার ও শাসনপদ্ধতি নিয়ে সাধারণ মানুষের আলোচনা বা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকলেও সৌদি আরবে রাজপরিবার কিংবা সরকারের সমালোচনা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। পরম রাজতন্ত্র দ্বারা পরিচালিত এই দেশে কোনো নির্বাচিত সংসদ বা রাজনৈতিক দল গঠনের সুযোগ নেই। ক্ষমতা একচ্ছত্রভাবে রাজপরিবারের হাতে কেন্দ্রীভূত থাকায় শাসনব্যবস্থায় জনগণের রাজনৈতিক স্বাধীনতা চরমভাবে সীমিত। আইন বিভাগ, বিচার বিভাগ এবং সংবাদমাধ্যম—সবই সরকারের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ভিন্নমত পোষণকারী, সাংবাদিক কিংবা সমাজকর্মীদের প্রায়শই কারাদণ্ডসহ কঠোর শাস্তির মুখে পড়তে হয়।
সৌদির এই কঠোর শাসন ও বিচার কাঠামোর মধ্যেই সম্প্রতি দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা সামনে এসেছে। এর মধ্যে নজরুল ইসলাম আব্দুল বশিরকে ২০২৩ সালের ১ আগস্ট তথ্যপ্রযুক্তি-সংক্রান্ত (সাইবার) অপরাধের অভিযোগে আটক করে জেদ্দার একটি সংশোধনাগারে রাখা হয়েছিল। তাঁর বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। অন্যদিকে, টাঙ্গাইলের বাসিন্দা সুইটি আক্তারকে ২০২৩ সালের ২ আগস্ট ব্যভিচারের অভিযোগে গ্রেপ্তার করে জেদ্দার নারী কারাগারে বন্দি রাখা হয়। সৌদি আরবের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১৪ অক্টোবর মক্কা অঞ্চলে তা’জির হিসেবে তাঁদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
এই বিচার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়েও বড় ধরনের প্রশ্ন রয়ে গেছে। সৌদি কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশ সরকারকে সেদেশের কারাগারে থাকা বাংলাদেশিদের একটি তালিকা দিলেও তাতে এই দুজনের মৃত্যুদণ্ডের বিষয়টি উল্লেখ ছিল না। দণ্ড কার্যকরের পর গণমাধ্যমের সংবাদ থেকে জেদ্দার বাংলাদেশ কনস্যুলেট বিষয়টি জানতে পারে। কখন কীভাবে তাঁদের বিচার সম্পন্ন হলো, সে সম্পর্কে দণ্ডিতদের স্বজনেরা বা বাংলাদেশ দূতাবাসের কোনো প্রতিনিধি কিছুই জানতে পারেননি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁদের নবদম্পতি দাবি করে পবিত্র স্থানে অনৈতিক আচরণের যে প্রচার চালানো হয়েছিল, তা তথ্যপ্রমাণ ও পরিবারের দেওয়া তথ্যে ভুল প্রমাণিত হয়েছে। জানা গেছে, তাঁরা একে অপরকে চিনতেন না এবং তাঁদের বিরুদ্ধে ভিন্ন ভিন্ন গুরুতর নৈতিক ও সাইবার অপরাধের অভিযোগ ছিল, যার বিশদ বিবরণ জনসমক্ষে আনা হয়নি।
সৌদি বিচার ব্যবস্থায় শরিয়া আইন অনুযায়ী ব্যভিচারের ক্ষেত্রে কঠোর দণ্ডের বিধান রয়েছে, যেখানে চারজন প্রত্যক্ষদর্শী কিংবা চারবার নিজ মুখে অপরাধ স্বীকারের বাধ্যবাধকতা থাকে। স্বীকারোক্তির অভাব হলে বিচারকের এখতিয়ার বা তাজিরের আওতায় কারাদণ্ড, জরিমানা বা অন্যান্য শাস্তি দেওয়া হতে পারে। তবে আইনি ব্যবস্থার এই বাধ্যবাধকতা ও সামাজিক নিয়মের কারণে গৃহকর্মী হিসেবে যাওয়া বাংলাদেশি নারীরা চরম ভোগান্তিতে পড়েন। পুরুষ অভিভাবক (ওয়ালী) ছাড়া বাইরে বের হওয়ার ওপর সামাজিক ও আইনি কড়াকড়ি এবং সাক্ষী প্রমাণের জটিলতার কারণে নির্যাতনের শিকার নারীরা কোনো আইনি আইনি প্রতিকার পান না। যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নারীদের গাড়ি চালানো বা ভ্রমণের ক্ষেত্রে কিছু সংস্কার হয়েছে, তবুও মূল অভিভাবকত্ব প্রথার প্রভাব এখনো বিদ্যমান।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সৌদি আরব থেকে দেশে ফেরত আসা বাংলাদেশি নারী কর্মীদের ৯০ থেকে ৯৪ শতাংশই শারীরিক, মানসিক কিংবা যৌন নির্যাতনের শিকার হন। বিভিন্ন গবেষণায় সৌদির পারিবারিক বা গার্হস্থ্য সহিংসতার হার ৫৭ দশমিক ৮ থেকে ৮৭ শতাংশ পর্যন্ত উঠে এসেছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিদেশ থেকে ফেরত আসা ১ হাজার ৬৮৭ জন বাংলাদেশি নারী কর্মীর মধ্যে ৯৭৯ জনই (৫৮ দশমিক ৬২ শতাংশ) সৌদি আরব থেকে ফিরেছেন। মূলত নির্যাতন, বৈষম্য এবং নিরাপত্তাহীন কর্মপরিবেশই তাঁদের ফিরে আসার প্রধান কারণ।
সামাজিক ও পারিবারিক জীবনের ক্ষেত্রেও সৌদিতে বড় ধরনের পরিবর্তন ও সংকট দেখা যাচ্ছে। ২০২৫ সালের একটি বেসরকারি বিশ্ব সমীক্ষা অনুযায়ী, দেশটিতে বিবাহিত ব্যক্তিদের মধ্যে পরকীয়ার আনুমানিক হার প্রায় ১৭ শতাংশ, যদিও প্রাতিষ্ঠানিক উপাত্তের অভাবে এর শতভাগ সত্যতা নিশ্চিত করা যায় না। তবে দেশটির আইন মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান বলছে, চলতি ২০২৬ সালে প্রায় ৫৭ হাজার ৫৯৫টি বিবাহবিচ্ছেদের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে, যা দিনে গড়ে ১৫৭টি এবং প্রতি নয় মিনিটে একটি। বিবাহ বা বিচ্ছেদের ক্ষেত্রে এখনো পুরুষ অভিভাবকের সম্মতি প্রয়োজন হয় এবং বিচ্ছেদের পর সন্তানের আইনি অভিভাবকত্ব কিংবা সম্পত্তি বা উত্তরাধিকার আইনের ক্ষেত্রে নারীরা পুরুষের সমান অধিকার পান না।
প্রবাসীদের শ্রম অধিকারের ক্ষেত্রেও 'কাফালা' বা কফিল প্রথা বড় একটি বাধা হিসেবে রয়ে গেছে। এই ব্যবস্থার কারণে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের লাখ লাখ প্রবাসী শ্রমিক নিয়োগকর্তা বা স্পন্সরদের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। কম বেতন দেওয়া, অতিরিক্ত খাটানো, পাসপোর্ট আটকে রাখা কিংবা শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের মতো শোষণের শিকার হতে হয় প্রবাসীদের। বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও নিয়ন্ত্রণমূলক কাঠামোর কারণে প্রবাসীদের মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন ঘটছে বলে মানবাধিকার সংগঠনগুলো মত প্রকাশ করছে।
অবিবাহিত ব্যক্তির ক্ষেত্রে সাধারণত ১০০ দোররা বা বেত্রাঘাতের বিধান রয়েছে। তবে, আদালতের বিচারিক ক্ষমতা (তাজির) ও অপরাধের ধরনের ওপর ভিত্তি করে কারাদণ্ড, জরিমানা বা অন্যান্য শাস্তির প্রয়োগও ঘটে। এখানে একটা ফাকও রয়েছে, যেমন- শরিয়া আইন অনুযায়ী ব্যভিচার প্রমাণ করতে হয় চারজন প্রত্যক্ষদর্শী অথবা চারবার নিজের স্বীকারোক্তির মাধ্যমে। অর্থ্যাৎ দোষী ব্যক্তি যদি চারবার স্বীকার করেন তিনি দোষ করেছেন তাহলে তা সত্য হিসাবে প্রমাণিত হবে। এই ফাঁকটা বলছি, বাংলাদেশসহ পৃথিবীর উন্নয়শীল দেশের নারীরা সৌদি আরবে যান গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করতে। তারা প্রতিনিয়ত সেখানে যৌন হয়রানীর শিকার হচ্ছেন। শোনা যায়, একবার গৃহকর্তার হাতে, আরেকবার গৃহকর্তার ছেলের হাতেও একই নারীকর্মী ধর্ষিত হন। কিন্তু সে বিচার চাইতে পারে না বা বিচার পায় না।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মাহের আহমেদ, প্রধান সম্পাদক: মোঃ মোত্তালিব সরকার। প্রকাশক কর্তৃক ৫৫০বি, হজ্জ ক্যাম্প রোড, আশকোনা, দক্ষিণখান, ঢাকা-১২৩০, বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত। সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় (ঢাকা) : ৫৫০বি, হজ্জ ক্যাম্প রোড, আশকোনা, দক্ষিণখান, ঢাকা-১২৩০, বাংলাদেশ। আঞ্চলিক কার্যালয় (বগুড়া): টোলারগেট, শেরপুর–৫৮৪০, শেরপুর, বগুড়া। অফিস: ০১৭৭৬-১৩৬০৫০ (হোয়াটসঅ্যাপ), বিজ্ঞাপন: ০৯৬৯৭-৫৪৪৮২৭। ই-মেইল: dailyjokhonsomoy@gmail.com।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রনালয়ের বিধি মোতাবেক নিবন্ধনের জন্য আবেদিত ©সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © দৈনিক যখন সময় ২০২২