Header Premium (728×90)

Categories: মতামত

স্বাধীন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তর ও ‘প্রজাতন্ত্র’ ধারণার ঐতিহাসিক পর্যালোচনা

সেনাবাহিনীতে বক্সিংয়ের মতো নানা 'পুরুষোচিত' খেলায় বাঙালি সৈন্য ও কর্মকর্তাদের সাফল্য এবং ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পাঞ্জাব ফ্রন্টে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বিপুল শৌর্য প্রমাণের পরও পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকশ্রেণি বাঙালিদের 'অযোদ্ধা জাতি' হিসেবে আখ্যায়িত করে রেখেছিল। সামরিক বাহিনীতে বাঙালি নিয়োগ সংকুচিত রাখা ছিল পূর্ব পাকিস্তানের বিরুদ্ধে পাঞ্জাব-প্রভাবিত পশ্চিম পাকিস্তানের দীর্ঘ বৈষম্যমূলক রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক নীতিরই সম্প্রসারণ। তবে ব্রিটিশ ও পাকিস্তানি শাসকশ্রেণির এই বর্ণবাদী অপপ্রচারের অন্তঃসারশূন্যতা ১৯৭১ সালে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়। বাঙালি মেজরদের নেতৃত্বে অল্প প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত অকুতোভয় তরুণ মুক্তিযোদ্ধারা নয় মাসের সমন্বিত গেরিলা আক্রমণ ও সম্মুখ সমরের মাধ্যমে অবাঙালি জেনারেলদের অধীনস্থ সুপ্রশিক্ষিত পাকিস্তান বাহিনীকে পর্যুদস্ত করে স্বাধীন বাংলাদেশের উত্থান নিশ্চিত করেন।

পাকিস্তান সৃষ্টির ২৪ বছরের মাথায় বাংলাভাষী পূর্বাঞ্চল বাংলাদেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করায় বাংলা ভাষা উর্দুর আগ্রাসী প্রভাব থেকে মুক্ত হয়। অন্যদিকে, আধুনিক বাংলা ভাষার বিকাশে কলকাতাকেন্দ্রিক হিন্দু বুদ্ধিজীবীদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান সত্ত্বেও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের জনগণকে হিন্দির ক্রমবর্ধমান আগ্রাসনের মুখে নিজের ভাষা রক্ষায় হিমশিম খেতে হচ্ছে। একটি সশস্ত্র জনযুদ্ধের মাধ্যমে উত্থিত বাংলাদেশে বাংলা ভাষার গণতান্ত্রিক মুক্তি সাধিত হওয়াই ছিল স্বাভাবিক প্রত্যাশা। পাশাপাশি, যেসব জনগোষ্ঠী নিজেদের ভাষা ও সংস্কৃতির জন্য জীবন দিতে পারে, তারা অন্যান্য ভাষাভাষীদের অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকবে—এমন নৈতিক প্রত্যাশাও যুক্তিসঙ্গত ছিল। বিশেষ করে চাকমা, মার্মা, গারো ও ত্রিপুরাসহ বিভিন্ন সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর সদস্যরাও স্বাধীনতাযুদ্ধে বাঙালি মুক্তিযোদ্ধাদের পাশাপাশি অংশগ্রহণ করেছিলেন।

মুক্তিযুদ্ধের সময় গঠিত প্রবাসী আওয়ামী লীগ সরকারের ১৯৭১ সালের ১০ই এপ্রিলের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে এবং পরদিন প্রচারিত প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের বেতার ভাষণে স্বাধীন বাংলাদেশে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়পরায়ণতাভিত্তিক গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার স্পষ্ট অঙ্গীকার করা হয়েছিল। কিন্তু স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রগঠন প্রক্রিয়ায় সেই ধারার ব্যত্যয় ঘটে। একটি যথার্থ গণতান্ত্রিক রিপাবলিক বা সাধারণতন্ত্র কেবল জনগণের 'সাধারণ ইচ্ছা'র ভিত্তিতে রচিত সামাজিক চুক্তিরূপী সংবিধানের অধীনে পরিচালিত হয়, যেখানে সার্বভৌমত্ব জনগণের হাতে ন্যস্ত থাকে এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে দায়বদ্ধ থাকে। এমন রাষ্ট্রে জনগণ মর্যাদাবান 'নাগরিক' হিসেবে স্বীকৃত হন, কোনো ঔপনিবেশিক শক্তির 'প্রজা' বা সাবজেক্ট হিসেবে নয়।

স্বাধীনতার পর সংবিধান রচনার ক্ষেত্রে তৎকালীন লীগ সরকার নিজেদের দলীয় প্রতিনিধি ছাড়া অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণের সুযোগ দেয়নি। ফলে সংবিধানটি সমগ্র জনগণের 'সাধারণ ইচ্ছা'র প্রতিফলনে সামাজিক চুক্তি হয়ে উঠতে পারেনি। এর মূল কারণ ছিল তৎকালীন রাজনৈতিক নেতৃত্বের মননে উপনিবেশবাদের অবশেষ থেকে যাওয়া। 'পিপলস রিপাবলিক' শব্দের অনুবাদ হিসেবে 'গণতান্ত্রিক সাধারণতন্ত্র' ব্যবহার না করে তারা 'গণপ্রজাতন্ত্রী' শব্দটি চয়ন করেন। এর মাধ্যমে স্বাধীন দেশের নাগরিকদের পরোক্ষভাবে 'প্রজা' হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ইতিহাসের বিচারে এই 'প্রজা' ধারণাটি ছিল অত্যন্ত অধস্তন মর্যাদার। অষ্টাদশ শতকে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকশ্রেণি চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমে যে জমিদার শ্রেণি গড়ে তুলেছিল, তারা কৃষকদের 'প্রজা' বলত। কৃষকরা ছিল ব্রিটিশ রাজার প্রজারও প্রজা। অথচ স্বাধীনতাযুদ্ধের অধিকাংশ স্বাধীনতাকামীই ছিলেন কৃষক বা কৃষকের সন্তান। স্বাধীন বাংলাদেশে সেই কৃষকদেরই নাগরিক মর্যাদার পরিবর্তে প্রজার পুরনো অধস্তন মর্যাদায় রাখা হয় এবং ব্রিটিশ ও পাকিস্তানি আমলের জনস্বার্থবিরোধী আইনগুলো বহাল রেখে যাত্রা শুরু হয়।

পরবর্তীকালে আওয়ামী লীগ ও তার অনুসারী বুদ্ধিজীবীরা গণ-আন্দোলন ও জনযুদ্ধের ইতিহাস নিজেদের দখলে নিয়ে অপরাপর দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক দল ও সাধারণ মানুষকে ইতিহাস থেকে বাদ দেওয়ার প্রয়াস চালায়। মুক্তিযুদ্ধের একক দাবিদার হয়ে স্বৈরতান্ত্রিক রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার এই উদ্যোগ শুরুতেই সর্বাঙ্গীণ গণতান্ত্রিক বিকাশের পথকে কণ্টকাকীর্ণ করে তোলে। এতদসত্ত্বেও, ১৯৭২ সালের সংবিধানে অনুচ্ছেদ ৩-এর মাধ্যমে বাংলা ভাষাকে 'রাষ্ট্রভাষা' হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়া হয়। তবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি মিললেও রাষ্ট্রীয় প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড, উচ্চ আদালতের আইনি তর্ক-বিতর্ক ও রায় প্রদান এবং উচ্চশিক্ষায় এখনো ইংরেজি ভাষার মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান জারি রয়েছে, ফলে রাষ্ট্রীয় পরিসরে বাংলা ভাষা এখনো তার পূর্ণ মর্যাদা পায়নি।

এসব উপনিবেশবাদী অপতৎপরতা সত্ত্বেও, স্বাধীন বাংলাদেশের যাত্রার শুরুতে, নিকট ইতিহাসের চাপে, বাংলাভাষা যথাযোগ্য রাজনৈতিক মর্যাদায় অভিষিক্ত হয়েছিল বইকি। ১৯৭২ সালে প্রণীত বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সংবিধান বাংলাকে ‘রাষ্ট্রভাষা’ হিসেবে ঘোষণা করে, যা এখনো সংবিধানে লিপিবদ্ধ রয়েছে।২৭৯কিন্তু এই সাংবিধানিক স্বীকৃতি সত্ত্বেও, রাষ্ট্রীয় পরিসরের ভাষা হিসেবে বাংলা কখনোই যথার্থ মর্যাদা লাভ করেনি— রাষ্ট্রীয় প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে, উচ্চ আদালতে আইনি তর্ক-বিতর্ক পরিচালনায়ও রায় প্রদানে, কিংবা উচ্চশিক্ষা চর্চায় এখনো ইংরেজি ভাষারই মর্যাদাবান অবস্থান জারি রয়েছে। তথ্যসূত্র:২৭৮. দেখুন, The Proclamation of Independence, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ : দলিলপত্র, তৃতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা : ৪-৫ ও প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের বেতার ভাষণ, প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা : ৭-১১২৭৯. দেখুন, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান, ১৯৭২, অনুচ্ছেদ ৩

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Manab Zamin

Recent Posts

সাতক্ষীরায় হাসপাতালে ঢুকে পিটুনি, চিকিৎসাধীন যুবকের মৃত্যু

সাতক্ষীরার দেবহাটায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে দুই দফায় মারধরের শিকার ওহিদুজ্জামান শামীম নামে এক যুবকের হাসপাতালে…

3 minutes ago

২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আরও ৭ জনের মৃত্যু, ভর্তি ২০৮৮ রোগী

দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় আরও ৭ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং বিভিন্ন হাসপাতালে…

23 minutes ago

কুয়েতের গৃহকর্মীর ৮৬.১ শতাংশই বাংলাদেশসহ এশিয়ার ৪ দেশের

কুয়েতের পাবলিক অথরিটি ফর সিভিল ইনফরমেশন (পিএসিআই) এর সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, কুয়েতে কর্মরত মোট গৃহকর্মীর…

26 minutes ago

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান রাষ্ট্রপতির

শারদীয় দুর্গোৎসব ও বিজয়া দশমী উপলক্ষে ঢাকার রমনা কালীমন্দির পরিদর্শনকালে রাষ্ট্রপতি দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায়…

43 minutes ago

আলবেনিয়ায় সরকারবিরোধী বিক্ষোভ, পুলিশের সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষ

আলবেনিয়ার রাজধানী তিরানায় টানা পঞ্চম দিনের মতো সরকারবিরোধী বিক্ষোভ চলছে। প্রধানমন্ত্রী এদি রামার পদত্যাগ ও…

46 minutes ago

২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গে ৭ ও ডেঙ্গুতে ৪ জনের মৃত্যু

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গে সাত শিশু এবং…

1 hour ago

This website uses cookies.