
ভারতের রাজধানী দিল্লিতে নাটকীয় পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে তীব্র আন্দোলন ও ধরপাকড় চলছে। শনিবার সকাল থেকে ধ্রুব রাঠির আটকের মধ্য দিয়ে দিনটি শুরু হয়। এর পরপরই আটক করা হয় অভিজিৎ দীপকে, সৌরভ দাস, আশুতোষ রাঙ্কার ও নেহা বোরাকে। তবে শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত নেহা বোরাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। সন্ধ্যা নাগাদ আন্দোলনরত ‘ককরোচ’ আন্দোলনের একাধিক নেতাসহ সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের প্রধান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং আম আদমি পার্টির প্রধান অরবিন্দ কেজরিওয়ালকে আটক করা হয়। একই সঙ্গে প্রায় সাত হাজারের কাছাকাছি আন্দোলনকারীকে আটক করা হয়েছে। ভোটার তালিকা থেকে বেআইনিভাবে ১৩ কোটির বেশি নাগরিকের নাম বাদ দেওয়ার অভিযোগে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারকে কারাবন্দী করার দাবি জানিয়ে তাঁরা যন্তর-মন্তরের দিকে যাত্রা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। এ পরিস্থিতি নরেন্দ্র মোদির জন্য নতুন রাজনৈতিক দুশ্চিন্তা তৈরি করেছে।
কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী বর্তমান পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে বলেছেন, দিল্লি এখন আক্ষরিক অর্থেই অবরুদ্ধ এবং সারা দেশ যেন এক কয়েদখানায় পরিণত হয়েছে, যা ১৯৭৫ সালের জরুরি অবস্থার স্মৃতি ফিরিয়ে আনছে। বাস্তবেও দিল্লিতে সাধারণ মানুষের আসা-যাওয়া প্রায় বন্ধ রয়েছে। মেেইল ট্রেন, মেট্রো রেল ও বাস চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এবং বিপুল এলাকা জুড়ে ইন্টারনেট পরিষেবা বিচ্ছিন্ন করার পাশাপাশি ১৬৩ ধারা জারি করা হয়েছে। মোদি সরকার ও ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সমর্থকেরা আন্দোলনকারীদের ‘দেশদ্রোহী’ বলে আখ্যা দিলেও সরকারের তরফ থেকে কোনো সুনির্দিষ্ট সদুত্তর দেওয়া হয়নি। তা সত্ত্বেও জেনজি তরুণদের সঙ্গে অভিভাবক, বুদ্ধিজীবী ও তারকারা রাজপথে নেমে এসেছেন এবং দেয়াল জুড়ে ‘ভোট চোর গদ্দি ছোড়’ গ্রাফিতি আঁকা হচ্ছে।
এই পুরো দৃশ্যপট ২০২৪ সালের জুলাইয়ে বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া গণ-অভ্যুত্থানের চিত্র স্মরণ করিয়ে দেয়। বাংলাদেশে কোটা সংস্কার আন্দোলন নিয়ে ক্ষোভের সূচনা হলেও ভারতে এর সূত্রপাত হয় মেডিকেলের প্রশ্নপত্র বা নিট (NEET) পেপার ফাঁসকে কেন্দ্র করে। প্রশ্ন ফাঁসের প্রতিবাদে তরুণেরা মাঠে নামলে ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত ভরা আদালতে তাঁদের ‘ককরোচ’ বা তেলাপোকা বলে মন্তব্য করেন। তরুণেরা এই অপমানকে ক্ষোভের প্রতীকে রূপ দিয়ে নিজেদের ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) গঠন করে রাস্তায় নেমে পড়েন। ঘটনাটি তৎকালীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘রাজাকারের নাতিপুতি’ মন্তব্যের পর তরুণদের দেওয়া পাল্টা স্লোগানের তীব্রতার কথা মনে করিয়ে দেয়। আন্দোলনের মুখে মোদির ঘনিষ্ঠ শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেছিলেন। এর কিছুদিন পর সিইসি জ্ঞানেশ কুমারের ভোট জালিয়াতির খবর সামনে আসতেই সুপ্ত ক্ষোভ নতুন করে বিস্ফোরিত হয়।
আন্দোলন দমন করতে সরকার দিল্লি মেট্রোর ৫৭টি স্টেশন বন্ধ করে দিলে, সরকারের সেই সিদ্ধান্তের শুনানিতে প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্তের বেঞ্চ মন্তব্য করেন, মাছি মারতে হাতুড়ি চালানো যায় না। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ক্ষমতাশীনরা প্রায়শই ভুলে যান যে শব্দের রাজনৈতিক জীবন রয়েছে এবং অপমানজনক শব্দ ক্ষোভের সঙ্গে মিশে প্রতিবাদের প্রতীকে পরিণত হতে পারে। একই সঙ্গে বিজেপি নেতারা প্রধান নির্বাচন কমিশনারের ভোট জালিয়াতির অভিযোগ নিয়ে নিরব থেকে আন্দোলনকারীদের পেছনে ইলন মাস্কের অর্থায়ন বা পশ্চিমা ‘ডিপ স্টেট’-এর হাত রয়েছে বলে দাবি করছেন, যা বাংলাদেশে আন্দোলনের সময় বাইরের দেশের কারসাজি বলে দাবি করার চেষ্টার অনুরূপ।
বাংলাদেশের আন্দোলনের সঙ্গে ভারতের চলমান প্রতিবাদের একটি মৌলিক মিল রয়েছে—উভয় ক্ষেত্রেই তরুণদের একটি সুনির্দিষ্ট দাবি থেকে অসন্তোষের সূচনা হলেও রাষ্ট্রের কঠোর প্রতিক্রিয়া একে বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রশ্নে রূপ দিয়েছে। তবে বাংলাদেশের আন্দোলনে ব্যাপক প্রাণহানি ও সহিংসতার ঘটনা ঘটলেও দিল্লিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এখন পর্যন্ত পেশাদারির সঙ্গে পরিস্থিতি সামলাচ্ছে এবং সেখানে এখন পর্যন্ত কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। তবে দক্ষিণ এশিয়ার শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ, নেপাল ও ভারতের পরিস্থিতি পর্যালোচনা করলে স্পষ্ট হয় যে সামাজিক ক্ষোভ থেকে কোনো সরকারই পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন নয়। ২০১৪ সালে সরকারপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে নরেন্দ্র মোদি কখনো মুখোমুখি সংবাদ সম্মেলন করেননি, আর এই আন্দোলন মোদির সেই পলায়নপর বা অজেয় ভাবমূর্তির সত্যতা প্রকাশের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে।
ইমেইল: sarfuddin2003@gmail.com *মতামত লেখকের নিজস্ব।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মাহের আহমেদ, প্রধান সম্পাদক: মোঃ মোত্তালিব সরকার। প্রকাশক কর্তৃক ৫৫০বি, হজ্জ ক্যাম্প রোড, আশকোনা, দক্ষিণখান, ঢাকা-১২৩০, বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত। সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় (ঢাকা) : ৫৫০বি, হজ্জ ক্যাম্প রোড, আশকোনা, দক্ষিণখান, ঢাকা-১২৩০, বাংলাদেশ। আঞ্চলিক কার্যালয় (বগুড়া): টোলারগেট, শেরপুর–৫৮৪০, শেরপুর, বগুড়া। অফিস: ০১৭৭৬-১৩৬০৫০ (হোয়াটসঅ্যাপ), বিজ্ঞাপন: ০৯৬৯৭-৫৪৪৮২৭। ই-মেইল: dailyjokhonsomoy@gmail.com।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রনালয়ের বিধি মোতাবেক নিবন্ধনের জন্য আবেদিত ©সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © দৈনিক যখন সময় ২০২২