
একটি শক্তিশালী ও মানবিক সরকার কেবল ক্ষমতার কঠোর প্রয়োগে নয়, বরং আইন প্রয়োগে দৃঢ়তা, নিজের ভুল স্বীকারের সততা এবং নাগরিকের প্রতি সংযত আচরণের মাধ্যমে গড়ে ওঠে। যে সরকার সমালোচককে ভয় দেখাতে পারে কিন্তু চাঁদাবাজকে থামাতে পারে না, তার ক্ষমতা থাকলেও কার্যকর কর্তৃত্ব থাকে না। বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, চাঁদাবাজি বন্ধ এবং জনগণের আস্থা অর্জনে সুনির্দিষ্ট কিছু সংস্কারের প্রস্তাব করেছেন ব্রুনেই দারুসসালাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও অভিবাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. এ কে এম আহসান উল্লাহ।
২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির ফলে সাধারণ পরিবার ও ব্যবসায়িক ব্যয়ের ওপর চাপ বেড়েছে এবং জ্বালানিসংকটের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা ও চাঁদাবাজি নিয়ে উদ্বেগ দূর করা বর্তমান সরকারের জন্য বড় পরীক্ষা। অতীতের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার দোহাই দিয়ে বর্তমান সরকার নিজের দায়িত্ব এড়াতে পারে না। মানুষ মূলত বিচার করে তাদের বর্তমান জীবন কতটা নিরাপদ ও স্বস্তির।
প্রথম সাহসী পদক্ষেপটি আসতে হবে সরকারি দল থেকেই। প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় নেতৃত্বকে যৌথভাবে ঘোষণা করতে হবে যে, দলীয় পরিচয় কোনো অপরাধের ঢাল হবে না। পরিবহন টার্মিনাল, বাজার, নির্মাণকাজ ও স্থানীয় ব্যবসাকে ঘিরে চাঁদাবাজির অভিযোগ তদন্তে একটি স্বাধীন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেলে অভিযুক্তদের তদন্ত চলাকালে দলীয় দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দিতে হবে, তবে অভিযোগ প্রমাণিত না হলে সম্মান পুনরুদ্ধারের পথও রাখতে হবে। গ্রেপ্তারের ছবি প্রকাশ নয়, বরং তদন্ত ও বিচারের অগ্রগতি প্রকাশই হবে সাফল্যের মাপকাঠি।
দ্বিতীয়ত, প্রতিটি থানাকে জনসেবার দৃশ্যমান প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করতে হবে। থানায় অভিযোগ গ্রহণের রসিদ প্রদান বাধ্যতামূলক করতে হবে, যাতে অভিযোগকারী ফোন, সরাসরি অথবা সহজ অনলাইন ব্যবস্থার মাধ্যমে অগ্রগতির খোঁজ নিতে পারেন। নির্দিষ্ট সময়ে অভিযোগ নথিভুক্ত না হলে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছে চলে যাবে। প্রতি মাসে জেলাভিত্তিক অভিযোগের সংখ্যা, তদন্ত ও নিষ্পত্তির হার এবং পুলিশের আচরণের বিরুদ্ধে আসা অভিযোগের বিবরণ প্রকাশ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে পুলিশকে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও কাজের পরিবেশ দিয়ে বেআইনি বলপ্রয়োগ ও ঘুষের নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে।
তৃতীয় পদক্ষেপ হিসেবে চাঁদাবাজির অর্থনৈতিক উৎস বন্ধ করতে হবে। শুধু কয়েকজন আদায়কারীকে গ্রেপ্তার না করে পুরো ব্যবস্থাটি শনাক্ত করা জরুরি। টার্মিনাল ও বাজারে অনুমোদিত ফি প্রকাশ্যে টাঙিয়ে এবং সম্ভব হলে রসিদসহ ডিজিটাল পরিশোধের ব্যবস্থা চালু করতে হবে। ব্যবসায়ীরা যাতে নিরাপদে অভিযোগ করতে পারেন এবং এরপর তাদের ব্যবসা ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়, সেই দায়িত্ব প্রশাসনকে নিতে হবে। কোনো এলাকায় একই অভিযোগ বারবার উঠলে সংশ্লিষ্ট পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকা পর্যালোচনা করা উচিত।
অর্থনীতিতে দৃঢ়তা দেখাতে সরকারকে কঠিন সত্য বলার সাহস রাখতে হবে। জ্বালানির আন্তর্জাতিক মূল্যের প্রভাব ও সরকারি ব্যয়ের চাপ জনগণকে স্পষ্ট জানানো প্রয়োজন। সীমিত সরকারি অর্থ দিয়ে সবার জন্য ঢালাও ছাড় দেওয়ার বদলে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত নিম্ন আয়ের পরিবার ও ছোট উৎপাদকদের লক্ষ্য করে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সহায়তা দেওয়া বেশি যুক্তিসংগত। এছাড়া ‘১০০ দিনের সরকারি সেবা পরীক্ষা’ চালুর মাধ্যমে জন্মনিবন্ধন, নামজারি বা ব্যবসার অনুমতির মতো সেবাগুলোর সময় ও খরচ নির্ধারণ করে দিয়ে সাপ্তাহিক অগ্রগতি প্রকাশ করা যেতে পারে।
মানবিক সরকারের আরেকটি বড় পরীক্ষা হলো ভিন্নমতকে দেখার দৃষ্টি। বিরোধী দল, সাংবাদিক, শ্রমিক, শিক্ষার্থী বা অধিকারকর্মীর সমালোচনা শুনলে সরকার দুর্বল হয় না, বরং নীতির ত্রুটিগুলো আগেভাগে জানতে পারে। শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের নিরাপত্তা দেওয়া এবং সহিংসতার অভিযোগের ক্ষেত্রে প্রমাণের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব। দলীয় আনুগত্য দেখে আইনের প্রয়োগ বদলে গেলে মানুষ রাষ্ট্রের ন্যায্যতাকেই সন্দেহ করতে শুরু করে।
সরকার প্রতি তিন মাসে একটি সংক্ষিপ্ত ‘জন-আস্থার হিসাব’ প্রকাশ করতে পারে, যেখানে নিত্যপণ্যের দাম, জ্বালানি সরবরাহ, চাঁদাবাজির অভিযোগ ও নিষ্পত্তি, পুলিশি আচরণের অভিযোগ এবং কর্মসংস্থানের সূচক থাকবে। লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হলে মন্ত্রীরা তার ব্যাখ্যা দেবেন। ভুল স্বীকার করে তা সংশোধনের পথ দেখালে দীর্ঘস্থায়ী বিশ্বাস তৈরি হয়। বাংলাদেশের মানুষ সর্বক্ষমতাবান সরকার চায় না, বরং এমন একটি মানবিক রাষ্ট্র চায় যেখানে ক্ষমতার অপব্যবহারকারীকেও জবাবদিহি করতে হয় এবং সাধারণ মানুষের অধিকার সুরক্ষিত থাকে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মাহের আহমেদ, প্রধান সম্পাদক: মোঃ মোত্তালিব সরকার। প্রকাশক কর্তৃক ৫৫০বি, হজ্জ ক্যাম্প রোড, আশকোনা, দক্ষিণখান, ঢাকা-১২৩০, বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত। সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় (ঢাকা) : ৫৫০বি, হজ্জ ক্যাম্প রোড, আশকোনা, দক্ষিণখান, ঢাকা-১২৩০, বাংলাদেশ। আঞ্চলিক কার্যালয় (বগুড়া): টোলারগেট, শেরপুর–৫৮৪০, শেরপুর, বগুড়া। অফিস: ০১৭৭৬-১৩৬০৫০ (হোয়াটসঅ্যাপ), বিজ্ঞাপন: ০৯৬৯৭-৫৪৪৮২৭। ই-মেইল: dailyjokhonsomoy@gmail.com।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রনালয়ের বিধি মোতাবেক নিবন্ধনের জন্য আবেদিত ©সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © দৈনিক যখন সময় ২০২২