
‘নাজা’—এবারের ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত ৮০ মিনিটের এক রোমহর্ষক প্রামাণ্যচিত্র, যা নির্মাণ করেছেন অস্কারজয়ী ইসরায়েলি চলচ্চিত্র নির্মাতা ও সাংবাদিক ইউভাল আব্রাহাম ও র্যাচেল সোর। তথ্যচিত্রটি উৎসবে ‘স্পেশাল জুরি প্রাইজ’ জয় করেছে। ছবিটি দেখে ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবের দর্শকেরা ২৫ মিনিট ধরে দাঁড়িয়ে সম্মান (স্ট্যান্ডিং ওভেশন) জানিয়েছেন, যা এযাবৎকালের দীর্ঘতম।
‘নাজা’ নামটি এসেছে ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থার ব্যবহৃত একটি হিব্রু পরিভাষা থেকে। কোনো মিসাইল, ড্রোন বা বিমান হামলায় কতজন ‘কোলাটেরাল ড্যামেজ’ বা বেসামরিক নাগরিকের প্রাণহানি হতে পারে বলে ধারণা করা হয়, তা বোঝাতে এই শব্দটি ব্যবহার করা হয়। এই প্রামাণ্যচিত্রটি ২৪ জন ইসরায়েলি সেনা ও কর্মকর্তার সাক্ষাৎকারের ওপর ভিত্তি করে নির্মিত। নির্মাতাদের মতে, গাজায় যুদ্ধের সময় ব্যবহৃত বিভিন্ন পরিকল্পনা ও পরিচালন ব্যবস্থার সঙ্গে তাঁরা জড়িত ছিলেন। পরিচয় গোপন রাখার শর্তে তাঁরা বলেছেন, ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের ফলে বেসামরিক নাগরিকদের মধ্যে পরিকল্পিতভাবে ব্যাপক হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে। তাঁদের একজন বলেন, সেখানে ‘শিল্পকারখানায় উৎপাদনের মতো ব্যাপক হত্যাকাণ্ড’ চালানো হয়েছিল। সাক্ষাৎকারে তাঁরা বর্ণনা করেছেন যে তাঁদের মনে হতো তাঁরা যেন কোনো ‘হত্যাকাণ্ডের কারখানা’ বা প্রাণঘাতী ভিডিও গেমে কাজ করছেন।
আব্রাহাম এএফপিকে জানিয়েছেন, তাঁদের লক্ষ্য ছিল গাজায় হত্যাকাণ্ডের ব্যবস্থাগুলো দেখতে কেমন ছিল এবং সেগুলো কীভাবে কাজ করত—তা যতটা সম্ভব বিস্তারিতভাবে জানা। চলচ্চিত্রটি এমন একটি ব্যবস্থা উন্মোচন করে, যা অত্যন্ত দক্ষ। এর কার্যক্রম পরিকল্পিতভাবেই বিচ্ছিন্ন রাখা হয়, যাতে অপরাধীরা অপরাধের স্থান থেকে দূরে থাকতে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা লক্ষ্যবস্তু নির্বাচন করে এবং একটি ড্রোন বোমা ফেলে বা বিমান হামলা করার সংকেত পাঠায়। পরিচালকদের ভাষ্যমতে, অনেক সময় কর্তব্যরত সেনারা জানত যে যে বাড়িটিতে তারা বোমা ফেলছে, সেটি শিশুদের দ্বারা পূর্ণ।
তেল আবিবের কোনো এক বাড়ির ছাদে বসে কথা বলা নারী ও পুরুষেরা, যাঁদের কণ্ঠস্বর ও চেহারা ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে পরিবর্তন করা হয়েছে, তাঁরা ‘ল্যাভেন্ডার’ নামে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাচালিত একটি ব্যবস্থার বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন। এই ব্যবস্থাটি মূলত হত্যার লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করার কাজে ব্যবহৃত হতো। ল্যাভেন্ডার গাজায় পরিচালিত ব্যাপক নজরদারি কার্যক্রম থেকে প্রাপ্ত তথ্য ব্যবহার করে—যেখানে ইসরায়েল পুরো টেলিযোগাযোগব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ করে এবং ফোনকল, চলাফেরা ও পারস্পরিক যোগাযোগের ওপর ভিত্তি করে লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করে। সাক্ষাৎকারদাতারা বেসামরিক নাগরিকদের বাড়িঘর সুপরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করা, যুদ্ধ ও মানবিক আইনকে তোয়াক্কা না করা এবং ফিলিস্তিনিদের প্রতি ‘ঘৃণার’ এক ‘সামগ্রিক পরিবেশ’ থাকার কথা তুলে ধরেন।
লক্ষ্যবস্তু শনাক্তকরণের কাজে যুক্ত একজন সাক্ষাৎকারদাতা একপর্যায়ে বলেন, ‘এটা অনেকটা ভিডিও গেমের মতো, কারণ সবকিছুই দূর থেকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়।’ আরেকজন একে ‘অত্যন্ত আনন্দদায়ক’ হিসেবে বর্ণনা করেন। দূরবর্তী স্থান থেকে হামলা সম্পন্ন করার পর, সাধারণত ইসরায়েলি সেনারা উৎফুল্ল হয়ে বিভিন্ন ধ্বনি দিয়ে লাফিয়ে উঠত, যেমন—‘নাজা, নাজা, হোয়াট এ ফান, কী মজা কী মজা!’
ইসরায়েল অবশ্য এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা বলেছে, গাজায় বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি কমাতে তারা খুব সতর্ক ছিল। অবশ্য গাজাতে যে হারে মানুষ হত্যা করা হয়েছে, তাতে ইসরায়েলিদের ‘সতর্কতার’ সাফাই ফাঁপা শোনাবে। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৫ সালে গাজার নাসের হাসপাতালে হামলা চালিয়ে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী ২০ জন বেসামরিক লোককে হত্যা করে। ইসরায়েলিরা বলেছিল তাদের তথ্য অনুযায়ী সেখান থেকে ইসরায়েলি বাহিনীর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছিল। সেখানে পাঁচজন সাংবাদিক মৃত্যুবরণ করেন, তাঁদের প্রথমজন ছিলেন একজন রয়টার্সের সাংবাদিক।
গাজার হামাস-পরিচালিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ইসরায়েলের অব্যাহত বোমা হামলায় অন্তত ৭৩ হাজার ৬৫৮ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন; জাতিসংঘ এই মন্ত্রণালয়ের দেওয়া পরিসংখ্যানকে নির্ভরযোগ্য বলে মনে করে। এই তথ্যচিত্র নিয়ে ইসরায়েলে শোরগোল শুরু হয়ে গেছে। ‘নিউইয়র্ক টাইমস’ এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এমন একটি আইন প্রণয়নের আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে রাষ্ট্র আব্রাহাম ও সোরের নাগরিকত্ব বাতিল করতে পারবে। ইসরায়েলের ডানপন্থী রাজনীতিকেরা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে তাঁদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ তদন্ত করার অনুরোধ জানিয়েছেন। নিরাপত্তাবিষয়ক মন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরের নেতৃত্বাধীন কট্টর ডানপন্থী দলের কর্মী ও সমর্থকেরা সোরের বাবা-মায়ের বাড়ির সামনে বিক্ষোভ করেছেন; সেখানে এক বক্তা আব্রাহাম ও সোরের মৃত্যুদণ্ড এবং তাঁদের পরিবারের বাড়িঘর গুঁড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানান।
‘নাজা’র পরিচালকদ্বয় ইসরায়েলি হলেও, এটি একটি ব্রিটিশ ছবি এবং প্রোডিউসারের মধ্যে আছে বিখ্যাত ব্রিটিশ সংবাদপত্র ‘দ্য গার্ডিয়ান’। আব্রাহাম বলেছেন, এটি ‘দ্য গার্ডিয়ান’-এর একটি চলচ্চিত্র, যা একটি শীর্ষস্থানীয় প্রকাশনা সংস্থার সহযোগিতায় এবং এমন একদল সম্পাদকের মাধ্যমে তৈরি করা হয়েছে, যাঁদের কাছে মূল নথিপত্র বা তথ্য-উপাত্তের নাগাল ছিল। এতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয় যাচাই করা হয়েছে এবং তাঁরা যেসব ঘটনার কথা আলোচনা করেছেন, সেগুলোও যাচাই করে দেখা হয়েছে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মাহের আহমেদ, প্রধান সম্পাদক: মোঃ মোত্তালিব সরকার। প্রকাশক কর্তৃক ৫৫০বি, হজ্জ ক্যাম্প রোড, আশকোনা, দক্ষিণখান, ঢাকা-১২৩০, বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত। সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় (ঢাকা) : ৫৫০বি, হজ্জ ক্যাম্প রোড, আশকোনা, দক্ষিণখান, ঢাকা-১২৩০, বাংলাদেশ। আঞ্চলিক কার্যালয় (বগুড়া): টোলারগেট, শেরপুর–৫৮৪০, শেরপুর, বগুড়া। অফিস: ০১৭৭৬-১৩৬০৫০ (হোয়াটসঅ্যাপ), বিজ্ঞাপন: ০৯৬৯৭-৫৪৪৮২৭। ই-মেইল: dailyjokhonsomoy@gmail.com।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রনালয়ের বিধি মোতাবেক নিবন্ধনের জন্য আবেদিত ©সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © দৈনিক যখন সময় ২০২২