Header Premium (728×90)

Categories: মতামত

ইসরায়েলের ওপর ব্রিটেনের নিষেধাজ্ঞা আরোপের কারণ ও নেপথ্য ইতিহাস

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯১৭ সালের ২ নভেম্বর ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী আর্থার বালফোর ইহুদি নেতা লর্ড রথচাইল্ডকে মাত্র ৬৭ শব্দের একটি চিঠি লিখেছিলেন। ফিলিস্তিনে ইহুদিদের জন্য একটি জাতীয় আবাসভূমি প্রতিষ্ঠার প্রতি ব্রিটিশ সরকারের সমর্থনের এই দলিলটি ইতিহাসে ‘বালফোর ঘোষণা’ নামে পরিচিত। অটোমান সাম্রাজ্যের অধীনে থাকা তৎকালীন ফিলিস্তিনে আরব জনগোষ্ঠী সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও ইহুদিরা ছিল সংখ্যালঘু। এক শতাব্দীরও বেশি সময় পর সেই ব্রিটেনই এখন ইসরায়েলের কিছু নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে শুরু করেছে। পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণের বিরোধিতা, ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি এবং দুই রাষ্ট্র সমাধানের প্রতি নতুন করে জোর দেওয়ার বিষয়টি এখন বিশ্বরাজনীতিতে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে।

সম্প্রতি ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম ক্ষমতা গ্রহণের মাত্র দুই মাসের মাথায় ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কিছু নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এর আগে গত বছরের ২১ সেপ্টেম্বর ব্রিটেন ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এই নাটকীয় পরিবর্তনের নেপথ্যে শুধু ঐতিহাসিক অনুশোচনা কাজ করছে, নাকি বর্তমান আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতি বড় ভূমিকা রাখছে—তা নিয়ে শুরু হয়েছে নানা বিশ্লেষণ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় দুর্বল অটোমান সাম্রাজ্যের সুযোগ নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বাড়াতে চেয়েছিল ব্রিটেন। সে সময় তারা আরবদের বিদ্রোহের বিনিময়ে স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি দেয়, আবার অন্যদিকে বালফোর ঘোষণার মাধ্যমে ইহুদিদের আবাসভূমি গঠনে সমর্থন জানায়। একই সঙ্গে ১৯১৬ সালের সাইক্স-পিকো চুক্তির মাধ্যমে ফ্রান্সের সঙ্গে অটোমান ভূখণ্ড ভাগের পরিকল্পনা করে। ব্রিটেনের এই দ্বৈত নীতিই মূলত বর্তমান সংকটের ভিত্তি গড়ে দেয়।

১৯১৮ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ১৯২০ সালে লিগ অব ন্যাশনস ব্রিটেনকে ফিলিস্তিন শাসনের ম্যান্ডেট দেয়। এ সময় বিশ্বজুড়ে ইহুদিদের অভিবাসন বাড়তে থাকলে ফিলিস্তিনি আরবদের মধ্যে নিজেদের ভূমি ও রাজনৈতিক অধিকার হারানোর উদ্বেগ তৈরি হয়। ১৯৩৬ থেকে ১৯৩৯ সালের মধ্যে ফিলিস্তিনিদের তীব্র বিদ্রোহের পর সংঘাত কমাতে ১৯১৭ সালে ব্রিটিশ সরকার পিল কমিশন গঠন করে। এই কমিশনই প্রথম ফিলিস্তিনকে ভাগ করে দুটি পৃথক রাষ্ট্র গঠনের প্রস্তাব দেয়, যা দুই রাষ্ট্র সমাধানের প্রথম আন্তর্জাতিক রূপরেখা ছিল। তবে আরব ও ইহুদি কোনো পক্ষই তখন তা মেনে নেয়নি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসিদের হাতে ইহুদি গণহত্যার পর একটি ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবি জোরালো হয় এবং ১৯৪৭ সালে জাতিসংঘ ফিলিস্তিন বিভাজন পরিকল্পনা গ্রহণ করে, যেখানে জেরুজালেমকে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাপনায় রাখার কথা বলা হয়েছিল।

১৯৪৮ সালে ব্রিটিশ ম্যান্ডেট শেষ হওয়ার পরপরই ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয় এবং এর জের ধরে একে একে ১৯৫৬, ১৯৬৭, ১৯৭৩ ও ১৯৮২ সালে রক্তক্ষয়ী আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এতে লাখ লাখ ফিলিস্তিনি উদ্বাস্তু হয়ে পড়েন। বর্তমান ব্রিটিশ নীতিতে এই ঐতিহাসিক দায় যেমন রয়েছে, তেমনই গাজা যুদ্ধ, তীব্র মানবিক সংকট, আন্তর্জাতিক চাপ এবং দুই রাষ্ট্র সমাধানের ভবিষ্যৎ নিয়ে তৈরি হওয়া গভীর উদ্বেগ বড় প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে পশ্চিম তীরের ‘ই-১’ প্রকল্পের মতো বিতর্কিত বসতি কার্যক্রম নিয়ে ব্রিটেন গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। ১২ বর্গকিলোমিটার বা ৪ দশমিক6 বর্গমাইল আয়তনের এই বিতর্কিত অঞ্চলে ইতিমধ্যে ৩ হাজার ৪০০টি নতুন বাড়ি নির্মাণের অনুমোদন দিয়েছে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ।

ইসরায়েলের অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ ই-১ প্রকল্পকে ‘দুই রাষ্ট্র সমাধানকে কবর দেওয়ার’ পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করেছেন এবং প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও এই ভূমির ওপর ইসরায়েলের মালিকানা দাবি করেছেন। তবে ব্রিটেনের মতে, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে তা ভবিষ্যৎ ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের ভৌগোলিক সংযোগকে সম্পূর্ণ দুর্বল করে দেবে। এই আশঙ্কায় যুক্তরাজ্য সরকার ওই বসতি প্রকল্পের সঙ্গে জড়িত নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠান ও বিনিয়োগকারীর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়া বা বসতি স্থাপনের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপের মাধ্যমে ব্রিটেন একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক বার্তা দিলেও, দীর্ঘস্থায়ী শান্তির জন্য আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধা এবং উভয় জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। এক শতাব্দী আগের বালফোর ঘোষণা মধ্যপ্রাচ্যে যে সংকটের জন্ম দিয়েছিল, ব্রিটেনের বর্তমান নীতি পরিবর্তন তা দূর করতে কতটা ভূমিকা রাখবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

গাজা যুদ্ধ, মানবিক সংকট, আন্তর্জাতিক চাপ এবং দুই রাষ্ট্র সমাধানের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ ব্রিটিশ নীতিতে প্রভাব ফেলছে।.১৯৩০-এর দশকে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।

সংঘাত কমানোর লক্ষ্যে ব্রিটিশ সরকার ১৯৩৭ সালে পিল কমিশন গঠন করে।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo

Recent Posts

ফুডপান্ডার এমডিসহ ৫ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি

প্রতারণা, জালিয়াতি ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে করা দুই মামলায় ফুডপান্ডা বাংলাদেশ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি)…

8 minutes ago

বেসিস নির্বাচন সামনে রেখে ৭ সদস্যের সহায়ক কমিটি গঠন

আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্তি, বিদ্যমান সদস্যদের তথ্য যাচাই এবং হালনাগাদের জন্য সাত…

9 minutes ago

স্টারলিংককে টেক্কা দিতে মহাকাশে অ্যামাজনের নতুন দৌড়

স্যাটেলাইট ইন্টারনেট বাজারে স্পেসএক্সের আধিপত্য চ্যালেঞ্জ করতে এয়ারলাইন সেবায় প্রবেশ করছে অ্যামাজন। ২০২৭ সাল থেকে…

17 minutes ago

নির্যাতন করে স্বীকারোক্তি আদায়ের পর আজমুলের মৃত্যুতে গ্রেফতার ১

নর্থ ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী আয়মান মো. আজমুল হোসেনকে নির্যাতন করে ভাত খাওয়া ও চুরির স্বীকারোক্তি…

40 minutes ago

বার্লিন বিমানবন্দরে ড্রোন দেখা যাওয়ায় ফ্লাইট চলাচল বন্ধ

বার্লিন ব্রান্ডেনবার্গ বিমানবন্দরের উত্তর রানওয়ের ওপর ড্রোন দেখা দেওয়ায় বুধবার ৪৫ মিনিটের জন্য আকাশসীমা বন্ধ…

50 minutes ago

সরকারি হাসপাতালের ১ কিলোমিটারের মধ্যে নতুন ক্লিনিক স্থাপনে নিষেধাজ্ঞা

সরকারি হাসপাতালের এক কিলোমিটারের মধ্যে নতুন করে আর কোনো বেসরকারি ক্লিনিক বা ডায়াগনস্টিক সেন্টারের অনুমোদন…

56 minutes ago

This website uses cookies.