
বিশ্বরাজনীতিতে হরমুজ প্রণালির মতো অর্থনৈতিক বা কৌশলগত চোকপয়েন্ট নিয়ে আলোচনা হলেও ডিজিটাল জগতের চোকপয়েন্ট বা সাইবার পথগুলো নিয়ে আলোচনা হয়েছে সামান্যই। অথচ যুক্তরাষ্ট্রের যোগাযোগ, জ্বালানি ও পরিবহন অবকাঠামোয় ইতিমধ্যেই চীনা হ্যাকাররা তাদের প্রবেশাধিকার প্রতিষ্ঠা করেছে। এই অনুপ্রবেশের উদ্দেশ্য কেবল তথ্য চুরি করা নয়, বরং বড় ধরনের নাশকতার মাধ্যমে বিশাল বিদ্যুৎ-বিভ্রাট ঘটানো, পানি সরবরাহ ব্যবস্থা অচল করা কিংবা সামরিক তৎপরতা ব্যাহত করার মতো বড় বিপর্যয় তৈরি করা।
যুক্তরাষ্ট্রের স্পর্শকাতর অবকাঠামোর ভঙ্গুরতা সম্প্রতি স্পষ্ট হয়েছে। চলতি গ্রীষ্মে ইরানি হ্যাকাররা যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি অঙ্গরাজ্যের পানি সরবরাহ ব্যবস্থায় হামলা চালায়, যার ফলে একটি কাউন্টির বাসিন্দাদের পানি ফুটিয়ে পান করতে হয়েছিল। শুধু যুক্তরাষ্ট্রই নয়, তার মিত্ররাও এই ঝুঁকিতে রয়েছে। চীন ইতিমধ্যেই তাইওয়ানের হাসপাতাল, ভারতের বিদ্যুৎ গ্রিড এবং সিঙ্গাপুরের টেলিকমিউনিকেশন নেটওয়ার্কে সাইবার হামলা চালিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের শাসনব্যবস্থা ও সামাজিক মূল্যবোধের পার্থক্য এই সংকটকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। মার্কিন আইন সরকারকে নাগরিকদের ব্যক্তিগত যোগাযোগ বা জাতীয় নেটওয়ার্কে বেইজিংয়ের মতো নজরদারি করার অনুমতি দেয় না। অন্যদিকে, চীন নিজস্ব কার্যকর সাইবার ফায়ারওয়াল তৈরি করে রেখেছে, যা মার্কিন হামলা থেকে তাদের নেটওয়ার্ককে সুরক্ষা দেয়। এছাড়া চীনের অবকাঠামো রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত হলেও যুক্তরাষ্ট্রের অবকাঠামো মূলত বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন, যাদের সাইবার সুরক্ষার মানও ভিন্ন।
ভবিষ্যতের সাইবার যুদ্ধের অন্যতম কারণ হলো আধুনিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অনুপযোগী পুরোনো ডিজিটাল অবকাঠামো। যুক্তরাষ্ট্রের বিদ্যুৎকেন্দ্র ও পাইপলাইনগুলোয় এখনো কয়েক দশকের পুরোনো হার্ডওয়্যার ব্যবহৃত হচ্ছে, যা সাইবার নিরাপত্তার কথা ভেবে তৈরি করা হয়নি। আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে এই পুরোনো যন্ত্রপাতিগুলোকে ক্লাউড সেবা ও কম্পিউটার নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করায় হ্যাকারদের সুযোগ আরও বেড়ে গেছে। আগে যেখানে গ্যাস পাইপলাইন ধ্বংস করতে সশরীরে বিস্ফোরক বসাতে হতো, এখন দূর থেকেই একটি দুর্বল রাউটার হ্যাক করে পুরো ব্যবস্থা অচল করে দেওয়া সম্ভব।
পরিস্থিতি আরও জটিল করেছে মার্কিন সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর দীর্ঘদিনের উদাসীনতা এবং সাইবার সুরক্ষায় আইনি বাধ্যবাধকতার অভাব। ২০২১ সালের আগে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনাও কম ছিল। সম্প্রতি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর বিকাশ এই ঝুঁকিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। ওপেনএআই এবং অ্যানথ্রোপিকের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো স্বীকার করেছে যে তাদের তৈরি এআই মডেল মানুষের সাহায্য ছাড়াই স্বয়ংক্রিয়ভাবে হ্যাকিং চালাতে সক্ষম। এই ধরনের অনিয়ন্ত্রিত এআই-এর কারণে রাষ্ট্রীয় মদদপুষ্ট সাইবার হামলা প্রতিরোধ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
তবে এআই কেবল হামলার হাতিয়ারই নয়, এটি সাইবার প্রতিরক্ষাতেও অত্যন্ত কার্যকর হতে পারে। এআই ব্যবহার করে কোনো ভৌত ব্যবস্থার ভার্চ্যুয়াল বা কাল্পনিক প্রতিলিপি তৈরি করা সম্ভব, যাকে 'ডিজিটাল টুইন' বলা হয়। এই ডিজিটাল টুইন ব্যবস্থার স্বাভাবিক আচরণ বিশ্লেষণ করে যেকোনো অস্বাভাবিক তৎপরতা বা ক্ষতিকর ম্যালওয়্যার শনাক্ত করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের সাড়ে চার হাজারের বেশি পানি সরবরাহ ব্যবস্থা, তিন হাজারের বেশি বিদ্যুৎ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এবং হাজার হাজার স্বাধীন পাইপলাইন ও টেলিকম অপারেটর ছড়িয়ে রয়েছে। এই বিকেন্দ্রীকরণ ও আইনি জটিলতার কারণে সমন্বিত সুরক্ষা কঠিন হয়ে পড়েছে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো জরিমানা বা মামলার ভয়ে সরকারের সঙ্গে তথ্য শেয়ার করতে দ্বিধা করে। এই সংকট কাটাতে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি ও বাণিজ্য বিভাগের অধীনে এআই কোম্পানিগুলোকে সঙ্গে নিয়ে একটি নিরাপদ 'জাতীয় এনক্লেভ' তৈরি করা যেতে পারে। সেখানে ইউটিলিটি অপারেটররা তাদের নেটওয়ার্কের ডিজিটাল টুইন আপলোড করবেন এবং এআই অনবরত কৃত্রিম হামলা চালিয়ে দুর্বলতাগুলো খুঁজে বের করবে।
ধরা পড়া বড় ত্রুটিগুলো সংশোধন করতে মার্কিন সরকারের বিশেষ উদ্যোগ 'গোল্ড ইগল'-এ পাঠানো যাবে। মার্কিন কংগ্রেসের উচিত তথ্য শেয়ারকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিশেষ আইনি সুরক্ষা দেওয়া এবং ত্রুটি মেরামতে বিশেষ তহবিলের ব্যবস্থা করা। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিস্টিংশড ফেলো অ্যান নিউবার্গার এক বিশ্লেষণে জানান, চীনা সাইবার চোকপয়েন্টের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতা কেবল আধুনিক এআই মডেলের শক্তির ওপর নির্ভর করছে না, বরং শত্রুপক্ষ বড় ধরনের ক্ষতি করার আগেই মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলো এই প্রযুক্তি ব্যবহারে কতটা প্রস্তুত ও আগ্রহী, তার ওপর নির্ভর করছে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মাহের আহমেদ, প্রধান সম্পাদক: মোঃ মোত্তালিব সরকার। প্রকাশক কর্তৃক ৫৫০বি, হজ্জ ক্যাম্প রোড, আশকোনা, দক্ষিণখান, ঢাকা-১২৩০, বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত। সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় (ঢাকা) : ৫৫০বি, হজ্জ ক্যাম্প রোড, আশকোনা, দক্ষিণখান, ঢাকা-১২৩০, বাংলাদেশ। আঞ্চলিক কার্যালয় (বগুড়া): টোলারগেট, শেরপুর–৫৮৪০, শেরপুর, বগুড়া। অফিস: ০১৭৭৬-১৩৬০৫০ (হোয়াটসঅ্যাপ), বিজ্ঞাপন: ০৯৬৯৭-৫৪৪৮২৭। ই-মেইল: dailyjokhonsomoy@gmail.com।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রনালয়ের বিধি মোতাবেক নিবন্ধনের জন্য আবেদিত ©সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © দৈনিক যখন সময় ২০২২