Header Premium (728×90)

Categories: মতামত

ক্ষমতার হাতিয়ার নয়, শিক্ষাকে হতে হবে মানুষের মুক্তির মাধ্যম

একটি স্বাধীন ও মর্যাদাপূর্ণ জাতি হিসেবে টিকে থাকার মূল ভিত্তি নির্ধারিত হয় তার শিক্ষাব্যবস্থার দর্শন, চরিত্র ও লক্ষ্যের ওপর। সামরিক শক্তি, প্রযুক্তি কিংবা অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি সাময়িকভাবে একটি রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করতে পারলেও, দীর্ঘমেয়াদে মানবিকতা, নৈতিকতা ও সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটে আদর্শ শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, যেসব জাতি মুক্তবুদ্ধি ও জ্ঞানচর্চাকে রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার দিয়েছে, তারাই টেকসই উন্নয়ন ও সামাজিক স্থিতিশীলতা অর্জনে সফল হয়েছে। বিপরীতে, শিক্ষার অবক্ষয় ও বৌদ্ধিক স্বাধীনতার সংকোচন একটি জাতির সামগ্রিক পতনের পূর্বলক্ষণ হিসেবে কাজ করে। এ কারণে শিক্ষার সংকটকে মূলত গোটা জাতির সংকট হিসেবেই গণ্য করা হয়।

বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে একটি অত্যন্ত জরুরি প্রশ্ন সামনে এসেছে—দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো কি সত্যিই মুক্তবুদ্ধি ও জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র হিসেবে কাজ করছে, নাকি এগুলো কেবল রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে? এই সংকটের শেকড় অনেক গভীরে। প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক প্লেটো (খ্রিস্টপূর্ব ৪২৭-খ্রিস্টপূর্ব ৩৪৭), আধুনিক মার্কিন শিক্ষাবিদ জন ডিউই (১৮৫৯-১৯৫২) কিংবা ব্রাজিলের প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ পাওলো ফ্রেইরি (১৯২১-১৯৯৭) প্রত্যেকেই শিক্ষা ও নাগরিক জীবনের গভীর সম্পর্কের কথা বলেছেন। মানুষ যেহেতু সমাজে বাস করে, তাই শিক্ষা পুরোপুরি রাজনীতিমুক্ত হতে পারে না। তবে সুস্থ শিক্ষাব্যবস্থার লক্ষ্য হলো শিক্ষার্থীদের সচেতন ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা, যাতে তারা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে পারে।

রাজনৈতিক সচেতনতা এবং দলীয় আনুগত্যের মধ্যে একটি বড় পার্থক্য রয়েছে। প্রকৃত শিক্ষা মানুষকে স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে ও প্রশ্ন করতে শেখায়। অপরদিকে, দলীয়করণের ফলে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক কাঠামোর অনুগত হয়ে পড়ে, যেখানে স্বাধীন চিন্তার চেয়ে ক্ষমতাকেন্দ্রিক আনুগত্য বেশি গুরুত্ব পায়। শিক্ষা যখন এই মৌলিক উদ্দেশ্য হারিয়ে ফেলে, তখন কেবল শিক্ষাব্যবস্থাই নয়, বরং একটি জাতির ভবিষ্যৎ বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তিও ধ্বংস হয়ে যায়। প্রকৃত শিক্ষার সাফল্য কেবল তথ্য মুখস্থ করা বা সনদ অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা বিবেককে জাগ্রত করা এবং সত্য অনুসন্ধানের সাহস জোগানোর মধ্যে নিহিত থাকে।

পাওলো ফ্রেইরি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘অত্যাচারিতের শিক্ষা’ (পেডাগোজি অব দ্যা অপ্রেসড)-এ দেখিয়েছেন যে, শিক্ষা যদি কেবল তথ্য জমা রাখার যান্ত্রিক প্রক্রিয়া হয়, তবে তা মুক্ত মানুষ তৈরির বদলে অনুগত মানুষ তৈরি করে। তিনি একে ‘শিক্ষার ব্যাংকিং মডেল’ (ব্যাংকিং মডেল অব এডুকেশন) বলে অভিহিত করেছেন, যেখানে শিক্ষক শিক্ষার্থীর মাথায় তথ্য জমা করেন এবং শিক্ষার্থীর নিজস্ব সৃজনশীলতার কোনো মূল্য থাকে না। অথচ সভ্যতার অগ্রগতির মূল চালিকাশক্তি হলো প্রশ্ন করার ক্ষমতা। সক্রেটিসের (খ্রিস্টপূর্ব ৪৭০-খ্রিস্টপূর্ব ৩৯৯) অনুসন্ধিৎসু প্রশ্ন, গ্যালিলিওর বৈজ্ঞানিক কৌতূহল, আইজাক নিউটনের (১৬৪৩–১৭২৭) পর্যবেক্ষণ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের (১৮৬১–১৯৪১) মুক্তচিন্তা কিংবা জগদীশচন্দ্র বসুর (১৮৫৮-১৯৩৭) গবেষণামনস্কতার মূলে ছিল প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্ন করার সাহস। যে শিক্ষাব্যবস্থা ভিন্নমতকে সন্দেহের চোখে দেখে, তা দীর্ঘমেয়াদে উদ্ভাবনী শক্তিকে নষ্ট করে দেয়।

দুর্ভাগ্যবশত, বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় অনেক সময়ই জ্ঞানার্জনের চেয়ে আনুগত্যের চর্চাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। শিক্ষার্থীদের শেখানো হয় কীভাবে পরীক্ষায় ভালো ফল করতে হবে, কিন্তু স্বাধীনভাবে চিন্তা করার বা জটিল সামাজিক-রাজনৈতিক সমস্যার সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ করার শিক্ষা দেওয়া হয় না। এর ফলে মুখস্থনির্ভর সাফল্যের সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। অল্প বয়স থেকেই শিক্ষার্থীরা ক্ষমতার প্রতি প্রশ্নহীন আনুগত্য প্রকাশ করতে শেখে, যা তাদের সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোর সাহসকে সংকুচিত করে। অথচ ইতিহাসের প্রতিটি ইতিবাচক পরিবর্তনের পেছনে ছিলেন এমন কিছু মানুষ, যারা প্রতিষ্ঠিত ক্ষমতার সামনে মাথা নত না করে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন।

ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী পিয়েরে বুর্দিয়ো (১৯৩০-২০০২) তাঁর ‘সাংস্কৃতিক পুঁজি’ ও ‘সামাজিক পুনরুৎপাদন’ তত্ত্বে বিশ্লেষণ করেছেন কীভাবে শিক্ষা অনেক সময় নিরপেক্ষ না থেকে বিদ্যমান সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতার বৈষম্যকে টিকিয়ে রাখে। বাংলাদেশের বাস্তবতায় এটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। যখন শিক্ষাঙ্গনে মেধা ও যোগ্যতার চেয়ে দলীয় পরিচয় বা রাজনৈতিক আনুগত্য বেশি গুরুত্ব পায়, তখন প্রতিষ্ঠানগুলো তার বৌদ্ধিক স্বাধীনতা হারায়। শিক্ষক নিয়োগ, পদোন্নতি, নেতৃত্ব নির্বাচন কিংবা একাডেমিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে মেধার অবমূল্যায়ন ঘটলে একটি অস্বাস্থ্যকর সংস্কৃতির জন্ম হয়। এতে মেধাবীরা পিছিয়ে পড়েন এবং আনুগত্যের সংস্কৃতি শক্তিশালী হয়।

এই রাজনৈতিকীকরণের ফলে শিক্ষাঙ্গনগুলো আজ বিভক্ত হয়ে পড়েছে। সেখানে একাডেমিক সহযোগিতার বদলে ক্ষমতার সমীকরণ প্রাধান্য পাচ্ছে। মতের ভিন্নতাকে সম্পদ না ভেবে রাজনৈতিক অবস্থান হিসেবে সন্দেহ করা হচ্ছে। ফলে মুক্তবুদ্ধির চর্চার পরিবেশ সংকুচিত হয়ে উঠছে এবং স্লোগান ও পক্ষপাতিত্বের ভিড়ে গবেষণা ও উদ্ভাবন হারিয়ে যাচ্ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে যদি রাজনৈতিক ক্ষমতার সরাসরি নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত করে একাডেমিক ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা না যায়, তবে আমরা হয়তো কেবল সনদধারী মানুষের সংখ্যা বাড়াতে পারব, কিন্তু স্বাধীন ও সৃজনশীল নাগরিক গড়ে তুলতে পারব না।

যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটনের ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি হিসেবে কর্মরত লেখক এই প্রবন্ধে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার আমূল সংস্কার এবং বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতা পুনরুদ্ধারের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Adin

Recent Posts

নির্যাতন করে স্বীকারোক্তি আদায়ের পর আজমুলের মৃত্যুতে গ্রেফতার ১

নর্থ ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী আয়মান মো. আজমুল হোসেনকে নির্যাতন করে ভাত খাওয়া ও চুরির স্বীকারোক্তি…

19 minutes ago

বার্লিন বিমানবন্দরে ড্রোন দেখা যাওয়ায় ফ্লাইট চলাচল বন্ধ

বার্লিন ব্রান্ডেনবার্গ বিমানবন্দরের উত্তর রানওয়ের ওপর ড্রোন দেখা দেওয়ায় বুধবার ৪৫ মিনিটের জন্য আকাশসীমা বন্ধ…

29 minutes ago

সরকারি হাসপাতালের ১ কিলোমিটারের মধ্যে নতুন ক্লিনিক স্থাপনে নিষেধাজ্ঞা

সরকারি হাসপাতালের এক কিলোমিটারের মধ্যে নতুন করে আর কোনো বেসরকারি ক্লিনিক বা ডায়াগনস্টিক সেন্টারের অনুমোদন…

36 minutes ago

গোলান মালভূমি সিরিয়ারই থাকবে, জাতিসংঘে আল-শারার ঘোষণা

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা ঘোষণা করেছেন যে, গোলান মালভূমি সিরিয়ার ভূখণ্ড…

41 minutes ago

ভোলায় এনসিপির কমিটি ঘোষণার পরপরই সাংগঠনিক সম্পাদকের পদত্যাগ

ভোলায় জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণার পরপরই ব্যক্তিগত ও সাংগঠনিক কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ…

46 minutes ago

এফবিআইয়ের হাজারো কর্মকর্তার সংবেদনশীল তথ্য চুরির দাবি হ্যাকারদের

যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (এফবিআই) হাজারো কর্মকর্তা ও আবেদনকারীদের বিপুল…

1 hour ago

This website uses cookies.