Header Premium (728×90)

Categories: মতামত

যুদ্ধের আড়ালে সত্য: সংবাদমাধ্যম কি কখনো নিরপেক্ষ হয়?

যুদ্ধের খবর কি কখনো সত্যিভাবে বলা হয়? যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর বিদ্রোহ দমনবিষয়ক নির্দেশিকায় মার্কিন জেনারেল ডেভিড পেট্রেয়াস লিখেছিলেন, আফগানিস্তানের যুদ্ধ আসলে ‘ধারণার যুদ্ধ’। এই যুদ্ধ প্রতিদিন সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমে চলতে থাকে। তালেবানের সঙ্গে কোথায় কী লড়াই হচ্ছে, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে—আমেরিকার মানুষের কাছে এই যুদ্ধকে কীভাবে তুলে ধরা হচ্ছে। ভেনেজুয়েলার এক জেনারেল ২০০২ সালে গণতান্ত্রিক সরকারের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানে অংশ নিয়ে বলেছিলেন, তাদের হাতে একটি গোপন অস্ত্র ছিল—সংবাদমাধ্যম। তার ভাষায়, “সংবাদমাধ্যমকে আপনার পাশে রাখতেই হবে।”

আজ যুদ্ধ শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে হয় না, বরং মানুষের মনও যুদ্ধের আরেকটি ক্ষেত্র। সরকার ও সামরিক বাহিনী চায় সংবাদমাধ্যম তাদের ভাষায় যুদ্ধের গল্প বলুক। যুদ্ধকে বলা হয় ‘নিরাপত্তা’, ‘সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান’, ‘মানবিক হস্তক্ষেপ’ কিংবা ‘শান্তি প্রতিষ্ঠা’। কিন্তু এই শব্দগুলোর আড়ালে যে মানুষ মারা যায়, ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়, শিশুরা পিতা-মাতাকে হারায়—সেই সত্য অনেক সময় সংবাদে জায়গা পায় না। ব্রিটেনের বেডফোর্ডশায়ারের চিকস্যান্ডসে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ পরিচালনার একটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যেখানে সাংবাদিক ও সংবাদকর্মীদের সঙ্গে কাজ করা হয়।

সেখানে ‘তথ্যের নিয়ন্ত্রণ’, ‘অসম হুমকি’, ‘সাইবার হুমকি’—এমন সব শব্দ ব্যবহৃত হয়। একই জায়গায় এমন জিজ্ঞাসাবাদ পদ্ধতির প্রশিক্ষণও দেওয়া হতো, যা ইরাকে ব্রিটিশ সেনাদের নির্যাতনের অভিযোগের সঙ্গে যুক্ত ছিল।

শব্দ বদলায়, কিন্তু যুদ্ধের কৌশল বদলায় না। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড লয়েড জর্জ ‘ম্যানচেস্টার গার্ডিয়ান’-এর সম্পাদক সি. পি. স্কটকে বলেছিলেন, ‘মানুষ যদি সত্যটা জানত, তাহলে যুদ্ধ আগামীকালই বন্ধ হয়ে যেত। কিন্তু তারা জানে না, জানতেও পারে না।’ একটি শতাব্দী পেরিয়ে গেলেও কথাটি অদ্ভুতভাবে সত্য। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর এডওয়ার্ড বার্নেজ ‘পাবলিক রিলেশনস’ শব্দটি জনপ্রিয় করেন।

১৯২৮ সালে তার ‘প্রোপাগান্ডা’ বইয়ে তিনি লিখেছিলেন, মানুষের চিন্তা ও অনুভূতিকে পরিকল্পিতভাবে প্রভাবিত করা যায় এবং সংবাদমাধ্যম সেই কাজে বড় ভূমিকা পালন করতে পারে। অর্থাৎ, সত্যকে শুধু লুকিয়ে রাখলেই হয় না, তার বদলে আরেকটি ‘সত্য’ তৈরি করতে হয়।

ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় তরুণ সাংবাদিক হিসেবে আমি এই বিষয়টি প্রথম গভীরভাবে বুঝতে শুরু করি। তখন বলা হতো, ‘যুদ্ধে এমন দুঃখজনক ঘটনা ঘটেই।’ কিন্তু এই কথাটি আসল প্রশ্নের উত্তর দেয় না। কেন দক্ষিণ ভিয়েতনামের সাধারণ মানুষ এমন একটি বাহিনীর হাতে মারা যাচ্ছিল, যাকে যুক্তরাষ্ট্র তাদের ‘মিত্র’ বলে দাবি করেছিল? সাইগনের বড় বড় মার্কিন সংবাদ সংস্থার অফিসে ভয়াবহ কিছু ছবি টাঙানো থাকত, কিন্তু সেগুলোর অনেকই কখনো প্রকাশ করা হতো না। বলা হতো, এসব ছবি প্রকাশ করলে যুদ্ধকে অতিরিক্ত ভয়াবহ করে দেখানো হবে, যা ‘নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার’ সঙ্গে যায় না।

১৯৬৮ সালের মাই লাই হত্যাকাণ্ডও ভিয়েতনাম থেকে বড় কোনো সংবাদমাধ্যম প্রথমে প্রকাশ করেনি। শেষ পর্যন্ত মার্কিন সাংবাদিক সেমুর হার্শ যুক্তরাষ্ট্রে বসে সেই হত্যাকাণ্ডের খবর প্রকাশ করেন। ‘নিউজউইক’ ঘটনাটিকে বলেছিল ‘আমেরিকান ট্র্যাজেডি’, যেন যারা আক্রমণ করেছিল, তারাই ছিল আসল ভুক্তভোগী। এই ধারণা পরে হলিউডের অনেক চলচ্চিত্রেও ফিরে এসেছে—যুদ্ধটি ছিল ভুল, কিন্তু উদ্দেশ্য ছিল ভালো, আর আমেরিকা যুদ্ধে হেরেছিল মূলত দায়িত্বজ্ঞানহীন সংবাদমাধ্যমের কারণে। এটিই ছিল ভিয়েতনাম যুদ্ধ থেকে নেওয়া একটি মিথ্যা শিক্ষা।

ইরাক যুদ্ধের সময় সংবাদমাধ্যমকে সেনাবাহিনীর সঙ্গে ‘এম্বেড’ করা হলো। ২০০৩ সালের মার্চে প্রায় ৭০০ সাংবাদিক ও ক্যামেরা ক্রু মার্কিন সেনাদের সঙ্গে ইরাকে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের অনেক প্রতিবেদনে মনে হচ্ছিল, যেন কোনো মুক্তির যুদ্ধ চলছে। বাগদাদে সাদ্দাম হোসেনের মূর্তি ফেলার দৃশ্য সারা পৃথিবীতে প্রচারিত হলো, মানুষকে দেখানো হলো ইরাকিরা আনন্দে আমেরিকানদের স্বাগত জানাচ্ছে। কিন্তু সেই দৃশ্যের আড়ালে ইরাকের একটি সমাজ ধ্বংসের পথে এগিয়ে যাচ্ছিল।

বিবিসির সাংবাদিক রাগে ওমার পরে নিজের কাজের দিকে ফিরে তাকিয়ে বলেছিলেন, তিনি মনে করেন তিনি ঠিকভাবে তার দায়িত্ব পালন করতে পারেননি এবং অস্বস্তিকর প্রশ্নগুলো যথেষ্ট জোর দিয়ে তোলা হয়নি। বসরা শহর নিয়েও ব্রিটিশ সামরিক প্রচারণা সংবাদমাধ্যমকে প্রভাবিত করেছিল। বিবিসি নিউজ ২৪ একসময় এমনভাবে খবর প্রচার করেছিল, যেন বসরা বহুবার দখল হয়ে আবার হারিয়ে যাচ্ছে। ওমারের ভাষায়, সংবাদমাধ্যম তখন একটি “বিরাট প্রতিধ্বনি কক্ষ”-এ পরিণত হয়েছিল।

ইরাকে সাধারণ মানুষের কত মানুষ মারা গেল, কত পরিবার ভেঙে গেল—সেই বিশাল মানবিক বিপর্যয় সংবাদে খুব কম জায়গা পেল। আক্রমণের রাতে ব্রিটিশ সাংবাদিক অ্যান্ড্রু মার ১০ ডাউনিং স্ট্রিটের সামনে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, টনি ব্লেয়ার ঠিকই বলেছিলেন—বাগদাদে রক্তপাত ছাড়াই পৌঁছানো যাবে এবং শেষ পর্যন্ত ইরাকিরা আনন্দ করবে।

পরে বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, বিবিসির সংবাদ অনেক ক্ষেত্রেই ব্রিটিশ সরকারের বক্তব্যকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিল। ইরাকে গণবিধ্বংসী অস্ত্র আছে—এই মিথ্যা দাবিও সংবাদমাধ্যম যথেষ্ট প্রশ্ন না করেই প্রচার করেছিল। সাংবাদিক জেরেমি প্যাক্সম্যান পরে স্বীকার করেছিলেন, তারা প্রতারিত হয়েছিলেন।

প্রশ্ন হলো—কেন তারা প্রতারিত হলেন? আমেরিকান সাংবাদিক ড্যান রাদার, যিনি দীর্ঘ ২৪ বছর সিবিএসের প্রধান সংবাদ উপস্থাপক ছিলেন, আমাকে বলেছিলেন, যুদ্ধের সময় আমেরিকার প্রতিটি নিউজরুমে চাকরি হারানোর ভয় ও দেশপ্রেমহীন বলে চিহ্নিত হওয়ার ভয় কাজ করত। সাংবাদিকেরা যদি ইরাক যুদ্ধের আগে সরকারের মিথ্যা তথ্যকে প্রশ্ন করতেন, তাহলে হয়তো সেই যুদ্ধই হতো না। ব্রিটিশ সাংবাদিক ডেভিড রোজও নিজের ভূমিকার কথা স্বীকার করেছিলেন।

তার ‘অবজারভার’-এ প্রকাশিত কিছু প্রতিবেদনে সাদ্দাম হোসেনকে আল-কায়েদা ও ৯/১১-এর সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করা হয়েছিল। পরে তিনি আমাকে বলেছিলেন, ইরাকে যা ঘটেছে, তা ছিল বড় আকারের একটি অপরাধ। আমি তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, তাহলে কি সাংবাদিকেরা এই অপরাধের সহযোগী? তিনি বলেছিলেন, “হ্যাঁ। হয়তো না জেনে, কিন্তু হ্যাঁ।”

সাংবাদিক জেমস ক্যামেরন মালকম এয়ার্ডের সঙ্গে উত্তর ভিয়েতনামে বেসামরিক মানুষের ওপর বোমা হামলার একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছিলেন, যা বিবিসি প্রচার করতে দেয়নি। ক্যামেরন আমাকে বলেছিলেন, যারা জানার চেষ্টা করি ক্ষমতাবানরা কী করছে, আমরা যদি সেই সত্য প্রকাশ না করি, তাহলে আবার একই ঘটনা ঘটলে তা থামাবে কে? ক্যামেরন হয়তো উইকিলিকসের মতো কোনো কিছুর কথা ভাবতেও পারেননি, কিন্তু উইকিলিকস এমন অনেক গোপন নথি প্রকাশ করেছিল, যা যুদ্ধের পেছনের অন্ধকার সিদ্ধান্তগুলো সামনে নিয়ে আসে।

ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রায় দুই হাজার পৃষ্ঠার একটি নথিতে বলা হয়েছিল, ক্ষমতাবানদের কাছে সবচেয়ে কার্যকর সাংবাদিক সেই ব্যক্তি নন, যিনি ক্ষমতার সঙ্গে সহজে মিশে যান, বরং তিনি, যাঁকে ক্ষমতাবানরা ‘হুমকি’ মনে করেন।

জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জকে আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, ব্রিটেনের কঠোর গোপনীয়তা আইন থাকা সত্ত্বেও উইকিলিকস কীভাবে কাজ করে। তিনি বলেছিলেন, সরকারি গোপন নথিতে লেখা থাকে—তথ্য নিজের কাছে রাখাও অপরাধ, আবার তা ধ্বংস করাও অপরাধ। তাহলে আর কী করা যায়? প্রকাশ করা ছাড়া আর কোনো পথ থাকে না। আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যখন যুদ্ধের আগে যুদ্ধের গল্প তৈরি হয়।

প্রথমে তৈরি হয় শত্রু, তারপর ভয়, তারপর সেই ভয়কে সংবাদে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত মানুষ যুদ্ধকে স্বাভাবিক বলে মেনে নেয়। কিন্তু যুদ্ধ কখনো শুধু মানচিত্রে ঘটে না, যুদ্ধ ঘটে মানুষের ঘরে, শিশুর শরীরে, একজন মায়ের অপেক্ষায়, একজন বাবার ফিরে না আসায়।

যে ছবি প্রকাশ করা হয়নি, যে প্রশ্ন করা হয়নি, যে নথি লুকিয়ে রাখা হয়েছে—সেখানেও যুদ্ধের ইতিহাস লেখা থাকে। সাংবাদিকতার সবচেয়ে কঠিন কাজ হয়তো খবর পৌঁছে দেওয়া নয়, সত্যকে বাঁচিয়ে রাখা। ক্ষমতার ভাষার বাইরে গিয়ে মানুষের ভাষায় বলা—কী ঘটছে। কারণ মানুষ যদি সত্যটা জানতে পারে, তাহলে যুদ্ধের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্রটিই দুর্বল হয়ে যায়।

আমার চলচ্চিত্র ‘দ্য ওয়ার ইউ ডোন্ট সি’-এর শুরুতেই আমি ১৯১৭ সালের একটি কথোপকথনের কথা বলেছি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড লয়েড জর্জ ‘ম্যানচেস্টার গার্ডিয়ান’-এর সম্পাদক সি. পি. স্কটকে বলেছিলেন, ‘মানুষ যদি সত্যটা জানত, তাহলে যুদ্ধ আগামীকালই বন্ধ হয়ে যেত। কিন্তু তারা জানে না, জানতেও পারে না।’

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Adin

Recent Posts

বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সব কমিটি পুনর্গঠনের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের

সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ, অধিদপ্তর ও সংস্থার আওতায় বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে গঠিত বিদ্যমান…

17 minutes ago

দেশের বাজারে ফের বাড়ল স্বর্ণের দাম

দেশের বাজারে স্বর্ণের দাম ভরিতে ১ হাজার ৬৯১ টাকা বৃদ্ধি করেছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস)।…

26 minutes ago

বিশ্ববাজারে স্বর্ণ ও রুপার দামে বড় পতন

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বিশ্বের বড় কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদহার দীর্ঘ সময় উচ্চ পর্যায়ে রাখবে—এমন আশঙ্কায় বুধবার আন্তর্জাতিক…

51 minutes ago

এআই-এর যুগেও নিজের অবস্থানে অনড় ‘লিপস্টিক কিং’ লি জিয়াকি

চীনের লাইভস্ট্রিম শপিং খাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত প্রসারের মুখেও নিজের অবস্থানে অনড় রয়েছেন সুপারস্টার লি…

1 hour ago

টেকনাফে কাউন্সিলর একরামুল হত্যা: শেখ হাসিনাসহ ১১ জনের শুনানি আজ

কক্সবাজারের টেকনাফে কাউন্সিলর একরামুল হক হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আজ আন্তর্জাতিক অপরাধ…

1 hour ago

যুক্তরাষ্ট্রে শি জিনপিংকে লাল গালিচা অভ্যর্থনা, আলোচনায় বাণিজ্যসহ নানা ইস্যু

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে লাল গালিচা অভ্যর্থনা জানিয়েছেন। ঐতিহাসিক এই সফরে…

2 hours ago

This website uses cookies.