
বিশ্বের পরবর্তী বড় স্বাস্থ্য সংকটের প্রতিষেধক হয়তো কোনো অত্যাধুনিক গবেষণাগারে বা বহুজাতিক ওষুধ কোম্পানির দামি পেটেন্টে তৈরি হচ্ছে না। বরং এই মহাবিপদ থেকে বাঁচার সবচেয়ে সস্তা ও কার্যকর সমাধানটি পড়ে আছে আমাদের ঘরের বাথরুমে কিংবা রান্নাঘরের কোণে—যার নাম সাধারণ সাবান। চিকিৎসাবিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় হুমকিগুলোর একটি এখন আমাদের দৈনন্দিন অভ্যাসের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে, যার নাম অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স বা এএমআর। এটি এমন এক পরিস্থিতি, যখন জীবাণু আর ওষুধকে ভয় পায় না এবং সাধারণ সংক্রমণও হয়ে ওঠে প্রাণঘাতী।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের মূল ভিত্তিই দাঁড়িয়ে আছে কার্যকর অ্যান্টিবায়োটিকের ওপর। ক্যানসারের কেমোথেরাপি, কিডনি ডায়ালাইসিস কিংবা আইসিইউতে থাকা সংকটাপন্ন রোগীদের ইনফেকশন নিয়ন্ত্রণ—সবকিছুই অ্যান্টিবায়োটিকের সফল কার্যকারিতার ওপর নির্ভরশীল। এ কারণেই এএমআর-কে বলা হচ্ছে একটি 'নীরব মহামারি'। এটি কোভিডের মতো হঠাৎ লকডাউন ডেকে আনে না, কিন্তু হাসপাতালের বিছানায়, অস্ত্রোপচারের পরে কিংবা গ্রামীণ শিশুর শরীরে ধীরে ধীরে নিজের উপস্থিতি বিস্তার করে। অপ্রয়োজনে বা অসম্পূর্ণ ডোজে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করে আমরা মূলত জীবাণুকেই শক্তিশালী করে তুলছি, যার ফলে সৃষ্টি হচ্ছে অপ্রতিরোধ্য 'সুপারবাগ'।
বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে এই সংকট আরও প্রকট। এখানে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই ফার্মেসি থেকে সহজে অ্যান্টিবায়োটিক কেনার প্রবণতা রয়েছে। বাংলাদেশ ও কেনিয়ার গ্রামীণ জনগোষ্ঠী নিয়ে বিজ্ঞান সাময়িকী 'নেচার কমিউনিকেশনস'-এ প্রকাশিত একটি গবেষণার তথ্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে প্রায় ৯৮ শতাংশ শিশু ছয় মাস বয়স হওয়ার আগেই অন্তত একবার অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করেছে। বছরে তারা গড়ে প্রায় ১০ বার অ্যান্টিবায়োটিকের কোর্স নিয়েছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রে একটি শিশু বছরে গড়ে দুবারেরও কম অ্যান্টিবায়োটিক নেয়। গ্রামীণ এলাকায় শিশুদের ডায়রিয়ার চিকিৎসায় ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিকের প্রায় ৭৭ শতাংশই চিকিৎসকের কোনো ব্যবস্থাপত্র ছাড়া সরাসরি ফার্মেসি থেকে কেনা হয়েছিল।
এই বিপজ্জনক পরিস্থিতি থেকে বাঁচার অন্যতম কার্যকর উপায় হলো সাবান দিয়ে নিয়মিত হাত ধোয়া। হাত আমাদের শরীরের সবচেয়ে ব্যস্ত অঙ্গ, যা প্রতিনিয়ত নানা জীবাণু বহন করে মুখ, চোখ ও নাকে প্রবেশ করায়। সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার অভ্যাস ডায়রিয়া ও শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেয়। সংক্রমণ কমলে স্বভাবতই চিকিৎসার প্রয়োজন কমে এবং অ্যান্টিবায়োটিকের ওপর চাপ হ্রাস পায়, যা এএমআর তৈরির গতিকে শ্লথ করে দেয়।
বাংলাদেশ ও কেনিয়ার যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, যেখানে পানি, স্যানিটেশন ও হাত ধোয়ার ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে, সেখানে বাংলাদেশে শিশুদের অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের হার লক্ষণীয়ভাবে কমেছে। যেসব পরিবার এই স্বাস্থ্যবিধির আওতায় এসেছে, তাদের শিশুদের ক্ষেত্রে আগের ৯০ দিনে অন্তত একবার অ্যান্টিবায়োটিক সেবনের হার ১০ থেকে ১৪ শতাংশ কম ছিল। এছাড়া একাধিকবার অ্যান্টিবায়োটিক কোর্স নেওয়ার হার কমেছে ২৬ থেকে ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত। কোনো নিষেধাজ্ঞা বা ব্যয়বহুল চিকিৎসা ছাড়াই কেবল সংক্রমণ কমার কারণে এই ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে।
তবে একই গবেষণায় কেনিয়ায় এমন সুফল পাওয়া যায়নি। এর কারণ হলো, শুধু অবকাঠামো বা হাত ধোয়ার স্টেশন তৈরি করলেই আচরণ পরিবর্তন হয় না। আচরণগত পরিবর্তনের জন্য প্রাপ্যতা, সুবিধা, সামাজিক অনুপ্রেরণা, নিয়মিত নজরদারি ও স্থানীয় নেতৃত্বের সমন্বয় প্রয়োজন। বাংলাদেশের অনেক স্কুলেই হাত ধোয়ার জায়গা থাকলেও পানি থাকে না, কিংবা পানি থাকলেও সাবান থাকে না। অবকাঠামো ও অভ্যাসের এই ব্যবধানই জনস্বাস্থ্যের বড় দুর্বলতা।
নতুন অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কার অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ। অন্যদিকে, অ্যান্টিবায়োটিক অকার্যকর হয়ে পড়লে চিকিৎসা ব্যয় ও হাসপাতালে থাকার সময় বাড়ে, যা দরিদ্র পরিবারের ওপর বড় আর্থিক বোঝা চাপায়। সেই তুলনায় সাবান-পানি দিয়ে হাত ধোয়ার খরচ অত্যন্ত কম। তাই এএমআর মোকাবিলায় শুধু 'অ্যান্টিবায়োটিক কম খাও' প্রচারণায় সীমাবদ্ধ না থেকে নিরাপদ পানি, স্থায়ী হাত ধোয়ার ব্যবস্থা, স্কুলভিত্তিক স্বাস্থ্যবিধি শিক্ষা ও ফার্মেসিতে অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি নিয়ন্ত্রণের সমন্বিত জাতীয় কৌশল প্রয়োজন।
সাবান দিয়ে হাত ধোয়া কোনো সাধারণ ভালো অভ্যাস নয়, বরং এটি সুপারবাগের বিরুদ্ধে সমাজের প্রথম সারির প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। ওয়াটারএইড বাংলাদেশের কমিউনিকেশনস কো-অর্ডিনেটর প্লাবন গঙ্গোপাধ্যায় এবং রিসার্চ ও নলেজ ম্যানেজমেন্ট কো-অর্ডিনেটর মো. গোলাম রসুলের মতে, সুপারবাগের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু হতে হবে হাসপাতালের বিছানায় নয়, বরং হাতের তালুতে সাবানের ফেনায়। তখনই এই সস্তা অস্ত্রটি কার্যকর হবে, যখন এটি আমাদের জাতীয় নীতি ও সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠবে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মাহের আহমেদ, প্রধান সম্পাদক: মোঃ মোত্তালিব সরকার। প্রকাশক কর্তৃক ৫৫০বি, হজ্জ ক্যাম্প রোড, আশকোনা, দক্ষিণখান, ঢাকা-১২৩০, বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত। সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় (ঢাকা) : ৫৫০বি, হজ্জ ক্যাম্প রোড, আশকোনা, দক্ষিণখান, ঢাকা-১২৩০, বাংলাদেশ। আঞ্চলিক কার্যালয় (বগুড়া): টোলারগেট, শেরপুর–৫৮৪০, শেরপুর, বগুড়া। অফিস: ০১৭৭৬-১৩৬০৫০ (হোয়াটসঅ্যাপ), বিজ্ঞাপন: ০৯৬৯৭-৫৪৪৮২৭। ই-মেইল: dailyjokhonsomoy@gmail.com।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রনালয়ের বিধি মোতাবেক নিবন্ধনের জন্য আবেদিত ©সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © দৈনিক যখন সময় ২০২২