বিশ্ব পরিস্থিতি বর্তমানে এমন এক জটিল ও অস্থিতিশীল পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগছে—তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ কি ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে? পশ্চিমা বিশ্বের রাজনৈতিক বছরের শুরুতেই এক গভীর কালো মেঘ জমেছে। অন্তহীন যুদ্ধ, মানবিক সংকট, গণতন্ত্রের ভঙ্গুর দশা, উগ্র বর্ণবাদ এবং আইনকানুনকে তোয়াক্কা না করার উন্মাদনা বিশ্বকে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বৈষম্য, করপোরেট লোভ, বিভিন্ন সরকারের ঋণের বোঝা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জুয়াখেলা, জলবায়ুর দ্রুত অবনতি এবং পারমাণবিক অস্ত্রের অবাধ বিস্তার। সব মিলিয়ে এক কেয়ামতের আবহ তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাজ্যের নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম ‘সম্ভাবনার নতুন ভোর’ নিয়ে আশার বার্তা দিলেও আন্তর্জাতিক বাস্তবতায় তিনিও চাপের মুখে। বৈদেশিক টানাপোড়েনে বিশ্ব বন্ড বাজারে ধস নেমেছে এবং তার সরকার শুরুতেই সুদের অস্বাভাবিক বোঝা ও ঋণের ফাঁদে পড়েছে। ইউক্রেন সফর করে পুতিনের আগ্রাসনের প্রতিবাদ জানানোয় যুক্তরাজ্য রাশিয়ার সাথে এক পরোক্ষ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে, যা দেশটির জন্য বাড়তি ঝুঁকির কারণ হয়েছে। একই সুযোগে আর্জেন্টিনা যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা দুর্বলতার দিকে নজর দিচ্ছে। বার্নহ্যামের সম্ভাবনার স্বপ্নে নিশ্চয়ই এমন অপ্রিয় পরিস্থিতি ছিল না।
অনেকে মনে করছেন, তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে। কিয়েভ থেকে খোররামশাহর বা কোরদোফান থেকে কাচিন—পৃথিবীর যেখানেই চোখ রাখা যায়, রক্তক্ষয়ী সংঘাতের কোনো বিরাম নেই। ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন পঞ্চম বছরে পড়েছে। ইরানে ডোনাল্ড ট্রাম্পের কৌশল ব্যর্থ হলেও সেখানে প্রতিনিয়ত বোমাবর্ষণ আর হামলা চালানো থেমে নেই। দক্ষিণ সুদানে নৃশংস সব মানবতাবিরোধী অপরাধ অবাধে চলছে। মিয়ানমারে সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের প্রতিরোধ যুদ্ধ আরও তীব্র হচ্ছে। ২০২৩ সালে ইসরায়েলের শুরু করা বিধ্বংসী যুদ্ধ এখন ফিলিস্তিন, লেবানন, সিরিয়া, ইয়েমেন, ইরাক, ইরান এবং উপসাগরীয় দেশগুলোকে গ্রাস করেছে। সংঘাতের ফলে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা ইতিহাসের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এসব যুদ্ধ এখন একে অপরের সাথে যুক্ত হয়ে এক নিয়ন্ত্রণহীন বৈশ্বিক মহাদাবানলে রূপ নিচ্ছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গড়ে ওঠা বৈশ্বিক নিরাপত্তাকাঠামো এখন ভেতর থেকে ভেঙে পড়ছে। ন্যাটো ও ইউরোপের অনিশ্চয়তার সুযোগ নিয়ে ট্রাম্পের শুল্কারোপ, সৈন্য প্রত্যাহার আর নানা কটূক্তি জোটকে কোণঠাসা করছে। কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক তলানিতে, অন্যদিকে হোয়াইট হাউসের প্রভাব বিস্তারের মনোভাব ভেনেজুয়েলা আক্রমণ কিংবা গ্রিনল্যান্ড দখলের মতো বিপজ্জনক পরিণতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। উত্তর কোরিয়াকে মদদ দিচ্ছে চীন, উত্তর কোরিয়া রসদ দিচ্ছে রাশিয়াকে, রাশিয়া আবার রসদ জোগাচ্ছে ইরানকে, আর ইরান সেই সহায়তা পৌঁছে দিচ্ছে হিজবুল্লাহ ও হুতিদের হাতে। এশীয় অঞ্চলে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ফিলিপাইন ও অস্ট্রেলিয়ার রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের নির্ভরযোগ্যতা কমতে থাকায় চীনের প্রভাব চোখ রাঙাচ্ছে। তাইওয়ানে চীনা আগ্রাসনের আতঙ্ক তুঙ্গে, যা ট্রাম্পের সি চিন পিং তোষণনীতির কারণে আরও জটিল রূপ নিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য আন্তর্জাতিক তহবিলে মারাত্মক কাটছাঁট করায় জাতিসংঘের ত্রাণ তৎপরতা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিম তীরের উর্বর ভূমিতে উগ্রপন্থী ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের তাণ্ডবে অবরুদ্ধ প্রায় ৯ লাখ ফিলিস্তিনি এখন তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। সোমালিয়ার রেকর্ড খরা ও এল নিনোর প্রভাবে কোটি কোটি মানুষ না খেয়ে দিন কাটাচ্ছে। কলম্বিয়া ও আফগানিস্তানের চিত্রও প্রায় একই রকম। হংকংয়ে মুক্তচিন্তার প্রবক্তা ও প্রবীণ সাংবাদিক জিমি লাইকে দিনে ২৩ ঘণ্টা নির্জন কারাবাসে রাখা হয়েছে, যা চীনের কমিউনিস্ট শাসনের গণতন্ত্র ও নাগরিক অধিকারবিদ্বেষী নীতির এক নির্মম শিকার।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি ভয়াবহ। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণ ৪০ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য ও জাপানের মতো দেশগুলোও ঋণের ভারে জর্জরিত। এনভিডিয়া, অ্যামাজন, গুগল, মেটা ও মাইক্রোসফটের সম্মিলিত বাজারমূল্য এখন যুক্তরাষ্ট্রের পুরো শেয়ারবাজারের প্রায় ২৩ শতাংশ, যা একটি বড় ধরনের আর্থিক বিপর্যয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্য নীতি জ্বালানি ও খাদ্যের দাম বাড়িয়ে দিয়ে বিশ্বকে মহামন্দার দিকে ঠেলে দিতে পারে। পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার এবং মহাশূন্যে প্রতিযোগিতার ফলে মানবজাতি নিজের ধ্বংস ডেকে আনছে। পুতিন ও নেতানিয়াহুর মতো নেতারা আন্তর্জাতিক আদালতের পরোয়া করছেন না, অন্যদিকে ট্রাম্প আন্তর্জাতিক আদালতকে ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়ার চক্রান্ত করছেন। ইউরোপজুড়ে উগ্র ডানপন্থী ও বর্ণবাদী রাজনীতির বিষবাষ্প ছড়াচ্ছে, যার প্রমাণ মিলেছে পূর্ব জার্মানির স্যাক্সনি-আনহাল্ট রাজ্যের নির্বাচনে। যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্প তাঁর অনুগত কংগ্রেস ও সুপ্রিম কোর্টের সহায়তায় এক ‘সাংবিধানিক একনায়কতন্ত্র’ কায়েম করছেন, যা মার্কিন গণতন্ত্র তথা পশ্চিমা গণতান্ত্রিক ঐতিহ্যকে অস্তিত্ব সংকটে ফেলেছে।
তবে আশার কথা হলো, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-উত্তর ব্যবস্থার মূল স্তম্ভগুলো এখনো পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি। জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক বিচার আদালত, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ন্যাটো বা জি-সেভেনের মতো জোটগুলো এখনো টিকে আছে। স্বৈরাচার ও একনায়কদের শাসনকাল শেষ হওয়ার পথে। ভারতসহ বিশ্বের উদীয়মান দেশগুলোর তরুণ প্রজন্ম পুরোনো ব্যবস্থার বিরুদ্ধে রাজপথে সোচ্চার হচ্ছে। ভারতের ‘ককরোচ আন্দোলন’ যার একটি বড় উদাহরণ। তারা বিশ্বাস করে পরিবর্তন সম্ভব। বিশ্বের ভবিষ্যৎ কোনো খুনি বা একনায়কের হাতে নেই, বরং এর নিয়ন্তা সাধারণ মানুষ। শান্তি বজায় রাখা নির্ভর করছে পারস্পরিক সহানুভূতি, আত্মত্যাগ, বিশ্বাস আর প্রতিদিনের সাহসিকতার ওপর। তাই ধৈর্য না হারিয়ে ভবিষ্যতের জন্য লড়াই চালিয়ে যাওয়াই এখনকার প্রধান কাজ।
যাঁরা এটিকে নিছক বাড়িয়ে বলা মনে করছেন, তাঁরা ২০২৬ সালের বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতির খণ্ডচিত্রগুলোর দিকে একবার চোখ বোলাতে পারেন।কিয়েভ থেকে খোররামশাহর, কিংবা কোরদোফান থেকে কাচিন—পৃথিবীর যেখানেই চোখ যাবেন, রক্তক্ষয়ী সংঘাত কোথাও সাময়িক কমলেও চিরতরে থামার কোনো লক্ষণ নেই।ইউক্রেনে রাশিয়ার সর্বাত্মক আগ্রাসন এখন পঞ্চম বছরে গড়িয়ে
২০০৮ সালের মতো, নাকি তার চেয়েও ভয়াবহ কোনো ধস আমাদের সামনে অপেক্ষা করছে?
রাজশাহীর ডিঙ্গাডোবায় মুদিদোকানি বারিউল ইসলাম হত্যা মামলায় পান দোকানি হানিফ আলী ও তার ভাইকে ফাঁসানোর…
বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা ও ইউরোপিয়ান ফুটবল ফেডারেশন উয়েফার মধ্যকার দ্বন্দ্ব গড়িয়েছে আদালত পর্যন্ত।…
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের সরকারি ছুটির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা। গভর্নর গ্যাভিন…
ভোলার মনপুরা উপজেলায় ১০০ ইয়াবা উদ্ধারসহ দুই যুবককে আটক করেছে পুলিশ। মঙ্গলবার ভোরে রামনেওয়াজ লঞ্চঘাট…
বলিউড তারকা রণবীর কাপুরের জন্মদিনে আলিয়া ভাট শেয়ার করলেন তাদের একান্ত ভালোবাসার মুহূর্তের ছবি, যা…
ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনে দাখিল করা মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই শেষে ৬ জন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করেছেন…
This website uses cookies.