
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ ও বৈশ্বিক সংকটের কারণে বাংলাদেশে তীব্র জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট দেখা দিয়েছে। রাজধানী থেকে শুরু করে গ্রাম-মফস্বল পর্যন্ত লোডশেডিং ফিরে এসেছে, যার প্রভাব পড়ছে বাসাবাড়ির রান্নার খরচ থেকে শুরু করে সিএনজি পাম্প, শিল্প উৎপাদন ও চিকিৎসাসেবায়। অথচ দেশের অভ্যন্তরেই বিপুল গ্যাস থাকা সত্ত্বেও মাত্র ৬০০ কোটি টাকার পাইপলাইন প্রকল্প আটকে রাখায় এই সংকটের তীব্রতা বহুগুণ বেড়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার মাধ্যমে শুরু হওয়া মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ ছয় মাস পার করেছে। সাড়ে তিন হাজার কিলোমিটার দূরের এই যুদ্ধের প্রভাব বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সরাসরি পড়েছে। দেশের জ্বালানি ও বিদ্যুতের প্রায় ৫০ শতাংশই গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। ২০১৬ সালের পর থেকে এই খাতকে ধারাবাহিকভাবে আমদানিনির্ভর করে তোলার চরম মাশুল এখন দিতে হচ্ছে। এর আগে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধও এই আমদানিনির্ভরতার বিপদ স্পষ্ট করে দিয়েছিল, কিন্তু তা থেকে কোনো শিক্ষা নেওয়া হয়নি।
জ্বালানি সংকটের কারণে দেশে মূল্যস্ফীতি বেড়ে ১৩ থেকে ১৪ শতাংশে পৌঁছেছে। প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানে মন্দা দেখা দিয়েছে, যার ফলে চব্বিশের জুলাই-আগস্টে সাধারণ মানুষ ও তরুণদের ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের সংকট দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশে প্রায় ৬ লাখ মানুষ চাকরি হারাতে পারে। সারের সংকটে চালের দাম ১০ শতাংশ বাড়লে নতুন করে ১৪ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যেতে পারে এবং ইউরিয়া সারের দাম দ্বিগুণ হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
বর্তমানে দেশের গ্যাসের চাহিদার ৪০ থেকে ৪২ শতাংশ মেটানো হয় দেশীয় উৎস থেকে। বাকিটা আমদানির ওপর নির্ভরশীল, যার ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়া এবং কাতারের মতো সরবরাহকারী দেশের অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পেট্রোবাংলার ছয়টি এলএনজি চুক্তির মধ্যে পাঁচটিই 'ফোর্স মেজার' ঘোষণা করা হয়েছে। ফলে স্পট মার্কেট থেকে দ্বিগুণ দামে এলএনজি কিনতে হচ্ছে।
এই সংকটের মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে ভোলার গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত না করা নিয়ে। ২০১৮ সালে ভোলা থেকে মূল ভূখণ্ডে গ্যাস আনার জন্য পাইপলাইন তৈরির সিদ্ধান্ত হলেও মাত্র ৬০০ কোটি টাকার জন্য আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রকল্পটি ফেলে রাখা হয়। অথচ এলএনজি আমদানিতে প্রতিবছর হাজার হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে। যে পাইপলাইন তখন ৬০০ কোটি টাকায় করা যেত, এখন তা করতে ৩ থেকে ৪ হাজার কোটি টাকা লাগবে। এমনকি বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাস পেরিয়ে গেলেও ভোলার গ্যাস জাতীয় গ্রিডে আনার বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত বা পাইপলাইন খুলনা নাকি ঢাকা পর্যন্ত হবে, তা নির্ধারণ করা হয়নি।
অথচ ভোলায় আবিষ্কৃত তিনটি গ্যাসক্ষেত্রে প্রায় ৫ টিসিএফ গ্যাস রয়েছে, যার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৫ লাখ কোটি টাকা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন ভূঁইয়া মনে করেন, বিদ্যমান গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উন্নয়ন, ডিপ ড্রিলিং ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে ১৮ টিসিএফ গ্যাস পাওয়া সম্ভব। মাত্র ১০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করলে ৫ লাখ কোটি টাকার গ্যাস পাওয়া যেতে পারে। বাপেক্সের কূপ খননে সাফল্যের হার অত্যন্ত বেশি, যেখানে বিশ্বে ৮-১০টি কূপ খনন করে একটিতে গ্যাস পাওয়া যায়, বাংলাদেশে প্রতি তিনটি কূপের একটিতে গ্যাস মিলছে। কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও সিলেটের পাশাপাশি ভোলা অঞ্চলকে দ্বিতীয় সম্ভাবনাময় হাইড্রোকার্বন হাব মনে করা হয়। শাহবাজপুর, ভোলা নর্থ, ইলিশা, সুন্দরপুর ও ফেনীর পাশাপাশি সাগরে কুতুবদিয়া ও সাঙ্গুতেও গ্যাসের সন্ধান মিলেছে।
তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি ২০১৭ সালে একটি মহাপরিকল্পনা দিয়েছিল। সম্প্রতি অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদ লিখেছেন, নিজস্ব গ্যাস উত্তোলন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির সমন্বিত ব্যবস্থাপনাই এই সংকটের টেকসই সমাধান। জ্বালানি খাতের এই দীর্ঘমেয়াদি সংকট থেকে মুক্তি পেতে দেশীয় সম্পদের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি।
ফলে গোটা অঞ্চলটি গ্যাসের জন্য অনেক বেশি সম্ভাবনাময়।.২০১৬-১৭ সালের পর থেকে দেশে ধারাবাহিকভাবে গ্যাসের উৎপাদন কমছে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মাহের আহমেদ, প্রধান সম্পাদক: মোঃ মোত্তালিব সরকার। প্রকাশক কর্তৃক ৫৫০বি, হজ্জ ক্যাম্প রোড, আশকোনা, দক্ষিণখান, ঢাকা-১২৩০, বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত। সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় (ঢাকা) : ৫৫০বি, হজ্জ ক্যাম্প রোড, আশকোনা, দক্ষিণখান, ঢাকা-১২৩০, বাংলাদেশ। আঞ্চলিক কার্যালয় (বগুড়া): টোলারগেট, শেরপুর–৫৮৪০, শেরপুর, বগুড়া। অফিস: ০১৭৭৬-১৩৬০৫০ (হোয়াটসঅ্যাপ), বিজ্ঞাপন: ০৯৬৯৭-৫৪৪৮২৭। ই-মেইল: dailyjokhonsomoy@gmail.com।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রনালয়ের বিধি মোতাবেক নিবন্ধনের জন্য আবেদিত ©সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © দৈনিক যখন সময় ২০২২