
বর্তমান বিশ্বে কোনো দেশই পুরোপুরি এককভাবে টিকে থাকতে পারে না। খাদ্য, জ্বালানি, প্রযুক্তি, কাঁচামাল, ওষুধ কিংবা শিল্পের যন্ত্রাংশ—প্রতিটি ক্ষেত্রেই দেশগুলো একে অপরের ওপর নির্ভরশীল। এই বাস্তবতায় নিরাপত্তা রক্ষার নামে বাণিজ্য বন্ধ বা কঠোরভাবে সীমিত করার প্রবণতা শেষ পর্যন্ত কার জন্য বেশি ক্ষতিকর, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সাম্প্রতিক বাণিজ্য ও প্রযুক্তি বিরোধ এই পরিস্থিতির একটি বড় উদাহরণ। এখানে কোনো পক্ষকে দোষী বা নির্দোষ বলার বিষয় নয়, বরং ঘটনাটি দেখায় যে বিশ্ব অর্থনীতির গভীর পারস্পরিক নির্ভরতার যুগে অর্থনৈতিক চাপ অনেক সময় প্রত্যাশার বিপরীত ফল তৈরি করতে পারে।
আধুনিক প্রযুক্তির জন্য অপরিহার্য 'রেয়ার আর্থ' বা বিরল খনিজ নিয়ে চীনের আধিপত্যের বিষয়টি এক্ষেত্রে একটি বাস্তব শিক্ষা। বৈদ্যুতিক গাড়ি, উইন্ড টারবাইন, শিল্পের শক্তিশালী মোটর, ইলেকট্রনিক পণ্য এবং প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতে এগুলোর ব্যবহার রয়েছে। আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থা (IEA)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে চীন বিশ্বে ম্যাগনেট রেয়ার আর্থ উত্তোলনের প্রায় ৬০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করলেও পরিশোধনের ক্ষেত্রে তাদের অংশ ছিল প্রায় ৯১ শতাংশ এবং পার্মানেন্ট ম্যাগনেট উৎপাদনে প্রায় ৯৪ শতাংশ। অর্থাৎ শুধু খনি থাকা যথেষ্ট নয়, প্রক্রিয়াজাত করার ক্ষমতাই প্রকৃত কৌশলগত শক্তি। ২০২৫ সালে চীন কিছু রেয়ার-আর্থ পণ্যের ওপর রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ আরোপ করার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশের গাড়ি নির্মাতারা সরবরাহ সংকটে পড়ে। IEA-এর হিসাবে, কিছু উৎপাদনকারীকে উৎপাদনের গতি কমাতে বা সাময়িকভাবে কারখানা বন্ধ করতেও হয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে, সরবরাহ-শৃঙ্খলের দুর্বলতা ব্যবহার করে প্রতিপক্ষকে চাপে ফেললে সেই শৃঙ্খলের ওপর নির্ভরশীল নিজের শিল্পও বিপদের মুখে পড়ে।
একই চিত্র দেখা যায় সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে। আধুনিক বিশ্বের আলোচনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI-এর জন্য অত্যাধুনিক চিপ সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেলেও, সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন চলে সাধারণ বা 'লেগেসি' ও 'ম্যাচিউর' চিপের ওপর। গাড়ি, ফ্রিজ, ওয়াশিং মেশিন, চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং নানা ধরনের বৈদ্যুতিক পণ্যে এসব চিপ ব্যবহৃত হয়। প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতায় কোনো দেশ যদি সরবরাহ সীমিত করে, তবে তার প্রভাব কেবল প্রতিপক্ষের ওপর পড়ে না। যেসব শিল্প ওই উপকরণের ওপর নির্ভরশীল, তাদের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায় এবং শেষ পর্যন্ত সেই বাড়তি ব্যয়ের একটি অংশ পণ্যের দামের মাধ্যমে সাধারণ ভোক্তার ওপর পড়ে। অর্থাৎ অর্থনৈতিক অস্ত্রের লক্ষ্য একটি দেশ হলেও, তার প্রভাব সাধারণ মানুষের বাজার পর্যন্ত পৌঁছায়।
আধুনিক বিশ্ব অর্থনীতির সরবরাহ-শৃঙ্খল একটি জালের মতো বিস্তৃত। এক দেশের কাঁচামাল অন্য দেশের কারখানায় যায়, সেখান থেকে উপাদান তৃতীয় দেশে এবং শেষ পণ্য চতুর্থ দেশে তৈরি হয়ে বিশ্ববাজারে বিক্রি হয়। এই ব্যবস্থাকে রাতারাতি ভেঙে ফেলা সম্ভব নয়। তাই 'সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নতা' একটি আকর্ষণীয় রাজনৈতিক ধারণা হলেও বাস্তবে তা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। জাতীয় নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে বিকল্প উৎস তৈরি করা প্রয়োজন এবং IEA-ও সরবরাহের বৈচিত্র্য, নতুন বিনিয়োগ, পুনর্ব্যবহার ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। তবে নির্ভরতা কমানো আর পৃথিবীকে অর্থনৈতিকভাবে ভাগ করে ফেলা এক বিষয় নয়।
বাণিজ্য যুদ্ধের হিসাব সাধারণত সরকার, কোম্পানি ও জাতীয় স্বার্থের ভাষায় করা হয়, কিন্তু এর প্রকৃত কুফল ভোগ করে সাধারণ মানুষ। পণ্যমূল্য বৃদ্ধি, চাকরির অনিশ্চয়তা, উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং উন্নয়নের সুযোগ কমে যাওয়া এর প্রধান পরিণতি। যে অর্থ দারিদ্র্য দূরীকরণ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জলবায়ু মোকাবিলা ও কর্মসংস্থানে ব্যয় হতে পারত, তার একটি বড় অংশ তখন বিকল্প সরবরাহ ব্যবস্থা তৈরি, অতিরিক্ত প্রতিরক্ষা, মজুত এবং বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতায় ব্যয় হয়। শান্তি কেবল একটি নৈতিক আদর্শ নয়, বরং অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটি বাস্তব শর্ত। যুদ্ধ ও সংঘাত সম্পদ নষ্ট করে, বাণিজ্যিক বিভাজন উৎপাদন ব্যয় বাড়ায় এবং অবিশ্বাস প্রযুক্তি ও জ্ঞান বিনিময়কে বাধাগ্রস্ত করে। প্রতিবেশীকে দুর্বল করতে গিয়ে নিজের অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করা কোনো প্রকৃত বিজয় নয়। বিশ্বের ভবিষ্যৎ হওয়া উচিত প্রতিযোগিতার সঙ্গে সহযোগিতা, নিরাপত্তার সঙ্গে বাণিজ্য এবং জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে বৈশ্বিক মানবিক স্বার্থের ভারসাম্য।
বিরল খনিজ: একটি বাস্তব শিক্ষা Rare earth বা বিরল খনিজ আধুনিক প্রযুক্তির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মাহের আহমেদ, প্রধান সম্পাদক: মোঃ মোত্তালিব সরকার। প্রকাশক কর্তৃক ৫৫০বি, হজ্জ ক্যাম্প রোড, আশকোনা, দক্ষিণখান, ঢাকা-১২৩০, বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত। সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় (ঢাকা) : ৫৫০বি, হজ্জ ক্যাম্প রোড, আশকোনা, দক্ষিণখান, ঢাকা-১২৩০, বাংলাদেশ। আঞ্চলিক কার্যালয় (বগুড়া): টোলারগেট, শেরপুর–৫৮৪০, শেরপুর, বগুড়া। অফিস: ০১৭৭৬-১৩৬০৫০ (হোয়াটসঅ্যাপ), বিজ্ঞাপন: ০৯৬৯৭-৫৪৪৮২৭। ই-মেইল: dailyjokhonsomoy@gmail.com।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রনালয়ের বিধি মোতাবেক নিবন্ধনের জন্য আবেদিত ©সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © দৈনিক যখন সময় ২০২২