
মক্কা মুসলমানদের কাছে কেবল একটি শহর নয়, এর ধর্মীয় ও প্রতীকী গুরুত্ব অপরিসীম। এই প্রেক্ষাপটে ২০২৬ সালের ৭ আগস্ট সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান যখন ‘মক্কা জয়েন্ট ডিফেন্স অ্যাগ্রিমেন্ট’ বা মক্কা চুক্তি স্বাক্ষর করে, তখন তা সাধারণ সামরিক সমঝোতার গণ্ডি পেরিয়ে যায়। চুক্তিটির মূল নীতি হলো—তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র আক্রমণকে সবার ওপর আক্রমণ হিসেবে গণ্য করা হবে। এই ভাষা ন্যাটোর আর্টিকেল ৫-এর কথা মনে করিয়ে দেয় বলে অনেকে একে ‘মুসলিম ন্যাটো’ বা ‘ইসলামিক ন্যাটো’ হিসেবে অভিহিত করছেন। তবে লেখক এ কে এম আহসান উল্লাহর মতে, এই তুলনা পুরোপুরি নির্ভুল নয়। ন্যাটোর মতো সমন্বিত সামরিক কমান্ড, যৌথ পরিকল্পনা, ইন্টার-অপারেবল ফোর্সেস বা প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামোর অস্তিত্ব মক্কা চুক্তিতে এখনো স্পষ্ট নয়। এর অপারেশনাল আর্কিটেকচার, আক্রমণের সংজ্ঞা, ভৌগোলিক সীমা এবং সদস্যদের সুনির্দিষ্ট সামরিক দায়বদ্ধতা এখনো অস্পষ্ট।
চুক্তি স্বাক্ষরকারী তিন দেশের সামর্থ্য পরস্পরের পরিপূরক। সৌদি আরবের রয়েছে অর্থনৈতিক শক্তি ও জ্বালানি সম্পদ, তুরস্কের ন্যাটো-অভিজ্ঞ সামরিক বাহিনী ও প্রতিরক্ষা শিল্প এবং পাকিস্তানের বড় সামরিক বাহিনী ও পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডার। এই তিন দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি, ড্রোন, সাইবার নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সহযোগিতার গভীরতা আঞ্চলিক প্রভাব ফেলতে পারে। চুক্তিটির সময়কালও তাৎপর্যপূর্ণ। মার্কিন নিরাপত্তা নিশ্চয়তার ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন এবং আঞ্চলিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে এটি ‘রিজিওনাল স্ট্র্যাটেজিক অটোনমি’ বা আঞ্চলিক কৌশলগত স্বনির্ভরতা তৈরির একটি প্রচেষ্টা।
২৭ আগস্ট জাতীয় সংসদে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান জানান, চুক্তিটি তিনটি দেশের মধ্যে হয়েছে এবং বাংলাদেশ একে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে। তিনি বলেন, সদস্যদেশগুলো যদি বাংলাদেশকে অন্তর্ভুক্ত করার অভিপ্রায় প্রকাশ করে, তবে বাংলাদেশ তা ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করবে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, এটি বিশ্ব মুসলিম সমাজের আত্মরক্ষার ব্যবস্থা এবং মুসলিম পরিবারের অভ্যন্তরীণ বিষয়। তবে বাংলাদেশের জন্য এই চুক্তিতে যোগদানের পক্ষে ও বিপক্ষে উভয় ধরনের যুক্তি রয়েছে। একদিকে প্রতিরক্ষা আধুনিকায়ন, সামরিক প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার সুযোগ রয়েছে, অন্যদিকে ভারতের সাথে কৌশলগত অস্বস্তি তৈরির ঝুঁকিও রয়েছে। বাংলাদেশ যদি পূর্ণ সদস্য হয়, তবে নয়াদিল্লি একে পাকিস্তান ও তুরস্ককে কেন্দ্র করে যৌথ নিরাপত্তাবলয়ের দিকে বাংলাদেশের ঝোঁক হিসেবে ব্যাখ্যা করতে পারে।
এছাড়া ইরান বা তুরস্কের আঞ্চলিক সংঘাতের ক্ষেত্রে ‘কালেকটিভ ডিফেন্স ক্লজ’ বাংলাদেশের জন্য কী ধরনের বাধ্যবাধকতা তৈরি করবে, তা নিয়ে অস্পষ্টতা রয়েছে। বাংলাদেশকে কি সেনা পাঠাতে হবে, আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি দিতে হবে, নাকি গোয়েন্দা তথ্য দিতে হবে? এসব প্রশ্নের উত্তর পরিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত সদস্যপদের প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ করা অসম্ভব। চীনের সাথে বাংলাদেশের গভীর অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষা সম্পর্ক এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখা বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির বড় শক্তি। কোনো সামরিক জোটে প্রবেশ করে সেই ফ্লেক্সিবিলিটি সংকুচিত করা উচিত হবে না।
লেখক বাংলাদেশের জন্য তৃতীয় একটি পথের পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি মনে করেন, পূর্ণ সদস্য হওয়ার আগে বাংলাদেশের উচিত চুক্তির আইনি কাঠামো পরীক্ষা করা। অন্তত চারটি প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন: কোন পরিস্থিতিতে ক্লজটি কার্যকর হবে, ভৌগোলিক পরিধি কী, কী ধরনের সামরিক সহায়তা দিতে হবে এবং বাংলাদেশ নিজের ‘সভরেন ভেটো’ বজায় রাখতে পারবে কি না। বাংলাদেশ শুরুতে পূর্ণ সদস্য না হয়ে পর্যবেক্ষক বা প্রতিরক্ষা সহযোগিতার অংশীদার হওয়ার প্রস্তাব করতে পারে। যদি পূর্ণ সদস্য হওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তবে তার আগে ভারত, ইরান, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো অংশীদারদের সাথে ‘প্রিভেন্টিভ ডিপ্লোমেসি’ বা আগাম কূটনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশের মূল নীতি হওয়া উচিত বন্ধু বাড়ানো, কিন্তু বন্ধুদের শত্রু আমদানি না করা। রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা চুক্তি ধর্মীয় আবেগ দিয়ে নয়, বরং আইনি বাধ্যবাধকতা দিয়ে বিচার করাই শ্রেয়।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মাহের আহমেদ, প্রধান সম্পাদক: মোঃ মোত্তালিব সরকার। প্রকাশক কর্তৃক ৫৫০বি, হজ্জ ক্যাম্প রোড, আশকোনা, দক্ষিণখান, ঢাকা-১২৩০, বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত। সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় (ঢাকা) : ৫৫০বি, হজ্জ ক্যাম্প রোড, আশকোনা, দক্ষিণখান, ঢাকা-১২৩০, বাংলাদেশ। আঞ্চলিক কার্যালয় (বগুড়া): টোলারগেট, শেরপুর–৫৮৪০, শেরপুর, বগুড়া। অফিস: ০১৭৭৬-১৩৬০৫০ (হোয়াটসঅ্যাপ), বিজ্ঞাপন: ০৯৬৯৭-৫৪৪৮২৭। ই-মেইল: dailyjokhonsomoy@gmail.com।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রনালয়ের বিধি মোতাবেক নিবন্ধনের জন্য আবেদিত ©সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © দৈনিক যখন সময় ২০২২