
দেশের বিভিন্ন স্থানে কনসার্ট, গান-বাজনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে হামলা, ভাঙচুর ও হুমকির ঘটনা নাগরিক সমাজের মধ্যে গভীর উদ্বেগ ও মবভীতি তৈরি করছে। সম্প্রতি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পুলিশের অনুষ্ঠানে হামলা এবং কিশোরগঞ্জে ধর্মীয় সংগঠনের হুমকির মুখে কনসার্ট বন্ধের ঘটনা এই আলোচনাকে নতুন করে সামনে এনেছে। সংস্কৃতিচর্চায় সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের ইতিবাচক মনোভাবের বিপরীতে মাঠপর্যায়ে উগ্রবাদী তৎপরতা ও প্রশাসনের নতি স্বীকারের প্রবণতা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছে।
সম্প্রতি রংপুরের গঙ্গাচড়ার খুদে সংগীতশিল্পী অনুশ্রী রায়ের চিঠি পেয়ে তাকে ঢাকায় আমন্ত্রণ জানিয়ে হারমোনিয়াম উপহার দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী। ছবি আঁকা ও গান শেখার মতো সংস্কৃতিচর্চাকে উৎসাহিত করে সরকারপ্রধানের একাধিক বক্তব্য প্রশংসিত হলেও মাঠপর্যায়ের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। গত ১৮ আগস্ট ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পুলিশ লাইনসের ভেতরে জেলা পুলিশের আয়োজিত একটি গানের অনুষ্ঠান চলাকালে উচ্চ স্বরে গান-বাজনার অভিযোগ তুলে রাত সাড়ে ১১টার দিকে মাদ্রাসার কয়েকজন শিক্ষার্থী সেখানে গিয়ে বাধা দেন। পরবর্তীতে দারুল আরকাম ইসলামিয়া মাদ্রাসার শতাধিক শিক্ষার্থী পুলিশ লাইনসে ঢুকে চেয়ার ভাঙচুর করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ লাঠিপেটা করলে শিক্ষার্থীরা ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে, যাতে ৭ পুলিশ সদস্যসহ উভয় পক্ষের অন্তত ৩০ জন আহত হন। হামলাকারী শিক্ষার্থীরা হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব সাজিদুর রহমান প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসার ছাত্র। আমরা দেখলাম, প্রধানমন্ত্রী যখন চট্টগ্রাম সফরে গিয়ে হেফাজতে ইসলামের আমিরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে আসেন, তার ৮-১০ দিন পর হেফাজতেরই মহাসচিবের প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের দ্বারা পুলিশের অনুষ্ঠান হামলার শিকার হয়। এ ঘটনার পর রাত দুইটা-তিনটা পর্যন্ত মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা শহরের বিভিন্ন সড়কে বিক্ষোভ করেন।
can অন্যদিকে, ১৯ আগস্ট কিশোরগঞ্জ পুরাতন স্টেডিয়ামে ‘অ্যাশেজ’ ও ‘নোবেলম্যান’ সহ একাধিক ব্যান্ডের পারফর্ম করার কথা থাকলেও ইমাম-উলামা পরিষদের হুমকির মুখে কনসার্টটি বন্ধ হয়ে যায়। সংগঠনটির সভাপতি মাওলানা আহমাদুল্লাহ জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত আবেদনে এই কনসার্টকে ‘শরিয়তবিরোধী’ ও ‘আল্লাহর গজব আসার কারণ’ বলে উল্লেখ করেন এবং অনুষ্ঠান হলে ‘পরিস্থিতি ঘোলাটে হওয়ার’ হুমকি দেন। এমনকি ফেসবুকে এক মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল হুমকি দিয়ে লেখেন, ‘কিশোরগঞ্জে যদি ASHES আসে, তাহলে তাদের সত্যিই ASHES—অর্থাৎ ছাই বানিয়ে দেওয়া হবে।’ শেষ পর্যন্ত জেলা প্রশাসন কনসার্টটি স্থগিত করে। এ বিষয়ে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক জানান, হোটেল নিবন্ধন আইন অনুযায়ী আয়োজকেরা আবেদন বা লাইসেন্স না নেওয়ায় এতে সম্মতি দেওয়ার সুযোগ ছিল না। তবে এই সিদ্ধান্তকে প্রশাসনের উগ্রবাদী গোষ্ঠীর কাছে নতি স্বীকার হিসেবেই দেখছেন অনেকে।
সাংস্কৃতিক আয়োজনের পাশাপাশি মাজার ও ওরসে হামলা এবং মব ভায়োলেন্সের ঘটনাও অব্যাহত রয়েছে। কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের ফিলিপনগরে এক পীরকে হত্যা এবং তাঁর আস্তানায় ভাঙচুরের ঘটনায় জামায়াত, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের জড়িত থাকার তথ্য গণমাধ্যমে এসেছে। এছাড়া ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় একটি স্কুলে ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ সিনেমার প্রদর্শনীকে ‘অশ্লীল’ আখ্যা দিয়ে কওমী ছাত্র ঐক্য পরিষদের হুমকির পর স্থানীয় প্রশাসন তা বন্ধ করে দেয়।
বিএনপি সরকারের ছয় মাসের মাথায় দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা নিয়ে নানা পর্যালোচনা চলছে। সরকারের এই সময়ে মাজার, ওরস, কাওয়ালি ও গানের অনুষ্ঠানে হামলা-ভাঙচুর এবং উগ্রপন্থীদের ক্ষমতাচর্চা নিয়ে ভীতি ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। নাগরিক সমাজের একাংশের মতে, উগ্রবাদী গোষ্ঠীর দাবির মুখে রাষ্ট্র ও প্রশাসনের এই নতি স্বীকার সমাজে এই বার্তাই দিচ্ছে যে, আইনের চেয়ে পেশিশক্তি ও হুমকিই এখন শেষ কথা। প্রতিটি ঘটনার পেছনে একই ছক দেখা যাচ্ছে—প্রথমে আপত্তি তুলে বাধা দেওয়া এবং পরে প্রশাসন কর্তৃক নাগরিকদের সাংবিধানিক অধিকার রক্ষার পরিবর্তে অনুষ্ঠান বাতিল করা। এই প্রবণতা সরকারের জন্য আগামীতে আরও কঠিন পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ই-মেইল: rafsangalib1990@gmail.comমতামত লেখকের নিজস্ব
সম্পাদক ও প্রকাশক: মাহের আহমেদ, প্রধান সম্পাদক: মোঃ মোত্তালিব সরকার। প্রকাশক কর্তৃক ৫৫০বি, হজ্জ ক্যাম্প রোড, আশকোনা, দক্ষিণখান, ঢাকা-১২৩০, বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত। সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় (ঢাকা) : ৫৫০বি, হজ্জ ক্যাম্প রোড, আশকোনা, দক্ষিণখান, ঢাকা-১২৩০, বাংলাদেশ। আঞ্চলিক কার্যালয় (বগুড়া): টোলারগেট, শেরপুর–৫৮৪০, শেরপুর, বগুড়া। অফিস: ০১৭৭৬-১৩৬০৫০ (হোয়াটসঅ্যাপ), বিজ্ঞাপন: ০৯৬৯৭-৫৪৪৮২৭। ই-মেইল: dailyjokhonsomoy@gmail.com।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রনালয়ের বিধি মোতাবেক নিবন্ধনের জন্য আবেদিত ©সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © দৈনিক যখন সময় ২০২২