
জুলাইয়ের আন্দোলন কেবল একটি সরকার পরিবর্তনের প্রচেষ্টা ছিল না; এটি ছিল রাষ্ট্রের রাজনীতি, নাগরিক অধিকার এবং সামগ্রিক শাসনব্যবস্থার প্রশ্নে জনগণের গভীর প্রত্যাশার বহিঃপ্রকাশ। অগণিত মানুষের আত্মত্যাগ এবং সাহসিকতায় এই আন্দোলন একটি ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের মর্যাদা পেয়েছে। বর্তমান রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে যখন শুধু নির্বাচন, সরকার গঠন কিংবা সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার বিষয়টি উঠে আসছে, তখন একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে চলে আসে—জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা কি সত্যিই শুধু নির্বাচন ছিল?
একটি রাষ্ট্রে যদি বিচারহীনতা, দুর্নীতি, প্রশাসনের দলীয়করণ, মানবাধিকার লঙ্ঘন, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং জবাবদিহির সংকট বিদ্যমান থাকে, তবে কেবল ভোটের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তন করলেই সেই রাষ্ট্রকে সত্যিকার অর্থে গণতান্ত্রিক বলা যায় না। জুলাইয়ের আন্দোলনে মানুষ শুধু একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়নি, তারা চেয়েছিল রাষ্ট্রকাঠামোর আমূল পরিবর্তন। তাদের স্বপ্ন ছিল একটি ন্যায়ভিত্তিক, জবাবদিহিমূলক এবং বৈষম্যহীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার।
নির্বাচনব্যবস্থায় বাংলাদেশের প্রচলিত পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। কোনো দল বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পেলেই ধরে নেওয়া যায় না যে দেশের সমগ্র জনগণ সেই দলের প্রতি পূর্ণ সমর্থন দিয়েছে। জাতীয়ভাবে কোনো দল মোট ভোটের অর্ধেক বা তার চেয়ে কম ভোট পেয়েও সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ আসন পেতে পারে। এটি আইনগতভাবে বৈধ হলেও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নে সীমাবদ্ধতা তৈরি করে। নির্বাচন সরকার গঠনের অধিকার দিলেও জনগণের সব আকাঙ্ক্ষার একচ্ছত্র প্রতিনিধি হওয়ার নৈতিক অধিকার তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেয় না।
জুলাইয়ের আত্মত্যাগের প্রকৃত মূল্যায়ন করতে হলে নির্বাচনের পর বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, প্রশাসনের রাজনৈতিক প্রভাবমুক্তি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নাগরিক অধিকার রক্ষার ভূমিকা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার, কর্মসংস্থান, দ্রব্যমূল্যের নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংক খাতের সুশাসন এবং জ্বালানি খাতে স্বচ্ছতার মতো বিষয়গুলো কেবল নির্বাচনি ইশতেহারে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তবে প্রতিফলন ঘটাতে হবে।
আগামীর রাজনীতির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো নির্বাচনকে গণতন্ত্রের সূচনা হিসেবে দেখা, সমাপ্তি হিসেবে নয়। যদি নির্বাচনকে পুরোনো ক্ষমতার কাঠামো নতুন রূপে ফিরিয়ে আনার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তবে গণঅভ্যুত্থানের মূল চেতনা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এমন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলা প্রয়োজন যেখানে ক্ষমতার উৎস জনগণ এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো জনগণের কাছে জবাবদিহি করবে। সংসদ শক্তিশালী হবে কিন্তু জনগণের ঊর্ধ্বে নয়, সরকার কার্যকর হবে কিন্তু সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয় এবং সংবিধান সম্মানিত হবে কিন্তু জনগণের ন্যায়সংগত প্রত্যাশার বিরুদ্ধে নয়।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মাহের আহমেদ, প্রধান সম্পাদক: মোঃ মোত্তালিব সরকার। প্রকাশক কর্তৃক ৫৫০বি, হজ্জ ক্যাম্প রোড, আশকোনা, দক্ষিণখান, ঢাকা-১২৩০, বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত। সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় (ঢাকা) : ৫৫০বি, হজ্জ ক্যাম্প রোড, আশকোনা, দক্ষিণখান, ঢাকা-১২৩০, বাংলাদেশ। আঞ্চলিক কার্যালয় (বগুড়া): টোলারগেট, শেরপুর–৫৮৪০, শেরপুর, বগুড়া। অফিস: ০১৭৭৬-১৩৬০৫০ (হোয়াটসঅ্যাপ), বিজ্ঞাপন: ০৯৬৯৭-৫৪৪৮২৭। ই-মেইল: dailyjokhonsomoy@gmail.com।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রনালয়ের বিধি মোতাবেক নিবন্ধনের জন্য আবেদিত ©সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © দৈনিক যখন সময় ২০২২