
বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরার নৌযানের অবস্থান শনাক্ত করা, সমুদ্রে চলাচল পর্যবেক্ষণ এবং অবৈধ কর্মকাণ্ডের তথ্য সংগ্রহে একটি অত্যাধুনিক স্যাটেলাইটভিত্তিক নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছে বাংলাদেশ সরকার। বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেড (বিএসসিএল) এই উদ্যোগ নিয়েছে, যার আনুমানিক ব্যয় ধরা হয়েছে ৬০০ কোটি টাকা। এই নজরদারি ব্যবস্থা পরিচালনার জন্য কম উচ্চতার চারটি স্যাটেলাইট ব্যবহার করা হবে বলে সংস্থাটির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
বিএসসিএল-এর এই প্রস্তাবিত সামুদ্রিক নজরদারি ব্যবস্থা ২০১৮ সালে উৎক্ষেপিত বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ থেকে প্রযুক্তিগতভাবে ভিন্ন উদ্দেশ্যে তৈরি হবে, যা মূলত সিগন্যাল আদান-প্রদান ও সম্প্রচারের কাজ করে। বর্তমানে এই প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই চলছে, যা অক্টোবরের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বিএসসিএল-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মুহাম্মদ ইমাদুর রহমান প্রথম আলোকে জানান, সম্ভাব্যতা যাচাই শেষে প্রকল্পের প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্য চূড়ান্ত করে নির্মাতা প্রতিষ্ঠান নিয়োগে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হবে। চলতি বছরের মধ্যে সিদ্ধান্ত নেওয়া গেলে ২০২৮ সালের মধ্যে প্রকল্পটি সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অটোমেটিক আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম বা এআইএস মূলত নৌযানের পরিচয়, অবস্থান, গতি ও চলাচলের দিকসংক্রান্ত তথ্য আদান-প্রদানের একটি ব্যবস্থা। প্রচলিত ব্যবস্থায় উপকূলীয় রেডিও অবকাঠামোর মাধ্যমে এই তথ্য গ্রহণ করা হয়। তবে স্যাটেলাইটভিত্তিক এআইএস ব্যবস্থায় উপগ্রহের মাধ্যমে সমুদ্রে থাকা নৌযানের সংকেত গ্রহণ করে দূরবর্তী অবস্থান থেকেও তার চলাচল সম্পর্কে তথ্য পাওয়া সম্ভব। তবে এই ব্যবস্থায় কেবল যেসব নৌযানে উপযুক্ত যন্ত্র স্থাপন করা থাকবে এবং সংকেত গ্রহণ করা সম্ভব হবে, সেগুলোর তথ্যই পাওয়া যাবে।
২০১২ সালে মিয়ানমার এবং ২০১৪ সালে ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তির পর বাংলাদেশ বঙ্গোপসাগরে ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার এলাকার অধিকার লাভ করে। সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, এই বিশাল সমুদ্র এলাকায় মৎস্য আহরণ, নৌযান চলাচল ও সামুদ্রিক সম্পদের ব্যবহার তদারকির জন্য কার্যকর নজরদারি অত্যন্ত জরুরি। বিএসসিএল-এর নথিপত্রে এই নজরদারির জন্য চারটি স্যাটেলাইট, দুটি গ্রাউন্ড স্টেশন এবং তথ্য প্রক্রিয়াকরণের জন্য স্থানীয় সার্ভার অবকাঠামোর প্রস্তাব রয়েছে। এতে পুরো বঙ্গোপসাগরীয় এলাকায় সর্বোচ্চ ৩০ মিনিটের ‘রিভিজিট টাইম’র লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, অর্থাৎ কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় স্যাটেলাইটের পুনরায় পর্যবেক্ষণের মধ্যবর্তী সময় হবে ৩০ মিনিট।
বিএসসিএল সূত্র আরও জানায়, দেশের অভ্যন্তরে তথ্য প্রক্রিয়াকরণ ও সংরক্ষণের জন্য স্থানীয় সার্ভার ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। এর উদ্দেশ্য হলো জাতীয় পর্যায়ে সামুদ্রিক তথ্যের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা এবং বিদেশি তৃতীয় পক্ষের ওপর নির্ভরতা কমানো।
এই নজরদারি ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে মৎস্য অধিদপ্তরের সামুদ্রিক মৎস্য দপ্তরের পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) মো. নজরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, সমুদ্রে মাছ ধরার নৌযান পর্যবেক্ষণে স্যাটেলাইটভিত্তিক নজরদারি ব্যবস্থা প্রয়োজন। এর মাধ্যমে নৌযানের অবস্থান শনাক্ত করা এবং মাছ ধরার নির্ধারিত নিয়ম মানা হচ্ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ করা সহজ হবে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, বর্তমানে নির্দিষ্ট গভীরতার বাইরে মাছ ধরার নিয়ম থাকলেও কিছু নৌযান তা মানে না। নৌযানের অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও চেকপোস্টের সঙ্গে সমন্বয় করে ব্যবহার করা গেলে আইন বাস্তবায়ন ও নজরদারিতে সুবিধা হবে।
ইউএসএআইডির অর্থায়নে পরিচালিত আন্তর্জাতিক মৎস্য গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ওয়ার্ল্ডফিশের ইকোফিশ-২ অ্যাকটিভিটি বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, উপকূলীয় এলাকার ৫০ লাখের বেশি মানুষের আয়ের প্রধান উৎস সামুদ্রিক মৎস্য সম্পদ। এর বাইরে বঙ্গোপসাগরে ট্রলার ডুবে জেলেদের মৃত্যু, ঢেউয়ের তোড়ে ভেসে ভিনদেশের জলসীমায় চলে যাওয়ার ঘটনা প্রায়ই ঘটে। মাছ ধরার ট্রলারগুলোয় দিকনির্ণয়ের যন্ত্রপাতি থাকে না, জেলেরা গভীর সাগরে আকাশের তারা দেখে দিক নির্ণয় করেন। আবার ঝড়ের কবলে পড়লে তাঁরা দিকহারা হয়ে ভেসে যান ভিনদেশে। জেলেদের নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা যুক্তরাজ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক দাতব্য প্রতিষ্ঠান লয়েডস রেজিস্টার ফাউন্ডেশনের ‘ফিশসেফ’ ২০২৫ প্রকল্পের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতিবছর ১ হাজার ৩৫০ জনেরও বেশি জেলে শুধু নিরাপত্তা সরঞ্জামের অভাবে সাগরে মারা যান।
বিএসসিএল-এর হিসাব অনুযায়ী, নৌযানের অবস্থান ও চলাচলের তথ্য ব্যবহার করে যাত্রাপথ পরিকল্পনা করা গেলে জেলেদের অপ্রয়োজনীয় চলাচল কমবে, যার ফলে জ্বালানি সাশ্রয় হবে। তাদের হিসেবে, পরিকল্পিতভাবে যাত্রা করলে একটি নৌকা একবারের যাত্রায় ১৫০ লিটার পর্যন্ত ডিজেল সাশ্রয় করতে পারবে। এই হিসাবে বছরে মোট জ্বালানি সাশ্রয় হবে ৪ কোটি ৫০ লাখ লিটার, যার আর্থিক মূল্য ৪৫৯ কোটি টাকা। মৎস্য অধিদপ্তরের হিসাবে দেশে প্রায় ৩০ হাজার ক্ষুদ্র বা আর্টিসানাল মাছ ধরার নৌকা নিবন্ধিত রয়েছে। এর বাইরে অন্তত আরও ৭০ হাজার অনিবন্ধিত নৌকা আছে বলে অধিদপ্তরের একটি সূত্র জানিয়েছে। স্যাটেলাইট নজরদারির মাধ্যমে সহজেই অবৈধ নৌযান শনাক্ত করা যাবে বলে বিএসসিএল মনে করে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যেসব নৌযানে এআইএস যন্ত্র নেই, বা যেসব নৌযান ইচ্ছাকৃতভাবে এই যন্ত্রের সংকেত বন্ধ রাখে, সেগুলো প্রচলিত এআইএস ব্যবস্থায় শনাক্ত করা কঠিন। ফলে প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় কত ধরনের নৌযান শনাক্ত করা যাবে এবং নজরদারির জন্য অন্য কোনো প্রযুক্তির প্রয়োজন হবে কি না, সে প্রশ্নও থেকে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ওকলাহোমার স্কুল অব কম্পিউটার সায়েন্সের অধ্যাপক মোহাম্মদ আতিকুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, এআইএসের পাশাপাশি সিনথেটিক অ্যাপারচার রাডারের (এসএআর) মতো প্রযুক্তি ব্যবহার করা প্রয়োজন, যার মাধ্যমে এআইএসের সংকেত না পাঠানো নৌযানও শনাক্ত করা সম্ভব।
স্যাটেলাইট বিশেষজ্ঞ আতিকুজ্জামান বিনিয়োগের আগে প্রকল্পটির কারিগরি ও অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা ভালোভাবে যাচাই করার ওপরেও গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, চারটি স্যাটেলাইট দিয়ে প্রয়োজনীয় এলাকায় নজরদারি সম্ভব কি না, তা খতিয়ে দেখতে হবে। প্রকল্পের ব্যয় ও সুফল কতটা এবং আন্তর্জাতিক স্যাটেলাইট পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে একই ধরনের সেবা নেওয়া তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী হবে কি না, সেসব বিষয়ও বিশ্লেষণ করা দরকার।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মাহের আহমেদ, প্রধান সম্পাদক: মোঃ মোত্তালিব সরকার। প্রকাশক কর্তৃক ৫৫০বি, হজ্জ ক্যাম্প রোড, আশকোনা, দক্ষিণখান, ঢাকা-১২৩০, বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত। সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় (ঢাকা) : ৫৫০বি, হজ্জ ক্যাম্প রোড, আশকোনা, দক্ষিণখান, ঢাকা-১২৩০, বাংলাদেশ। আঞ্চলিক কার্যালয় (বগুড়া): টোলারগেট, শেরপুর–৫৮৪০, শেরপুর, বগুড়া। অফিস: ০১৭৭৬-১৩৬০৫০ (হোয়াটসঅ্যাপ), বিজ্ঞাপন: ০৯৬৯৭-৫৪৪৮২৭। ই-মেইল: dailyjokhonsomoy@gmail.com।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রনালয়ের বিধি মোতাবেক নিবন্ধনের জন্য আবেদিত ©সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © দৈনিক যখন সময় ২০২২