
কক্সবাজার বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। সাগরের নীল জলরাশির দিকে ১ হাজার ৭০০ ফুট বাড়িয়ে রানওয়ের দৈর্ঘ্য এখন ১০ হাজার ৭০০ ফুটে উন্নীত করা হয়েছে। এর ফলে বোয়িং ৭৭৭-৩০০ ইআর-এর মতো সুপরিসর ও বড় আকারের উড়োজাহাজ এখানে অনায়াসে ওঠানামা করতে পারবে। নতুন আন্তর্জাতিক যাত্রী টার্মিনালও প্রস্তুত করা হয়েছে। সব ঠিক থাকলে চলতি অক্টোবর মাসেই এই বিমানবন্দর থেকে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালুর পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)।
বেবিচকের তথ্য অনুযায়ী, গত আগস্ট পর্যন্ত বিমানবন্দর উন্নয়নকাজের অগ্রগতি ৯৮ দশমিক ৯৭ শতাংশ এবং রানওয়ের কাজের অগ্রগতি ৯১ দশমিক ৬৫ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে এই দুটি প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হবে। বর্তমানে রানওয়ের নিরাপত্তা সীমানাপ্রাচীর, টহল সড়ক ও নিষ্কাশনব্যবস্থার কিছু কাজ চলমান রয়েছে। গত ২৩ সেপ্টেম্বর বিমানবন্দরটি পরিদর্শন করে বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক জানান, অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম পরিচালনার পর চলতি মাসেই বিমানবন্দরটির আন্তর্জাতিক কার্যক্রম উদ্বোধন করা হবে। এটি চালু হলে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটের পর দেশের চতুর্থ বিমানবন্দর হিসেবে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনা করবে কক্সবাজার।
নতুন এই বিমানবন্দরে প্রতিকূল আবহাওয়াতেও উড়োজাহাজ নিরাপদে ওঠানামার জন্য রানওয়েতে ক্যাটাগরি-২ এয়ারফিল্ড গ্রাউন্ড লাইটিং (এজিএল) ব্যবস্থা বসানো হয়েছে। এছাড়া সমুদ্রের দিকে রয়েছে ২ হাজার ২০০ ফুট দীর্ঘ প্রিসিশন অ্যাপ্রোচ লাইট, যা কুয়াশা বা বৃষ্টির মতো পরিস্থিতিতে উড়োজাহাজকে রানওয়ের দিকে নিরাপদে পরিচালনায় সাহায্য করবে। ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ঝুঁকি বিবেচনায় সমুদ্রতীরে একটি শক্তিশালী রক্ষাপ্রাচীরও নির্মাণ করা হয়েছে। গত ২৮ সেপ্টেম্বর সকালে বেসরকারি কয়েকটি বিমান পরিবহন সংস্থা এই নতুন রানওয়েতে পরীক্ষামূলকভাবে ফ্লাইট পরিচালনা করেছে।
কক্সবাজার বিমানবন্দরে নির্মিত দৃষ্টিনন্দন ঝিনুক আকৃতির টার্মিনাল ভবনের আয়তন ১৭ হাজার ৯৫৬ বর্গমিটার। এর আন্তর্জাতিক যাত্রী বহির্গমন লাউঞ্জে একসঙ্গে ৪৫০ জনের ধারণক্ষমতা রয়েছে। টার্মিনালে থাকছে একটি বোর্ডিং ব্রিজ, লিফট, এস্কেলেটর ও কনভেয়ার বেল্ট। বহির্গমন ও আগমনী ইমিগ্রেশন ডেসকের পাশাপাশি রয়েছে আগমনী লাউঞ্জ ও ডিউটি ফ্রি শপ। নিরাপত্তার জন্য সিসিটিভি ও ভারী হ্যান্ড লাগেজ স্ক্যানিং ব্যবস্থা বসানো হচ্ছে। ফ্লাইটের তথ্য জানাতে থাকবে ফ্লাইট ইনফরমেশন ডিসপ্লে সিস্টেম (এফআইডিএস), ঘোষণা ব্যবস্থা ও সাইনেজ।
বিমানবন্ধরের অ্যাপ্রোনের আয়তন ৩৬ হাজার ৩০০ বর্গমিটার, যেখানে দুটি সুপরিসর ও তিনটি ক্লাস-৮ উড়োজাহাজ পার্ক করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। রানওয়ের সঙ্গে পার্কিং ইয়ার্ড বা টার্মিনালের সংযোগ স্থাপনের জন্য দুটি ট্যাক্সিওয়ে তৈরি করা হয়েছে। টার্মিনালের সামনে গাড়ি পার্কিংয়ের জন্য ৩৫টি ভিআইপি ও ৯০টি সাধারণ গাড়ির জায়গা রাখা হয়েছে।
কক্সবাজার বিমানবন্দরকে একটি পূর্ণাঙ্গ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও এভিয়েশন হাব হিসেবে গড়ে তুলতে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে মোট তিনটি উন্নয়ন প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে তৃতীয় প্রকল্পের আওতায় বিমানবন্দরের পশ্চিম পাশে ৬৮২ একর জমিতে নতুন অবকাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এই পরিকল্পনায় রয়েছে নতুন প্যাসেঞ্জার টার্মিনাল, নিয়ন্ত্রণ টাওয়ার, প্রশাসনিক ভবন, কার্গো কমপ্লেক্স, কনভেনশন ও বিজনেস সেন্টার, জেনারেল এভিয়েশন ও এভিয়েশন ট্রেনিং সেন্টার। এছাড়া থাকবে এয়ারপোর্ট কোয়ারেন্টাইন হাসপাতাল, সমান্তরাল ট্যাক্সিওয়ে ও রিফুয়েলিংয়ের ব্যবস্থা। তবে এই প্রকল্পের নির্মাণকাজ এখনো শুরু হয়নি; বর্তমানে নকশা ও সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ চলছে, যার অগ্রগতি ৫৪ দশমিক ৩৫ শতাংশ।
কক্সবাজার বিমানবন্দরকে গত বছরের অক্টোবরে ‘আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর’ ঘোষণা করা হলেও পরে সেই প্রজ্ঞাপন স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। এবার নতুন করে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালুর উদ্যোগ নেওয়া হলেও এর বাণিজ্যিক সম্ভাবনা ও যাত্রী চাহিদা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা। এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম জানান, এখন পর্যন্ত কোনো বিদেশি এয়ারলাইনস কক্সবাজার থেকে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনার আগ্রহ বা সূচি ঘোষণা করেনি। সাধারণত আন্তর্জাতিক ফ্লাইট শুরুর কয়েক মাস আগে সূচি প্রকাশ করে টিকিট বিক্রি শুরু করতে হয়। শুধু পর্যটকদের ওপর ভিত্তি করে নিয়মিত আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালানো কতটা বাস্তবসম্মত, তা নিয়ে তিনি সংশয় প্রকাশ করেন।
কাজী ওয়াহিদুল আলম আরও পরামর্শ দেন, কক্সবাজারকে শুধু আন্তর্জাতিক হাব হিসেবে না দেখে বিকল্প ব্যবহার ও এভিয়েশন অবকাঠামো তৈরির দিকেও নজর দেওয়া যেতে পারে। ঢাকায় কুয়াশা বা অন্য কোনো কারণে ফ্লাইট অবতরণ করতে না পারলে কক্সবাজারকে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। পাশাপাশি সেখানে আন্তর্জাতিক মানের উড়োজাহাজ রক্ষণাবেক্ষণ, মেরামত ও ওভারহল (এমআরও) সুবিধা এবং পাইলট প্রশিক্ষণ একাডেমি গড়ে তোলা সম্ভব, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পথ সুগম করতে পারে।
এই বিনিয়োগের সুফল কতটা মিলবে, তা নির্ভর করবে বিমানবন্দরটি কতটা ব্যবহার হচ্ছে, কতটি ফ্লাইট চালু হচ্ছে এবং কত যাত্রী নিয়মিত যাতায়াত করছে—তার ওপর।.দৃষ্টিনন্দন ঝিনুক আকৃতির টার্মিনালের কার্যক্রম শুরু, একসঙ্গে নামতে পারবেন ৫০০ যাত্রী.কক্সবাজার বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হিসেবে চালুর আগে এর বাণিজ্যিক সম্ভাবনা ও যাত্রী চাহিদা যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করেন এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম।প্রথম আলোকে ওয়াহিদুল আলম বলেন, এখন পর্যন্ত কোনো এয়ারলাইনস কক্সবাজার থেকে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনার আগ্রহ বা সূচি ঘোষণা করেনি।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মাহের আহমেদ, প্রধান সম্পাদক: মোঃ মোত্তালিব সরকার। প্রকাশক কর্তৃক ৫৫০বি, হজ্জ ক্যাম্প রোড, আশকোনা, দক্ষিণখান, ঢাকা-১২৩০, বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত। সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় (ঢাকা) : ৫৫০বি, হজ্জ ক্যাম্প রোড, আশকোনা, দক্ষিণখান, ঢাকা-১২৩০, বাংলাদেশ। আঞ্চলিক কার্যালয় (বগুড়া): টোলারগেট, শেরপুর–৫৮৪০, শেরপুর, বগুড়া। অফিস: ০১৭৭৬-১৩৬০৫০ (হোয়াটসঅ্যাপ), বিজ্ঞাপন: ০৯৬৯৭-৫৪৪৮২৭। ই-মেইল: dailyjokhonsomoy@gmail.com।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রনালয়ের বিধি মোতাবেক নিবন্ধনের জন্য আবেদিত ©সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © দৈনিক যখন সময় ২০২২