Header Premium (728×90)

Categories: জাতীয়

স্বৈরাচার তাড়াতে পারলেও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গড়তে আমরা ব্যর্থ: মাহফুজ আনাম

স্বৈরাচার উৎখাতে এ দেশের মানুষের অনন্য সক্ষমতা থাকলেও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ক্ষেত্রে চরম ব্যর্থতা রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম। তিনি বলেন, “স্বৈরাচারকে উৎখাত করার ক্ষেত্রে আমাদের প্রায় ঈর্ষণীয় সক্ষমতা আছে। তবে স্বৈরাচার উৎখাত করার ক্ষেত্রে আমরা যতটা ভালো, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ক্ষেত্রে দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা ততটাই খারাপ।” রাজধানীর কারওয়ান বাজারের প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত তিন দিনব্যাপী ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন ২০২৬’-এর দ্বিতীয় দিনে তিনি এসব কথা বলেন।

রোববার দুপুরে অনুষ্ঠিত ‘আমরা কি জানি কীভাবে শাসন পরিচালনা করতে হয়?’ শীর্ষক একটি অধিবেশনে বক্তব্য রাখছিলেন মাহফুজ আনাম। তিনি বলেন, স্বৈরাচারকে উৎখাত করার পর গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে না পারার এক অফুরন্ত সক্ষমতা আমাদের তৈরি হয়েছে, যার মূল কারণ প্রতিটি সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে অতিরিক্ত রাজনীতিকরণ। এ সময় তিনি দেশের বিভিন্ন পেশাজীবীদের উদাহরণ টেনে বলেন, চিকিৎসকেরা কোন political দলের সমর্থক, তার ভিত্তিতে বিভক্ত। এমনকি সাংবাদিকেরাও এর বাইরে নন। দেশে কেউ বিএনপিপন্থী, কেউ আওয়ামী লীগপন্থী, আবার কেউ জামায়াতপন্থী সাংবাদিক হিসেবে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন। কিন্তু একজন সাংবাদিক কীভাবে একই সঙ্গে কোনো দলপন্থী হতে পারেন, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি। ব্যক্তিগত রাজনৈতিক পছন্দ বা স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার অধিকার সবারই আছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, যে পেশায় বিশ্বাসযোগ্যতা সবচেয়ে বড় সম্পদ, সেখানে প্রকাশ্যে কোনো দলের পক্ষ নিয়ে কীভাবে বিশ্বাসযোগ্যতা অক্ষুণ্ন রাখা সম্ভব?

মাহফুজ আনাম বলেন, আমলাতন্ত্র, পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা থেকে শুরু করে স্বাধীন ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতেও একই ধরনের রাজনৈতিক ব্যবহার ও রাজনীতিকরণ চলছে। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় কোনো দল নির্বাচিত হলে জনগণ তা উদ্‌যাপন করে। কিন্তু দ্রুতই সেই জনগণের ইচ্ছা জনস্বার্থে রূপান্তরিত না হয়ে সংকীর্ণ রাজনৈতিক বাস্তবতায় রূপ নেয়। পুরো সরকারব্যবস্থাকে বিজয়ী দলের একটি সম্প্রসারণে পরিণত করার মধ্য দিয়েই পতনের শুরু হয়। এর ফলে দুর্নীতি, দলীয় পক্ষপাত, স্বজনপ্রীতি ও আনুকূল্য ছড়িয়ে পড়ে এবং বছরের পর বছর ধরে পুরো শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়ে।

এ দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, নৃশংস সামরিক স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের জন্ম হলেও এখানে একটি কার্যকর গণতন্ত্র গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। ১৯৯১ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের পতনের পর গণতন্ত্রে ফেরার কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, “আমরা সত্যিই আশা করেছিলাম, এর মধ্য দিয়ে গণতন্ত্রের পুনর্জন্ম ঘটবে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীন আমরা একাধিক নির্বাচনও করেছি। কিন্তু নির্বাচনী ব্যবস্থাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার পরিবর্তে আমরা ক্রমেই সংঘাত ও ধ্বংসের দিকে এগিয়েছি।” তিনি মনে করেন, শাসনব্যবস্থা কী এবং কীভাবে মানুষের শক্তি, উদ্ভাবনী ক্ষমতা ও সহনশীলতাকে জাতীয় উন্নয়নে রূপান্তর করতে হয়, তা না জানার কারণেই এই ব্যর্থতা তৈরি হয়েছে।

স্বৈরাচার পতনের পর জাতীয় ঐক্যের অভাবকে আরেকটি বড় কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন এই সম্পাদক। তিনি বলেন, স্বৈরাচার উৎখাতের সময় পুরো জাতি ঐক্যবদ্ধ হলেও পরবর্তীতে তারা বিভক্ত হয়ে পড়ে। যে দলগুলো স্বৈরাচার তাড়াতে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করেছিল, তারাই পরে পরস্পরের শত্রুতে পরিণত হয়। এই বিভক্তির কারণেই এ দেশে গণতান্ত্রিক কাঠামো ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে বারবার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে ব্যর্থ হতে হয়েছে।

বক্তব্যের শুরুতে বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থার সংকট ও যুদ্ধাবস্থার চিত্র তুলে ধরেন মাহফুজ আনাম। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বর্তমান সময়ে বিশ্বে সবচেয়ে বেশি যুদ্ধ চলছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, শক্তিশালী দেশগুলো যখন তখন অন্য দেশে বোমা ফেলছে, যা ছোট দেশগুলোর জন্য নাজুক পরিস্থিতি তৈরি করছে। জলবায়ু পরিবর্তন, এল নিনোর প্রভাব ও সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধির মতো বৈশ্বিক সংকটে যখন বেশি সম্পদ ব্যয় করা প্রয়োজন, তখন বিশ্ব সবচেয়ে বেশি অর্থ খরচ করছে অস্ত্রশস্ত্র ও সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর পেছনে। সার্বভৌমত্বের এই ধারণাকে তিনি আত্মঘাতী বলে অভিহিত করেন।

তবে এই বিশাল চ্যালেঞ্জের মধ্যেও প্রযুক্তির ব্যবহার ও সুশাসনের মাধ্যমে একটি দক্ষ আমলাতন্ত্র ও ন্যায়সংগত ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব বলে মনে করেন মাহফুজ আনাম। তিনি বলেন, কম ভূমি ও বিপুল জনসংখ্যার এই দেশ পরিচালনা করা সহজ নয় এবং এখানে প্রাকৃতিক নানা চ্যালেঞ্জ রয়েছে। কিন্তু প্রযুক্তি, উন্নত শিক্ষা ও সুশাসনের মাধ্যমে এ দেশের বিপুল মানবসম্পদকে উৎপাদনশীল সম্পদে রূপান্তর করা গেলে বাংলাদেশের সম্ভাবনা অনেক বড়।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo

Recent Posts

টেসলা ও মার্সিডিজের চেয়েও মাল্টা আমদানিতে শুল্ক বেশি বাংলাদেশে

বাংলাদেশে পরিবেশবান্ধব বৈদ্যুতিক গাড়ি বা বিলাসবহুল মার্সিডিজ বেঞ্জ আমদানির চেয়েও ডেঙ্গু রোগীর পথ্য হিসেবে পরিচিত…

3 minutes ago

ঝিনাইদহে পোলট্রি খামারের দুর্গন্ধে শ্রেণিকক্ষ ছেড়ে গাছতলায় পাঠদান

ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার বারপাকিয়া দাখিল মাদরাসার পাশে একটি পোলট্রি খামার গড়ে ওঠায় ছড়াচ্ছে তীব্র দুর্গন্ধ।…

8 minutes ago

ইয়েমেনের কৌশলগত বন্দরনগরী মোখা পুনর্দখলের দাবি সরকারি বাহিনীর

ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী বড় ধরনের পাল্টা অভিযান চালিয়ে কৌশলগত বন্দরনগরী মোখা পুনর্দখলের দাবি করেছে। একই…

9 minutes ago

বেকুটিয়া সেতুর পাইপ কাটার সময় ১০ জন আটক

পিরোজপুর সদর উপজেলার কঁচা নদীতে অষ্টম বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সেতুর নিচ থেকে পাইপ কাটার সময় ১০…

17 minutes ago

সওজের গুরুত্বপূর্ণ পদে বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের নেতাদের পদায়নের অভিযোগ

সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের বিভিন্ন প্রকল্পে বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের নেতাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়নের অভিযোগ উঠেছে।…

27 minutes ago

আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম সামান্য কমল

মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরবরাহ অব্যাহত থাকা এবং কৌশলগত মজুত থেকে জরুরি তেল ছাড়ার প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে…

38 minutes ago

This website uses cookies.