
মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার সুপরিচিত পর্যটনকেন্দ্র মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত। সাধারণ মানুষের কাছে এটি কেবলই এক নান্দনিক জলধারা হলেও বন্য প্রাণিবিদদের কাছে এটি বাংলাদেশের পাহাড়ি জীববৈচিত্র্যের এক সমৃদ্ধ প্রাকৃতিক গবেষণাগার। সম্প্রতি বন্য প্রাণী, চিড়িয়াখানা ও সাফারি পার্ক বিশেষজ্ঞ রেজা খান তাঁর এক মাঠ জরিপের অভিজ্ঞতা থেকে মাধবকুণ্ডের আড়ালের এক বৈচিত্র্যময় প্রাণিজগতের চিত্র তুলে ধরেছেন, যা পর্যটকদের কোলাহলের আড়ালে দিন ও রাতের ভিন্ন ভিন্ন রূপে আত্মপ্রকাশ করে।
মাধবকুণ্ড মূলত বৃহত্তর পাথারিয়া পাহাড়ের অংশ, যা বাংলাদেশের বড়লেখা ও জুড়ী উপজেলা ছাড়িয়ে ভারতের আসামের করিমগঞ্জ জেলা পর্যন্ত বিস্তৃত। ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমল থেকে শুরু করে স্বাধীনতার পরও বন উজাড়, চা-বাগানের সম্প্রসারণ, অবৈধ দখল ও গাছ কাটার ফলে এখানকার মিশ্র চিরহরিৎ বন ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একসময় এই বনাঞ্চলে হাতি, গন্ডার, বুনো মহিষ, বাঘ, চিতাবাঘ, ভালুক, গৌর ও সাম্বারের মতো বড় স্তন্যপায়ী প্রাণী বিচরণ করত, যা এখন এ দেশে বিলুপ্ত হলেও প্রতিবেশী দেশগুলোতে এখনো টিকে আছে। তবে বড় প্রাণী হারালেও অবশিষ্ট এই বনভূমি ছোট ও কম পরিচিত প্রাণীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বিশেষজ্ঞ রেজা খান তাঁর সাম্প্রতিক এক সফরে ১৫ আগস্ট মাধবকুণ্ডে পৌঁছান। এর আগের দিন তিনি হামহাম জলপ্রপাত ও সংলগ্ন পাহাড়ি বনে কঠিন মাঠ জরিপ শেষ করেছিলেন। বর্ষার দিনে মাধবকুণ্ডে তখন পর্যটকদের উপচে পড়া ভিড় ছিল। এই কোলাহলের মধ্যেই তিনি বন্য প্রাণীদের আচরণ পর্যবেক্ষণ করেন। বনের পথে তিনি প্রথমে চার থেকে ছয়টি অপ্রাপ্তবয়স্ক চশমাপরা হনুমানের দেখা পান, তবে সেখানে কোনো পূর্ণবয়স্ক হনুমান ছিল না। গাছের ডালে একটি কাঠবিড়ালিকে পর্যটকদের ফেলে দেওয়া পেয়ারা খেতে দেখা যায়। স্থানীয় গাইডের সহায়তায় একটি গাছে ঘুমন্ত অবস্থায় কুণ্ডলী পাকিয়ে থাকা নিশাচর লজ্জাবতী বানরের দেখাও মেলে।
মাধবকুণ্ডের আঁকাবাঁকা পথে পাখিদের খাবার সংগ্রহের দৃশ্যও ছিল চমৎকার। বিশেষ করে ‘বনমালী’ বা ‘মখমল-কপাল কীটকুড়ানি’ পাখির চঞ্চলতা গবেষকের নজর কাড়ে। নীলাভ পিঠ, ক্রিম রঙের পেট ও টকটকে লাল ঠোঁটের এই পাখিটির কপালে কালো মখমলের মতো পট্টি রয়েছে। লম্বায় কেবল ১২-১৩ সেন্টিমিটার বা ৫ ইঞ্চি এই পাখিটি কাঠঠোকরার মতো কাঠে গর্ত না করে ওপর থেকে নিচের দিকে নেমে গাছের বাকলের পোকামাকড় ও শূককীট খেয়ে বেঁচে থাকে।
দিনের বেলা মানুষের ভিড়ে জলপ্রপাতের পাদদেশে কটকটি ব্যাঙ এবং দীর্ঘ সময় খোঁজার পর মাত্র একটি চোখা-মাথা পাহাড়ি ব্যাঙের দেখা মিলেছিল। কিন্তু সন্ধ্যা নামতেই এবং পর্যটকদের চলে যাওয়ার পর মাধবকুণ্ডের রূপ সম্পূর্ণ বদলে যায়। জলপ্রপাতের তীব্র গর্জনের মাঝে নীরবতা নেমে এলে শুরু হয় নিশাচর প্রাণীদের আনাগোনা। দিনের বেলা লুকিয়ে থাকা চোখা-মাথা পাহাড়ি ব্যাঙগুলো রাতে সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং মাত্র ১০০ বর্গমিটার এলাকায় ৩০টিরও বেশি পুরুষ ব্যাঙের ডাক শোনা যায়। জলপ্রপাতের পাদদেশ থেকে ওপরে ওঠার সময় প্রায় দেড় ফুট দীর্ঘ একটি মস্ত কাঠিপোকা চোখে পড়ে, যা দেখতে হুবহু গাছের ডালের মতো।
রাতের এই নীরবতায় গবেষক দল একটি বিষধর সবুজ বোড়া সাপ এবং দ্রুত রাস্তা পার হতে থাকা একটি কালকেউটে দেখতে পান। এছাড়া মাত্র ১০০ মিটারের মধ্যে তিনটি অপ্রাপ্তবয়স্ক গন্ধগোকুল বা ভাম এবং চারপাশের গাছে পোকামাকড় শিকারে ব্যস্ত চারটি লজ্জাবতী বানর শনাক্ত করা হয়। কোলাহলমুক্ত সেই রাতে ঝিঁঝি পোকা, সিকাডা ও ক্রিকেটের ডাকে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো বন।
এর আগে ডিসেম্বর মাসের এক সফরে ১৬ থেকে ১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস শীত উপেক্ষা করে প্রজননে লিপ্ত হওয়া দুই-তিন ডজন ‘বারডমোরের সরু মাথা ব্যাঙ’ পর্যবেক্ষণ করেছিলেন রেজা খান। ২০১২ সালের আগস্টে তাঁর প্রথম সফরের স্মৃতিচারণ করে তিনি জানান, তখন সেখানে উন্নত রাস্তাঘাট বা চারতলা বিশ্রামাগার ছিল না, ছিল বুনো পরিবেশ। গত এক যুগে এই এলাকায় জরিপ চালিয়ে বেশ কিছু বন্য প্রাণী বাংলাদেশের জন্য প্রথমবার নথিভুক্ত করা হয়েছে।
বাংলাদেশের প্রাণিকুলের লাল তালিকা হালনাগাদ কার্যক্রমের অংশ হিসেবে এই জরিপ চালানো হয়। রেজা খান জোর দিয়ে বলেন, পর্যটন ও বন্য প্রাণীর আবাসস্থল একসঙ্গে রক্ষা করা সম্ভব, যদি পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা থাকে। ঝরনার চারপাশের সংবেদনশীল প্রজননস্থল, ছড়া ও ঝোপঝাড়কে মানুষের অবাধ প্রবেশ থেকে সুরক্ষিত রাখতে হবে। কারণ ব্যাঙের জন্য পরিষ্কার পানি, সাপের নিরাপদ আশ্রয়, লজ্জাবতী বানরের জন্য অন্ধকার ও নিরিবিলি পরিবেশ এবং প্রজাপতি ও পাখিদের জন্য নির্দিষ্ট গাছপালা অপরিহার্য। দৃশ্যমান জলপ্রপাতটি রক্ষার পাশাপাশি এর চারপাশের জীবন্ত বন ও বাস্তুতন্ত্র রক্ষা না করলে এই অদৃশ্য প্রাণভুবন চিরতরে হারিয়ে যাবে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মাহের আহমেদ, প্রধান সম্পাদক: মোঃ মোত্তালিব সরকার। প্রকাশক কর্তৃক ৫৫০বি, হজ্জ ক্যাম্প রোড, আশকোনা, দক্ষিণখান, ঢাকা-১২৩০, বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত। সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় (ঢাকা) : ৫৫০বি, হজ্জ ক্যাম্প রোড, আশকোনা, দক্ষিণখান, ঢাকা-১২৩০, বাংলাদেশ। আঞ্চলিক কার্যালয় (বগুড়া): টোলারগেট, শেরপুর–৫৮৪০, শেরপুর, বগুড়া। অফিস: ০১৭৭৬-১৩৬০৫০ (হোয়াটসঅ্যাপ), বিজ্ঞাপন: ০৯৬৯৭-৫৪৪৮২৭। ই-মেইল: dailyjokhonsomoy@gmail.com।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রনালয়ের বিধি মোতাবেক নিবন্ধনের জন্য আবেদিত ©সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © দৈনিক যখন সময় ২০২২