
২৭ সেপ্টেম্বর বিশ্ব নদী দিবস পালিত হচ্ছে এমন এক সময়ে, যখন বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার ১৯৯৬ সালের ঐতিহাসিক গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তির ৩০ বছরের মেয়াদ আগামী ডিসেম্বরে শেষ হতে যাচ্ছে। চুক্তির এই শেষ সময়ে এসে পদ্মার দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনা এবং শুষ্ক মৌসুমে পানির ন্যায্য হিস্যা পাওয়ার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বর্ষায় ভয়াবহ বন্যা আর শুষ্ক মৌসুমে পানিশূন্যতা—পদ্মার এই বৈপরীত্য কেবল চরাঞ্চলের মানুষের দুর্ভোগই বাড়াচ্ছে না, বরং সামগ্রিক নদী ব্যবস্থাপনার বড় সংকটকে সামনে নিয়ে আসছে।
সম্প্রতি সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে রাজশাহীতে পদ্মার পানি বিপৎসীমার কাছাকাছি পৌঁছেছিল। রাজশাহী পয়েন্টে পানি ১৭.৩০ মিটারে ঠেকেছিল, যেখানে বিপৎসীমা ১৮.০৫ মিটার। এতে চরখিদিরপুর ও খানপুরসহ দক্ষিণ তীরের বিভিন্ন চরাঞ্চল প্লাবিত হয়ে পড়ে এবং বহু পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়ে। চরখিদিরপুরের বাসিন্দা রাকিব জানান, তার ৫০টি গরুর মধ্যে ৪০টিকে কোনোমতে নিরাপদ স্থানে সরাতে পারলেও চরম কষ্টে আছেন। একই দুর্ভোগের কথা জানান মনোয়ারা বেগম, যার বাড়িঘর পানিতে ডুবে যাওয়ায় গবাদিপশু রাখার বা রান্নার কোনো জায়গা অবশিষ্ট নেই।
অথচ এই বর্ষার পরই নদীটি শুকিয়ে বিস্তূর্ণ বালুচরে পরিণত হবে, যা কৃষকদের ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল করে তুলবে। নদী গবেষক মাহবুব সিদ্দিকী মনে করেন, বর্ষায় অতিরিক্ত পানি এবং শুষ্ক মৌসুমে প্রবাহ কমে যাওয়ার পেছনে শুধু ফারাক্কা বাঁধকে দায়ী করলে চলবে না। এর পেছনে উজানে পানি প্রত্যাহার, নদীতে পলি জমে নাব্য হ্রাস, জলবায়ু পরিবর্তন, ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত উত্তোলন এবং দেশের অভ্যন্তরীণ নদী ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা একযোগে কাজ করছে। শুষ্ক মৌসুমে পানি কমে যাওয়ায় সেচ খরচ বৃদ্ধি, মাছের প্রজননক্ষেত্র সংকুচিত হওয়া এবং নৌপথের নাব্য সংকটের মতো বহুমুখী বিপর্যয় দেখা দিচ্ছে।
যৌথ নদী কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গা চুক্তিটির কার্যকারিতা আগামী ডিসেম্বর ২০২৬-এ শেষ হচ্ছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে লোকসভায় বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। চুক্তির ১২ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী দুই দেশের সম্মতিতে এটি নবায়ন করা সম্ভব। তবে নতুন চুক্তিতে জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশগত প্রবাহ, কৃষি ও মৎস্য সম্পদের চাহিদা এবং নদীনির্ভর মানুষের জীবন-জীবিকার বিষয়গুলো কীভাবে অন্তর্ভুক্ত হবে, তা নিয়ে বড় প্রশ্ন রয়েছে।
রাজশাহীতে প্রস্তাবিত পদ্মা ব্যারাজ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চললেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উজান থেকে পর্যাপ্ত পানির প্রবাহ নিশ্চিত না করে শুধু অবকাঠামো নির্মাণ করে এই সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধান সম্ভব নয়। বিশ্ব নদী দিবসে তাই কেবল প্রথাগত নদী রক্ষার আলোচনার বাইরে গিয়ে আন্তঃসীমান্ত নদী ব্যবস্থাপনা, বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবেশগত প্রবাহকে যুক্ত করে একটি সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি অববাহিকাভিত্তিক ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে। অন্যথায় প্রতি বছর বর্ষায় ঘরবাড়ি হারানো আর শুষ্ক মৌসুমে বালুচর দেখার এই চক্র চলতেই থাকবে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মাহের আহমেদ, প্রধান সম্পাদক: মোঃ মোত্তালিব সরকার। প্রকাশক কর্তৃক ৫৫০বি, হজ্জ ক্যাম্প রোড, আশকোনা, দক্ষিণখান, ঢাকা-১২৩০, বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত। সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় (ঢাকা) : ৫৫০বি, হজ্জ ক্যাম্প রোড, আশকোনা, দক্ষিণখান, ঢাকা-১২৩০, বাংলাদেশ। আঞ্চলিক কার্যালয় (বগুড়া): টোলারগেট, শেরপুর–৫৮৪০, শেরপুর, বগুড়া। অফিস: ০১৭৭৬-১৩৬০৫০ (হোয়াটসঅ্যাপ), বিজ্ঞাপন: ০৯৬৯৭-৫৪৪৮২৭। ই-মেইল: dailyjokhonsomoy@gmail.com।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রনালয়ের বিধি মোতাবেক নিবন্ধনের জন্য আবেদিত ©সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © দৈনিক যখন সময় ২০২২