
গাছের প্রতি ভালোবাসা থেকে একসময় ভাড়া বাসায় নানা ঝক্কি পোহাতে হয়েছিল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী শারমিন আক্তারকে। বাড়িওয়ালার আপত্তির মুখে শেষ পর্যন্ত নিজের প্রিয় গাছগুলোকে বাঁচাতে একটি তিনতলা বাড়িই তৈরি করে ফেলেন তিনি। সেই বাড়ির ছাদজুড়ে গড়ে তোলা বাগানটি এখন আর শুধু শখের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই, তা রূপ নিয়েছে একটি লাভজনক ব্যবসায়। ‘নেসারস টাচ’ নামের এই উদ্যোগ থেকে প্রতি মাসে গড়ে লাখ টাকার বেশি গাছ বিক্রি হচ্ছে, সদ্য সমাপ্ত আগস্ট মাসে যার পরিমাণ ছিল প্রায় তিন লাখ টাকা।
রাজশাহী নগরের ৩০ নম্বর ওয়ার্ডের মোহনপুর এলাকার বাসিন্দা শারমিন আক্তার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্যবস্থাপনায় বিবিএ ও এমবিএ সম্পন্ন করেছেন। তাঁর স্বামী জাহাঙ্গীর আলম পেশায় একজন ব্যাংকার। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের প্রথম সেমিস্টারে পড়ার সময় বিয়ে হওয়ার পর হলের বারান্দা থেকেই শারমিনের গাছের প্রতি ভালোবাসার সূত্রপাত। পরবর্তীতে ভাড়া বাসায় থাকার সময় গাছের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়তে থাকে। কিন্তু এক বাসা থেকে অন্য বাসায় যাওয়ার সময় গাছ নিয়ে নানা বিপত্তিতে পড়তে হতো তাঁকে। একটি ভাড়া বাসায় প্রায় ৯ বছর থাকার পর ছাদ ভাড়া দেওয়া হয়নি এমন অজুহাতে বাড়িওয়ালা তাঁদের বাসা ছাড়ার নোটিশ দেন। এমনকি বাসা ছাড়ার নোটিশ পাওয়ার দিনও তিনি স্বামীর অপছন্দের একটি সাকুলেন্ট গাছ কিনে বাড়ি ফিরেছিলেন, যা নিয়ে স্বামী জাহাঙ্গীর আলম এখনো হাসাহাসি করেন। একবার প্রায় ১০০টি গোলাপের টব থাকবে শুনে এক বাড়িওয়ালা তাঁদের বাসা ভাড়াই দিতে রাজি হননি।
ভাড়া বাসার এসব তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকেই এই দম্পতি নিজেদের একটি বাড়ি করার সিদ্ধান্ত নেন, যেখানে গাছের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা থাকবে। ২০২১ সালের শেষ দিকে নির্মাণাধীন বাড়ির ছাদ ঢালাইয়ের পরপরই সেখানে গাছগুলো তোলা শুরু হয় এবং ২০২২ সালের ১৪ জানুয়ারি তাঁরা আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন বাড়িতে ওঠেন। বর্তমানে তিনতলা এই বাড়ির ছাদজুড়ে রয়েছে বাহারি গাছপালা। জায়গা বাঁচাতে ছাদে তৈরি করা হয়েছে একাধিক স্তরের বিশেষ কাঠামো, যাতে একটির ওপর আরেকটি স্তর তৈরি করে জায়গার সর্বোচ্চ ব্যবহার করা যায়।
শারমিনের এই বাগানে রয়েছে গাছের বিশাল বৈচিত্র্য। এখানে ২০০-এর বেশি জাতের অ্যাডেনিয়াম, ৬০টির বেশি জাতের অ্যাগলোনিমা, ৬৫টির বেশি অর্কিড, প্রায় ১০০ জাতের সাকুলেন্ট, ১০০-র বেশি স্নেক প্ল্যান্ট এবং ৫০টির বেশি জাতের ক্যাকটাস রয়েছে। এ ছাড়া মনস্টেরা, জিজি প্ল্যান্ট, জেড প্ল্যান্ট, ক্যালাথিয়া, সিঙ্গোনিয়াম, পিস লিলি, পাথোস, অ্যান্থুরিয়াম, ফিটোনিয়া, হাওয়ারথিয়া, ইউফরবিয়া ও বাগানবিলাসসহ বিভিন্ন ফুল ও পাতাবাহার রয়েছে। ছাদের এক কোণে শোভা পাচ্ছে আনার, আম, সফেদা, থাই সফেদা, পেয়ারা, ম্যান্ডারিন, অ্যাভোকাডো, অ্যাপ্রিকট, আপেল, আঙুর, পেঁপে ও কলার মতো ফল এবং বেগুন, টমেটো ও মরিচের মতো সবজি। এসব সবজিতে তাঁরা কোনো ধরনের কীটনাশক ব্যবহার করেন না।
এই বাগানের গাছের দামেও রয়েছে ভিন্নতা। ৫০ টাকা থেকে শুরু করে লাখ টাকা মূল্যের বিরল জাতের অ্যাডেনিয়াম রয়েছে এখানে। কিছুদিন আগে শারমিন তাঁর বাগানের একটি ক্যাকটাস ৬৫ হাজার টাকায় বিক্রি করেছেন। বাগানের কিছু গাছ ১৭ বছর ধরে তাঁদের সংগ্রহে রয়েছে এবং একটি ক্যাকটাসের বয়স প্রায় ২৮ বছর। এই সাফল্যের স্বীকৃতিস্বরূপ সম্প্রতি পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের ‘বৃক্ষরোপণে জাতীয় পুরস্কার-২০২৫’-এ ‘ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে সৃজিত ছাদবাগান’ ক্যাটাগরিতে দেশসেরা হয়ে প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে প্রথম পুরস্কার গ্রহণ করেছেন শারমিন। এ সময় প্রধানমন্ত্রী তাঁকে গাছের প্রতি এই ভালোবাসা আরও অনেকের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানান।
বাগানের পরিচর্যা ও গাছ কেনা থেকে শুরু করে সব কাজেই শারমিনকে সার্বিক সহযোগিতা করেন তাঁর স্বামী জাহাঙ্গীর আলম। বর্তমানে এই বাগানের দেখভালের জন্য দুজনকে নিয়মিত বেতন দিয়ে রাখা হয়েছে, যাদের একজনকে ১২ হাজার ও অন্যজনকে ১৮ হাজার টাকা দেওয়া হয়। এ ছাড়া বিভিন্ন সময়ে আরও ৮ থেকে ১০ জন মানুষ এই বাগানের কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকেন। শারমিন ও তাঁর স্বামী নিজেদের শ্রমের কোনো আর্থিক মূল্য হিসাব করেন না, কারণ এই বাগান থেকে তাঁরা যে মানসিক শান্তি পান তা অমূল্য। পরিচিত মহলে ‘গাছের ডাক্তার’ হিসেবে পরিচিত শারমিন এখন এই ছাদবাগানটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ নার্সারি ও প্ল্যান্ট সেন্টারে রূপ দেওয়ার পরিকল্পনা করছেন। রাস্তার পাশে একটি বিক্রয়কেন্দ্র খোলার প্রস্তুতিও নিচ্ছেন এই দম্পতি, যেখানে গাছের পাশাপাশি টব, সার ও বাগান করার প্রয়োজনীয় সব উপকরণ পাওয়া যাবে।
কোনো চারা পাওয়া যায় ২০০-৩০০ টাকায়, আবার কোনো গাছের দাম প্রায় লাখ টাকা পর্যন্ত।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মাহের আহমেদ, প্রধান সম্পাদক: মোঃ মোত্তালিব সরকার। প্রকাশক কর্তৃক ৫৫০বি, হজ্জ ক্যাম্প রোড, আশকোনা, দক্ষিণখান, ঢাকা-১২৩০, বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত। সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় (ঢাকা) : ৫৫০বি, হজ্জ ক্যাম্প রোড, আশকোনা, দক্ষিণখান, ঢাকা-১২৩০, বাংলাদেশ। আঞ্চলিক কার্যালয় (বগুড়া): টোলারগেট, শেরপুর–৫৮৪০, শেরপুর, বগুড়া। অফিস: ০১৭৭৬-১৩৬০৫০ (হোয়াটসঅ্যাপ), বিজ্ঞাপন: ০৯৬৯৭-৫৪৪৮২৭। ই-মেইল: dailyjokhonsomoy@gmail.com।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রনালয়ের বিধি মোতাবেক নিবন্ধনের জন্য আবেদিত ©সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © দৈনিক যখন সময় ২০২২