
ফুল দিয়ে সাজানো একটি ঘোড়ার গাড়ি। সেটিকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছেন বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থী এবং এলাকাবাসীর উপচে পড়া ভিড়। অশ্রুসজল চোখে বিদায়ের এই বিশেষ মুহূর্তটি যেন এক উৎসবের রূপ নিয়েছিল। সেই সুসজ্জিত ঘোড়ার গাড়িতে চেপেই বিদ্যালয় থেকে বিদায় নিলেন প্রিয় শিক্ষক জোৎস্না আরা বেগম। দীর্ঘ ৩৯ বছরের শিক্ষকতা জীবনের শেষ দিনে তাঁকে এমনই এক রাজকীয় ও সম্মানজনক বিদায় জানানো হলো।
ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার বইলর ইউনিয়নের দেওয়ানীয়াবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক হিসেবে অবসরে গেছেন জোৎস্না আরা বেগম। পুরো এলাকায় তিনি সবার কাছে ‘জোৎস্না আপা’ নামেই অত্যন্ত পরিচিত। ১৯৮৭ সালে তিনি এই বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেছিলেন। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি পরম যত্নে পড়িয়েছেন এলাকার একাধিক প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের।
প্রিয় শিক্ষকের এই অবসর গ্রহণকে স্মরণীয় করে রাখতে গতকাল বৃহস্পতিবার বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসীর যৌথ উদ্যোগে এক জমকালো সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সমাজসেবক আবদুল আলীমের সভাপতিত্বে এবং মফিজুল ইসলামের সঞ্চালনায় এই আয়োজনে উপস্থিত ছিলেন সমাজসেবক মনিরুজ্জামান সোমেল, ম্যানেজিং কমিটির সাবেক সভাপতি মনিরুজ্জামান মিলন, সাবেক শিক্ষক মজিবুর রহমান, প্রধান শিক্ষক আয়েশা মোস্তারি এবং সহকারী শিক্ষক তাসলিমা বেগমসহ এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা। বিদায়ী শিক্ষকের প্রতি সম্মান জানিয়ে অনুষ্ঠানে মানপত্র পাঠ করেন সহকারী শিক্ষক নূরে গুলশান।
অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে নিজেদের প্রিয় শিক্ষকের স্মৃতিচারণা করেন বিভিন্ন ব্যাচের প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা। তাঁদের মধ্যে বক্তব্য দেন ১৯৮৪ ব্যাচের সুজন, ১৯৯৩ ব্যাচের ওসমান গনি ও মামুন মিয়া এবং ১৯৯৬ ব্যাচের মো. সেলিম ফরাজী, আসাদুজ্জামান আসাদ ও মুফতি মাওলানা সোহাইল মিয়াসহ আরও অনেকে।
বিদায় অনুষ্ঠানের অন্যতম আয়োজক ও ১৯৯৬ ব্যাচের প্রাক্তন শিক্ষার্থী মো. সেলিম ফরাজী আবেগ প্রকাশ করে বলেন, ‘জোৎস্না আপা অত্যন্ত ভদ্র ও কোমল হৃদয়ের মানুষ। দীর্ঘ ৩৯ বছর তিনি আমাদের নিজের সন্তানের মতো স্নেহ ও শাসন দিয়ে শিক্ষা দিয়েছেন। তাঁর আদর্শ ও মূল্যবোধ আমাদের জীবন চলার পথে চিরদিন প্রেরণা হয়ে থাকবে।’
সহকর্মী ও স্থানীয়দের কাছেও জোৎস্না আরা বেগম ছিলেন অত্যন্ত প্রিয় মুখ। তাঁর সহকর্মী সহকারী শিক্ষক লক্ষ্মী রানী বলেন, ‘জোৎস্না আরা ম্যাডামের বিদায় আমাদের জন্য কষ্টের। তবে আজকের আয়োজন দেখে আমরা গর্বিত। তিনি শুধু বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন না, পুরো এলাকার মানুষের সঙ্গেও তাঁর গভীর সম্পর্ক ছিল। এলাকাবাসী তাঁকে কতটা ভালোবাসেন, আজকের আয়োজনেই তার প্রমাণ পাওয়া গেছে।’ তিনি আরও যোগ করেন, জোৎস্না আরা অত্যন্ত আন্তরিক ও ইতিবাচক মনের মানুষ। তিনি যেমন সহকর্মীদের নানা কাজে সহযোগিতা করতেন, তেমনি এলাকার সাধারণ মানুষকেও বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ ও সাহায্য করতেন। প্রত্যেক শিক্ষকেরই এমন সম্মান ও ভালোবাসার মধ্য দিয়ে বিদায় নেওয়ার প্রত্যাশা থাকে।
দীর্ঘ কর্মজীবন শেষে এমন রাজকীয় বিদায়কে নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন হিসেবে দেখছেন জোৎস্না আরা বেগম। অনুষ্ঠানে আবেগাপ্লুত হয়ে তিনি বলেন, ‘সহকর্মী, এলাকাবাসী ও শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে সব সময় ভালোবাসা ও সহযোগিতা পেয়েছি। আজকের অনুষ্ঠানে প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষার্থী, সহকর্মী ও এলাকার মুরব্বিসহ সবাই যে ভালোবাসা দিয়েছেন, তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। এটি আমার শিক্ষকতা–জীবনের অন্যতম বড় প্রাপ্তি।’
বিদায়ের অনুভূতি জানিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘বিদায়ের সময় মন খারাপ হয়েছিল। তবে প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের সামনে দেখে আবার উজ্জীবিত হয়েছি। আমার প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা আজ প্রতিষ্ঠিত হয়ে শিক্ষককে সম্মান জানাতে এসেছে—এটাই আমার সবচেয়ে বড় আনন্দ। বর্তমান শিক্ষার্থীরাও ভালো করছে। শিক্ষার্থীদের অগ্রগতি ও মানুষের ভালোবাসা নিয়ে শিক্ষকতা–জীবন শেষ করতে পারছি—এটাই আমার সবচেয়ে বড় সার্থকতা।’
সংবর্ধনা অনুষ্ঠান শেষে উপস্থিত সকলের ভালোবাসা, শুভকামনা ও আনন্দাশ্রু সঙ্গী করে ফুল দিয়ে সাজানো ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে বসেন জোৎস্না আরা বেগম। এভাবেই শেষ হলো তাঁর ৩৯ বছরের গৌরবময় শিক্ষকতা জীবনের এক স্মরণীয় অধ্যায়।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মাহের আহমেদ, প্রধান সম্পাদক: মোঃ মোত্তালিব সরকার। প্রকাশক কর্তৃক ৫৫০বি, হজ্জ ক্যাম্প রোড, আশকোনা, দক্ষিণখান, ঢাকা-১২৩০, বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত। সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় (ঢাকা) : ৫৫০বি, হজ্জ ক্যাম্প রোড, আশকোনা, দক্ষিণখান, ঢাকা-১২৩০, বাংলাদেশ। আঞ্চলিক কার্যালয় (বগুড়া): টোলারগেট, শেরপুর–৫৮৪০, শেরপুর, বগুড়া। অফিস: ০১৭৭৬-১৩৬০৫০ (হোয়াটসঅ্যাপ), বিজ্ঞাপন: ০৯৬৯৭-৫৪৪৮২৭। ই-মেইল: dailyjokhonsomoy@gmail.com।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রনালয়ের বিধি মোতাবেক নিবন্ধনের জন্য আবেদিত ©সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © দৈনিক যখন সময় ২০২২