
বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবসে সিডনির এক অনন্য মানুষের গল্প মনে পড়ে। অস্ট্রেলিয়ার সিডনি শহরের ওয়াটসনস বে এলাকার বিখ্যাত ও পাথুরে গিরিখাত ‘দ্য গ্যাপ’ (The Gap) একসময় কুখ্যাত ছিল ‘সুইসাইড স্পট’ হিসেবে। তবে সেই মৃত্যুর উপত্যকাকে যিনি জীবনের উদ্যানে রূপ দিয়েছিলেন, তিনি হলেন ডন রিচি। সিডনি প্রবাসী বাল্যবন্ধু সাজিদুল ইসলামের সঙ্গে সেখানে গিয়ে ডন রিচির সেই অবিশ্বাস্য কীর্তির কথা জানা যায়। সাজিদ দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে সিডনিতে বাস করছেন এবং তাঁর কাছে এই শহরটি হাতের তালুর মতোই চেনা।
বেলেপাথরের তৈরি খাড়া গিরিখাত ‘দ্য গ্যাপ’ থেকে সমুদ্রের প্রমত্ত ঢেউয়ের উচ্চতা প্রায় ৪০ থেকে ১০০ মিটার (১৩০ থেকে ৩০০ ফুট)। নিচে রয়েছে শক্ত পাথর। এই খাড়া ক্লিফ থেকে সোজা তাকালে তাসমান সাগর অসীমে মিশে গেছে বলে মনে হয়, যার ওপারেই অবস্থিত নিউজিল্যান্ড। এই ভয়ংকর ও নির্মম গিরিখাতটি একসময় আত্মহত্যাপ্রবণ মানুষদের জন্য সিডনির সবচেয়ে কুখ্যাত স্থান হয়ে উঠেছিল। একবার কেউ এখান থেকে নিচে পড়ে গেলে তাঁর বেঁচে থাকা তো দূরের কথা, দেহটি খুঁজে পাওয়াও ছিল প্রায় অসম্ভব।
এই কুখ্যাত স্পটের ঠিক পাশেই ছিল ডন রিচির বাড়ি। ডন রিচি পেশায় ছিলেন একজন জীবনবিমা কর্মী। ১৯২৬ সালের ৯ জুন জন্মগ্রহণ করা এই মানুষটি ২০১২ সালের ১৩ মে মৃত্যুবরণ করেন। জীবনের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে যেসব মানুষ সমুদ্রের এই গিরিখাতে ঝাঁপ দিয়ে জীবন শেষ করতে আসতেন, তাঁদের বাঁচানোর দায়িত্ব ডন রিচি নিজেই নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। প্রায় পাঁচ দশক ধরে তিনি এই গিরিখাতের দিকে নজর রাখতেন। কাউকে একা বা বিষণ্ণ অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলেই তিনি এগিয়ে যেতেন এবং অত্যন্ত মৃদু ও আন্তরিক কণ্ঠে একটি সাধারণ প্রশ্ন করতেন—‘আমি কি আপনাকে কোনোভাবে সাহায্য করতে পারি?’
ডন রিচি শুধু এই প্রশ্নই করতেন না, বরং অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে মানুষের দুঃখ-কষ্টের কথা শুনতেন। প্রয়োজনে তাঁদের নিজের বাড়িতে ডেকে নিয়ে চা খাওয়াতেন এবং জীবনের সুন্দর দিকগুলো নিয়ে কথা বলতেন। কখনো বা কোনো কথা না বলে কেবল পাশে বসে সহমর্মিতা জানাতেন। তাঁর এই সামান্য মানবিক আচরণ ও একটুখানি মনোযোগের কারণে অন্তত ১৮০ জন মানুষ আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত বদলে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছিলেন। এই মহান কীর্তির জন্য সিডনির মানুষ তাঁকে ভালোবেসে ‘গ্যাপের দেবদূত’ বা ‘অ্যাঞ্জেল অব দ্য গ্যাপ’ নামে ডাকতেন। ২০০৬ সালে অস্ট্রেলিয়া সরকার তাঁকে ‘মেডেল অব দ্য অর্ডার অব অস্ট্রেলিয়া’ (OAM) এবং ২০১১ সালে ‘অস্ট্রেলিয়ান অব দ্য ইয়ার লোকাল হিরো’ খেতাবে ভূষিত করে।
ডন রিচি আজ আর বেঁচে নেই, তবে তাঁর স্মৃতিকে ধরে রাখতে দ্য গ্যাপে তৈরি হয়েছে ‘ডন রিচি উদ্যান’। সেখানে একটি নিচু বেদিতে স্টিলের অক্ষরে ইংরেজিতে ডন রিচির সেই বিখ্যাত বাণীটি খোদাই করা আছে—‘সব সময় সামান্য একটু হাসি, একটি সাহায্যের হাত, মনোযোগ দিয়ে কথা ও সদয় শব্দের শক্তিকে মনে রাখবেন।’ বর্তমানে এই স্থানে আত্মহত্যা ঠেকাতে উঁচু নিরাপত্তা বেষ্টনী, ২৪ ঘণ্টা সিসিটিভি নজরদারি, রাতে স্বয়ংক্রিয় আলো এবং জরুরি যোগাযোগের জন্য ইমার্জেন্সি ফোন বুথ স্থাপন করা হয়েছে, যার ফলে আত্মহত্যার হার এখন প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। এখন মানুষ এখানে আত্মহত্যা করতে নয়, বরং স্থানীয় গাইডের মুখে ডন রিচির জীবন বাঁচানোর গল্প শুনতে আসেন। আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবসে ডন রিচির এই গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, হতাশায় ভেঙে পড়া একটি মানুষকে বাঁচাতে খুব বড় আয়োজনের প্রয়োজন নেই; কেবল একটু সময়, সামান্য মনোযোগ আর একটি আন্তরিক প্রশ্নই যথেষ্ট।
স্টিলের হরফে তার ওপর ইংরেজিতে লেখা, ‘Always remember the power of the simple smile, a helping hand, a listening ear, and a kind word’, যার বাংলা অর্থ দাঁড়ায় অনেকটা এ রকম, ‘সব সময় সামান্য একটু হাসি, একটি সাহায্যের হাত, মনোযোগ দিয়ে কথা শোনার মানসিকতা এবং একটি সদয় শব্দের শক্তিকে মনে রাখবেন।’কথাটা বলেছিলেন ডন রিচি নামের এক ব্যক্তি, যিনি পেশায় ছিলেন একজন জীবনবিমা কর্মী।
অস্ট্রেলিয়া সরকার ২০০৬ সালে তাঁকে ‘Medal of the Order of Australia (OAM)’ পদকে ভূষিত করে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মাহের আহমেদ, প্রধান সম্পাদক: মোঃ মোত্তালিব সরকার। প্রকাশক কর্তৃক ৫৫০বি, হজ্জ ক্যাম্প রোড, আশকোনা, দক্ষিণখান, ঢাকা-১২৩০, বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত। সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় (ঢাকা) : ৫৫০বি, হজ্জ ক্যাম্প রোড, আশকোনা, দক্ষিণখান, ঢাকা-১২৩০, বাংলাদেশ। আঞ্চলিক কার্যালয় (বগুড়া): টোলারগেট, শেরপুর–৫৮৪০, শেরপুর, বগুড়া। অফিস: ০১৭৭৬-১৩৬০৫০ (হোয়াটসঅ্যাপ), বিজ্ঞাপন: ০৯৬৯৭-৫৪৪৮২৭। ই-মেইল: dailyjokhonsomoy@gmail.com।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রনালয়ের বিধি মোতাবেক নিবন্ধনের জন্য আবেদিত ©সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © দৈনিক যখন সময় ২০২২