
দেশের যেকোনো মুঠোফোন ব্যবহারকারীর কল রেকর্ড (সিডিআর), অবস্থান ও খুদে বার্তাসহ অত্যন্ত সংবেদনশীল তথ্য এখন টাকার বিনিময়ে সহজেই অনলাইনে পাওয়া যাচ্ছে। এই চক্রের হাত থেকে রেহাই পাননি সরকারের মন্ত্রী থেকে শুরু করে তথ্যপ্রযুক্তি ও টেলিযোগাযোগ খাতের গুরুত্বপূর্ণ সংস্থার প্রধানেরাও। একটি চক্র রীতিমতো ওয়েবসাইট খুলে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিজ্ঞাপন দিয়ে নাগরিকদের এসব ব্যক্তিগত ও গোপন তথ্য বিক্রি করছে। এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ব্যক্তিগত তথ্য বিক্রি করছে এমন ১০টি সক্রিয় ওয়েবসাইট এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ৬০০টির (600) বেশি পোস্টের সন্ধান পাওয়া গেছে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের তথ্যও নিরাপদ নয়।
অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে গত ৬ সেপ্টেম্বর একজন মন্ত্রীর মুঠোফোন নম্বর পাঠিয়ে এবং দাবি করা টাকা পরিশোধ করে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাঁর তিন মাসের কল ডিটেইলস রেকর্ড (সিডিআর) সংগ্রহ করা হয়। এই সিডিআরে ওই মন্ত্রী কার সঙ্গে কত সময় কথা বলেছেন এবং সে সময় তাঁর অবস্থান কোথায় ছিল, তার বিস্তারিত তথ্য রয়েছে। পরদিন ৭ সেপ্টেম্বর মন্ত্রীর dptore গিয়ে তাঁর নিজের ফোনের সঙ্গে মিলিয়ে এই তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করা হয়। বিষয়টি দেখে মন্ত্রী নিজে চরম বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, "এটা কীভাবে সম্ভব! তাহলে তো কেউ নিরাপদ নয়।"
শুধু মন্ত্রী নন, তথ্যপ্রযুক্তি ও টেলিযোগাযোগ খাতের দুটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্থার প্রধান এবং দুজন সংবাদকর্মীর মুঠোফোন নম্বরের সিডিআরও সংগ্রহ করে তার সত্যতা পাওয়া গেছে। অনলাইনে গড়ে ওঠা এই অবৈধ বাজারে ফেসবুক, টেলিগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ এবং বিভিন্ন ওয়েবসাইটের মাধ্যমে মানুষের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি), পাসপোর্ট তথ্য, কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) সনদ, এবং মুঠোফোনে আর্থিক লেনদেনের বিবরণীও বিক্রি হচ্ছে। তিন মাসের সিডিআর কিনতে ১ হাজার ৫০ টাকা এবং ছয় মাসের জন্য ১ হাজার ২০০ টাকা নেওয়া হচ্ছে।
নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্য এভাবে বিক্রি হওয়াকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেছেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম। তিনি জানান, এই চক্রকে খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যৌথভাবে কাজ করছে। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) এমদাদ উল বারী বলেন, নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্য এভাবে বিক্রি হওয়া রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ ২০২২ (2022) সালের জনশুমারি ও গৃহগণনার তথ্য বলছে, দেশের পাঁচ বছরের বেশি বয়সীদের ৫৬ শতাংশ মানুষ মুঠোফোন ব্যবহার করেন। একজন ব্যক্তি মুঠোফোনে কাকে কল করেন, কে তাঁকে ফোন করেন, কী কী খুদে বার্তা বিনিময় হয়—এসব তথ্য সংরক্ষণ করে মোবাইল অপারেটরগুলো।
দেশে বর্তমানে ১৯ কোটির বেশি মোবাইল গ্রাহক রয়েছেন। মোবাইল অপারেটরগুলো গ্রাহকদের কললিস্ট, আইএমইআই নম্বর ও টাওয়ার লোকেশন সংরক্ষণ করে, যা আইন অনুযায়ী ১২টি সরকারি সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ব্যবহারের সুযোগ পায়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি মোবাইল অপারেটরের কর্মকর্তা দাবি করেন, কিছু সরকারি সংস্থার নির্দিষ্ট ব্যক্তিরা অনুমোদিত প্রক্রিয়ার বাইরে সরাসরি অপারেটরদের তথ্যভান্ডারে প্রবেশ করে তথ্য সংগ্রহ করেন। তবে দেশের দুটি শীর্ষ অপারেটর গ্রামীণফোন ও রবি দাবি করেছে, তারা তথ্যভান্ডারে প্রবেশের ক্ষেত্রে কঠোর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে এবং শুধু অনুমোদিত ব্যক্তিদেরই আইন অনুযায়ী অ্যাক্সেস দেওয়া হয়।
তথ্যপ্রযুক্তি গবেষণা প্রতিষ্ঠান টেকগ্লোবাল ইনস্টিটিউটের (টিজিআই) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত বাংলাদেশে অন্তত ৬৮টি সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের তথ্য ফাঁসের ঘটনা ঘটেছে। ইতিপূর্বে ২০২৩ সালে প্রায় ৫ কোটি মানুষের জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য ফাঁস হলেও দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ব্যক্তিগত তথ্য বাণিজ্যিক পণ্য হিসেবে বিক্রি হওয়া নাগরিকদের গোপনীয়তা ও সাংবিধানিক অধিকারের চরম লঙ্ঘন। তিনি এই ব্যবস্থার কারিগরি ও কৌশলগত দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার তাগিদ দেন।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মাহের আহমেদ, প্রধান সম্পাদক: মোঃ মোত্তালিব সরকার। প্রকাশক কর্তৃক ৫৫০বি, হজ্জ ক্যাম্প রোড, আশকোনা, দক্ষিণখান, ঢাকা-১২৩০, বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত। সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় (ঢাকা) : ৫৫০বি, হজ্জ ক্যাম্প রোড, আশকোনা, দক্ষিণখান, ঢাকা-১২৩০, বাংলাদেশ। আঞ্চলিক কার্যালয় (বগুড়া): টোলারগেট, শেরপুর–৫৮৪০, শেরপুর, বগুড়া। অফিস: ০১৭৭৬-১৩৬০৫০ (হোয়াটসঅ্যাপ), বিজ্ঞাপন: ০৯৬৯৭-৫৪৪৮২৭। ই-মেইল: dailyjokhonsomoy@gmail.com।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রনালয়ের বিধি মোতাবেক নিবন্ধনের জন্য আবেদিত ©সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © দৈনিক যখন সময় ২০২২